একসময় গ্রামবাংলার আকাশে ঈদের চাঁদ দেখা দেওয়া মানেই ছিল উৎসবের এক বহুমাত্রিক ক্যানভাস উন্মোচিত হওয়া। ইট-পাথরের শহর থেকে মুক্তি পেয়ে নাড়ির টানে, শিকড়ের টানে বাড়ি ফিরতেন কর্মজীবী মানুষ। সেই ফেরার মধ্যে ছিল এক ধরনের ব্যাকুলতা, ছিল আপনজনের কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দ। ঈদুল আজহার প্রস্তুতি, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কোলাকুলি আর সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠে জমে উঠত লোকজ সংস্কৃতির বর্ণিল আয়োজন। কোথাও জারি-সারি, কোথাও যাত্রাপালা, কোথাও মেঠো গানের আসর। আর ধুলো উড়িয়ে গ্রামের মাঠে শুরু হতো বীরত্ব, শৌর্য আর কৌশলের এক অনন্য প্রদর্শনী লাঠি খেলা।
কালক্রমে মাঠগুলো আজও আগের জায়গায় আছে, ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে ঈদও আসে নিয়মে। মানুষও ফেরে শহরের ক্লান্তি ঝেড়ে। কিন্তু উৎসবের সেই চেনা উন্মাদনা আজ কোথায় যেন পথ হারিয়ে ফেলেছে। গ্রামের সবুজ বুক চিরে এখন আর শোনা যায় না ঢোলের গুরুগুরু বোলে লাঠির ছন্দময় ঝনঝন শব্দ। আবহমান বাংলার লোক-সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ লাঠি খেলা আজ ঈদ-কোরবানিকে কেন্দ্র করেও আর জমে ওঠে না। যে খেলা একসময় গ্রামীণ বিনোদনের প্রাণভোমরা ছিল, তা আজ নাগরিক জীবনের আগ্রাসনে কেবলই স্মৃতির অ্যালবামে ধূসর জলছাপ।
শৌর্য, কৌশল ও নান্দনিকতার এক জীবন্ত শিল্প
একসময় ঈদুল আজহার ছুটি মানেই ছিল গ্রামীণ জনপদে লাঠি খেলার জমজমাট আয়োজন। শহর থেকে ফেরা মানুষ, দর্শকের ভিড় আর ঢোলের তালে মুখর থাকত মাঠ। কিন্তু সংস্কৃতির পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলার শতবর্ষী এই লোকঐতিহ্য আজ অস্তিত্ব সংকটে।
লাঠি খেলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রূপ। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এই খেলা গ্রামীণ সমাজে আত্মরক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা এবং দলগত শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সাধারণত সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা লাঠি হাতে নিয়ে খেলোয়াড়রা আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার বিভিন্ন কৌশল প্রদর্শন করতেন। ঢোল, করতাল ও কাঁসরের তালে তালে যখন একদল লাঠিয়াল মাঠে নেমে পড়তেন, তখন তা শুধু খেলা নয়, যেন এক জীবন্ত লোকনাট্যে রূপ নিত।
বিশেষ করে ঈদুল আজহা, ঈদুল ফিতর কিংবা অন্যান্য উৎসবকে কেন্দ্র করে লাঠি খেলা হয়ে উঠত গ্রামীণ জনপদের সবচেয়ে বড় সামাজিক মিলনমেলা। দূর-দূরান্তের মানুষ দল বেঁধে খেলা দেখতে আসত। মাঠের পাশে বসত অস্থায়ী দোকান, চলত আড্ডা, হাসি আর গল্পের আসর।
অনেক প্রবীণ এখনও স্মৃতিচারণ করে বলেন, একসময় লাঠি খেলার দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হতো ঈদের ছুটিকে ঘিরে। কারণ তখন গ্রামের বাইরে থাকা মানুষজন বাড়ি ফিরতেন। দর্শক থাকত, করতালির গর্জন থাকত, আর লাঠিয়ালদের বুকেও থাকত নিজেকে প্রমাণ করার এক অদম্য আগ্রহ।
বদলে গেছে উৎসবের ব্যাকরণ
সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, বদলেছে উৎসব উদযাপনের ধরনও। একসময় গ্রামের বাড়ি ফেরা মানেই ছিল প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, মাঠে যাওয়া, সামাজিক আয়োজনে অংশ নেওয়া। এখন অনেকের কাছে ছুটি মানে বিশ্রাম, ব্যক্তিগত সময় কিংবা ডিজিটাল বিনোদনের জগতে ডুবে থাকা।
স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে মানুষের অবসর কাটানোর ধরন আমূল বদলে গেছে। ফলে মাঠভিত্তিক লোকজ আয়োজনের প্রতি আগ্রহ কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
একজন প্রবীণ লাঠিয়ালের ভাষায়, ‘আগে ঈদের পর বিকেল হইলেই পোলাপান লাঠি আর ঢোল নিয়া মাঠে যাইত। এখন সবাই মোবাইল নিয়া ব্যস্ত। দর্শক নাই, তাই খেলাও আর আগের মতো হয় না।’
