ঈদুল আজহার আগে শেষ কার্যদিবস রোববার (২৪ মে) শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার দেখা মিলেছে। এর মাধ্যমে টানা পাঁচ কার্যদিবস ধরে সূচক বৃদ্ধির মাধ্যমে সবুজ ধারাতেই ঈদের বিরতিতে গেল দেশের শেয়ারবাজার। বাজারে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায় মূল্য সূচকও বেড়েছে। তবে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কমেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সেই সঙ্গে কমেছে বিক্রির চাপ। ফলে ঈদের আগে বাজারে টানা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার দেখা মিলেছে। ঈদের ছুটির পরও এ ধারা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে পুঁজিবাজারে নতুন গতি ফিরতে পারে।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, দীর্ঘ মন্দার কারণে বাজার যে অবস্থায় নেমেছে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোই স্বাভাবিক। প্রতি বছরেই ঈদের আগে কয়েকদিন বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকে। এবার সেই প্রবণতা দেখা গেছে। ঈদের পর এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাজারে গতি ফিরে আসবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার শেয়ারবাজারকে গুরুত্ব দিচ্ছে, অর্থমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এখন দেখার বিষয় আগামী বাজেটে অর্থমন্ত্রী শেয়ারবাজারের জন্য কি রাখেন। বাজেটে শেয়ারবাজারের ভালো কিছু থাকলে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। একইভাবে খারাপ কিছু থাকলে বাজারের সংকট আরও বাড়বে।
বিনিয়োগকারী মো. সোহাগ বলেন, ঈদের আগে বাজার ভালোই গেল। এবার কিছুটা স্বস্তি নিয়ে ঈদ উদযাপনের সুযোগ পাচ্ছি। গত কয়েকদিনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কারণে কিছু লাভের মুখ দেখেছি। তবে আগে থেকেই বড় লোকসানের মধ্যে রয়েছি। ফলে এখনো অনেক লোকসান বহন করে চলছি। ঈদের আগে বাজারে যে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে, আমরা চাই ঈদের পরও যেন সেই ধারা অব্যাহত থাকে।
মশিউর রহমান নামের আর এক বিনিয়োগকারী বলেন, শেয়ারবাজারের বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী বড় লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। তবে ঈদের আগে বাজার টানা পাঁচ কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী থাকা অবশ্যই স্বস্তির। এই ঊর্ধ্বমুখিতার কারণে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পরিমাণ কমেছে। অবশ্য বিনিয়োগকারী লোকসান থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি।
তিনি বলেন, এখনো অনেক বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও ৬০-৭০ শতাংশ লোকসান বহন করছে। এই লোকসান হয় তো আর কোনোদিন পুরোপুরি বের হয়ে আসা সম্ভব হবে না। এখন অধিকাংশ বিনিয়োগকারী লোকসান কমানোর চেষ্টা করছেন। ঈদের পর বাজারে ঊর্ধ্বমুখী ধারা থাকলে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পরিমাণ আরও কিছুটা কমে আসবে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, রোববার ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার মাধ্যমে। ফলে লেনদেনের শুরুতে সূচকের ঊর্ধ্বমুখিতার দেখা মিলে। তবে প্রথম আধাঘণ্টার লেনদেন শেষ হওয়ায় পর বাজারে বেশ অস্থিরতা দেখা যায়। অবশ্য দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ার পাশাপাশি মূল্য সূচক বেড়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়।
দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ১৬১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ১৩৬টির এবং ৯২টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
এদিকে ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৭২টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৮৪টির দাম কমেছে এবং ৩৯টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ৪০টি কোম্পানির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২৩টির এবং ১১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪৯টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২৯টির এবং ৪২টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। আর তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে ৬টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৭টির দাম কমেছে এবং ২১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৩৩৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৫ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৮২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় দশমিক ৫৪ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৩০ পয়েন্টে উঠে এসেছে।
মূল্যসূচক বাড়লেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কমেছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৭৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৯০২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন কমেছে ১২৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
এই লেনদেনে সব থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের শেয়ার। কোম্পানিটির ২০ কোটি ৩৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিংয়ের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার। ১৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সিটি ব্যাংক।
এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- ব্র্যাক ব্যাংক, মীর আখতার হোসেন লিমিটেড, বিডি থাই ফুড, আরডি ফুড, যমুনা ব্যাংক, বিবিএস কেবলস এবং আইটি কনসালটেন্ট।
অন্য শেয়ারবাজার সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই বেড়েছে ৭০ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৮৭ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৬টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৭১টির এবং ২০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ২৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এমএএস/এমআইএইচএস

