রাজধানীর পল্লবীর কালশীর বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে সরকারি জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষের ৫ দিনের মাথায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যায় লাগা আগুনে বস্তির শত শত ঘর ও ভাঙারির দোকান পুড়ে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১৫ ইউনিটকে প্রায় দুই ঘণ্টা কাজ করতে হয়েছে।
এর আগে ২০ মে সরকারি জমি উদ্ধারে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উদ্যোগে বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। ওইদিন উচ্ছেদ কার্যক্রম কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানিয়েছিল, অভিযানের সময় স্থানীয়রা পুলিশের ওপর হামলা চালালে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়জন সদস্য আহত হন।
মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার সেদিন বলেন, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হচ্ছিল। নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল পল্লবী থানা-পুলিশ ও পুলিশের বিশেষ ইউনিট (পিওএম)। অভিযানের একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
উচ্ছেদ অভিযানের ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ২৩ মিনিটে কালশী বস্তিতে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। রাত ৭টা ৩২ মিনিটে প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। পরে আগুনের ভয়াবহতা বাড়তে থাকলে আরও ইউনিট যোগ করা হয়।
রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কালশী ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। কালশী-ইসিবি সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। আগুনের কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজান বলেন, সাড়ে ৭টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যায়। আগুন লাগার দুই-তিন মিনিট পর পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, ঘটনাস্থলে একাধিক ভাঙারির দোকান ও গোডাউন রয়েছে। যেখানে কাগজ, কাঠ ও প্লাষ্টিক পণ্য রয়েছে। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে।
বাউনিয়াবাদ এলাকা বস্তি মুশফেকা জানান, সেখানে প্রায় শতাধিক ঘর রয়েছে। এক তলা ও দোতালা কাঠের ও পাকা ঘর রয়েছে। ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, আগুন কীভাবে লেগেছে সেটা নিয়ে নানান গল্প আছে। তবে কিছুদিন আগে বস্তি উচ্ছেদ করতে আসে প্রশাসন। সে সময় তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। সেদিন পুরো বস্তি উচ্ছেদ হলে আজকে হয়তো এত বড় আগুন লাগতো না।
ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলেন, এখানে আনুমানিক এক হাজার ২০০ ঘর ও ভাঙারির দোকান রয়েছে। প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার মানুষের বসবাস। আগুনের ভয়াবহতার কারণে মোট ১৫টি ইউনিট ও ১২৩ জন ফায়ার ফাইটার কাজ করেছেন।
তিনি জানান, সরু রাস্তা, পানির উৎসের সংকট এবং কাগজ-প্লাস্টিকসহ দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে তীব্র বাতাস থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানান ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। এসময় ক্ষতিগ্রস্তরা তাকে ঘিরে ধরেন। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক খাদ্য সহায়তায় তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পেছনে নাশকতার কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সে বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে একটা সন্দেহ আছে—এটা কোনোভাবে সাবোটাজ করা হয়েছে কি না। একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একটি ভিডিও পাওয়া গেছে, যেখানে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগুন লাগানোর অভিযোগ রয়েছে।’
কয়েক দিন আগে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের সঙ্গে আগুনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা নিখোঁজের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
এসএম/এমআইএইচএস