সংস্কৃতিবিদদের মতে, এটি শুধু একটি খেলার সংকট নয়; এটি গ্রামীণ সামাজিক জীবনের পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি। কারণ লাঠি খেলা ছিল যূথবদ্ধ জীবনের এক জীবন্ত দলিল, যেখানে মানুষ একত্রিত হতো আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য।
উত্তরসূরির সংকটে ঐতিহ্যের ভবিষ্যৎ
লাঠি খেলার বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ। যে খেলায় অংশ নেওয়া একসময় তরুণদের জন্য ছিল গর্ব ও সাহসিকতার প্রতীক, সেখানে এখন নতুন মুখ খুব কম দেখা যায়। প্রবীণ খেলোয়াড়রা বয়সের ভারে সরে যাচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের জায়গা নেওয়ার মতো প্রশিক্ষিত তরুণ তৈরি হচ্ছে না।
সাংস্কৃতিক গবেষকদের মতে, নিয়মিত চর্চার পরিবেশ না থাকা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের অভাব এবং বিকল্প বিনোদনের বিস্তার তরুণদের এই ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ফলে লাঠি খেলার বহু পুরোনো দল আজ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। অনেক এলাকায় দল ভেঙে গেছে, আবার কোথাও খেলোয়াড়ের অভাবে আয়োজন বন্ধ হয়ে গেছে।
পৃষ্ঠপোষকতার খরা
একসময় স্থানীয় জমিদার, জোতদার বা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা লাঠিয়াল দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। উৎসবের সময় খেলোয়াড়দের পোশাক, বাদ্যযন্ত্র এবং যাতায়াতের ব্যয় বহন করা হতো। বর্তমানে সেই পৃষ্ঠপোষকতা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। অর্থসংকটের কারণে অনেক দল টিকে থাকতে পারেনি। জীবিকার তাগিদে অনেক লাঠিয়াল পেশা বদলেছেন। এখন কেবল জাতীয় দিবস বা লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রতীকী প্রদর্শনীর সুযোগ পেলে তাঁরা মাঠে নামেন।
হারিয়ে যাচ্ছে সামাজিক বন্ধনের এক মঞ্চ
লাঠি খেলার অবক্ষয় শুধু একটি লোকজ খেলার হারিয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিসরও। একটি লাঠি খেলার আসর মানে ছিল পুরো গ্রামের একত্র হওয়া। সেখানে শিশু, কিশোর, যুবক কিংবা বৃদ্ধ সবাই সমান আগ্রহে অংশ নিত। মানুষ একে অন্যের সঙ্গে দেখা করতেন, গল্প করতেন, সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় করতেন। আজকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনে সেই সামাজিক মেলবন্ধনের জায়গাগুলো ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে লাঠি খেলার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনগুলোও হারাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক দর্শকশ্রেণি।
তবুও নিভে যায়নি আশার আলো
তবে সবকিছুর মধ্যেও আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। কম হলেও, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও কিছু লাঠিয়াল দল এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। লোকসংস্কৃতিপ্রেমী মানুষজন বিশ্বাস করেন, সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লোকঐতিহ্যভিত্তিক কার্যক্রম এবং স্থানীয় উৎসবগুলোতে নিয়মিত আয়োজন নিশ্চিত করা গেলে লাঠি খেলা আবারও নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
ঈদুল আজহার আনন্দ শুধু কোরবানি বা পারিবারিক মিলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের গ্রামীণ কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম লাঠি খেলা। আজ যখন ঈদের পড়ন্ত বিকেলে গ্রামের ধুলোমাখা মাঠগুলো নীরব হয়ে থাকে, তখন প্রশ্ন জাগে আমরা কি ধীরে ধীরে আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছি?
ঐতিহ্য একদিনে জন্ম নেয় না, আবার একদিনে বিলীনও হয় না। প্রয়োজন শুধু তাকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছা, স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়বদ্ধতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। তাহলেই হয়তো কোনো এক ঈদের বিকেলে আবারও গ্রামের মাঠ কেঁপে উঠবে ঢোলের চিরচেনা বোলে, লাঠির ছন্দময় ঝংকারে। মানুষ আবারও ঘর ছেড়ে ছুটে আসবে নিজের শিকড়ের টানে, আর উৎসব ফিরে পাবে তার হারানো প্রাণ।
কেএসকে

