Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

হবিগঞ্জে গাড়ির ধাক্কায় দুই বন্ধু নিহত

হবিগঞ্জের মাধবপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্ধু নিহত হয়েছেন। সোমাবার (২৫ মে) দিবাগত রাতে মাধবপুরের নোয়াপাড়া সাহেবনগর গেট এলাকায় এ দুর্ঘটনা...
Homeএআই ক্যামেরার নজরে বদলাচ্ছে ট্রাফিক আচরণ

এআই ক্যামেরার নজরে বদলাচ্ছে ট্রাফিক আচরণ

সম্প্রতি ঢাকার রাস্তায় ব্যস্ত এক মোড়ে ট্রাফিকের লাল বাতি জ্বলছে। কিন্তু মোটরসাইকেল আরোহী যুবকটি ভাবলেন, আরও দুই সেকেন্ড আগে গেলে কী আর হবে! নিয়ম ভেঙে তিনি দ্রুত গতি বাড়ালেন। পাশে ট্রাফিক পুলিশ নেই, বাঁশিও বাজছে না, হাতও তুলছে না কেউ। যুবকটি খানিকটা নিশ্চিন্ত। কিন্তু কয়েকদিন পর মোবাইলে একটি নোটিফিকেশন এলো। বাইক চালানোর সময় নিয়ম ভাঙার ছবি, সময়, স্থান এবং অনলাইনে মামলা নম্বর। তিনি অবাক! এটা আবার কীভাবে সম্ভব? পরে জানা গেল, মোড়ের ওপরে লাগানো এআই-সক্ষম ক্যামেরা তার মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট শনাক্ত করেছে। মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও মেশিনের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়নি।

এই ছোট্ট ঘটনাটি এখন একজন চালকের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। এটি বাংলাদেশের নগরজীবনের একটি নতুন বাস্তবতা। রাজধানী ঢাকায় এখন ধীরে ধীরে এআই নজরদারি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান হচ্ছে। আগে যেখানে ট্রাফিক আইন মানানো হতো বাঁশি, চেকপোস্ট বা হঠাৎ অভিযানের মাধ্যমে, সেখানে এখন প্রযুক্তি নীরবে কাজ করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এটা শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণাই নয়, মামলা বা জরিমানার ভয়ই মানুষকে বেশি মোটিভেটেড করছে।

মানুষের মনোবিজ্ঞান বড় অদ্ভুত। নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক অনুরোধ কিংবা মানবিক আহ্বান অনেক সময় যেটা পারে না, শাস্তির সম্ভাবনা সেটি দ্রুত করিয়ে নেয়। ঢাকা শহরের রাস্তায় এর প্রমাণ মিলছে প্রতিদিন। এআই ক্যামেরা বসানোর পর কিছু এলাকায় দেখা গেছে, সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা কমেছে, হেলমেট ব্যবহারের হার বেড়েছে, এমনকি উল্টো পথে চলার ঘটনাও কমেছে। কারণ মানুষ এখন জানে, কেউ না দেখলেও ক্যামেরা দেখছে। এখানেই মূল প্রশ্ন, আমরা কি সত্যিই সচেতন হচ্ছি, নাকি কেবল ধরা পড়ার ভয়ে নিয়ম মানছি?

সমাজবিজ্ঞানীরা বহু আগে থেকেই বলে আসছেন, সমাজ নিয়ন্ত্রণের দুটি বড় পদ্ধতি হলো—নৈতিকতা এবং শাস্তি। উন্নত সমাজে মানুষ অনেক সময় অন্তর্গত মূল্যবোধ থেকে নিয়ম মানে; কিন্তু অনুন্নত বা রূপান্তরমান সমাজে শাস্তির ভয় কার্যকর ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের নগর বাস্তবতায় সেই দ্বিতীয় চিত্রটিই প্রবল। এখানে অনেক চালক জানেন যে লাল বাতি অমান্য করা অন্যের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে, তবু সুযোগ পেলে নিয়ম ভাঙেন। কিন্তু যখন নিশ্চিত হন যে এআই ক্যামেরা ছবি তুলবে এবং মামলা হবে, তখন আচরণ পাল্টান। অর্থাৎ, মামলা এখানে শুধু শাস্তি নয়; এটি আচরণ পরিবর্তনের জন্য ‘মোটিভেশন’ হয়ে উঠছে।

ঢাকার রাস্তায় আগে ট্রাফিক পুলিশ দেখলেই অনেকে হেলমেট পরতেন, আবার মোড় পার হয়েই খুলে ফেলতেন। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। কারণ এআই ক্যামেরা কোনো নির্দিষ্ট মোড়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সর্বক্ষণ কাজ করতে পারে। ফলে আচরণগত ধারাবাহিকতা তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তির এই নীরব উপস্থিতি মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, আইন এখন আর শুধু মানুষের হাতে নয়, ডেটার হাতেও।

তবে এই বাস্তবতার ভেতরে একধরনের ব্যঙ্গও আছে। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে ভালো মানুষ হওয়ার চেয়ে ধরা না পড়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ রাস্তা পরিষ্কার রাখে না নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকে; জরিমানা হলে তখন ময়লা ফেলে না। কেউ সিগন্যাল মানে না সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য; মামলা হবে বলেই দাঁড়ায়। যেন নৈতিকতা নয়, মামলাই সভ্যতার নতুন শিক্ষক!

এটি শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থার বিষয় নয়; বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতিরও প্রতিচ্ছবি। কর ফাঁকি, অবৈধ দখল, প্রশ্নফাঁস, অনলাইন প্রতারণা ইত্যাদির অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আইন প্রয়োগ দুর্বল হলে অপরাধ বাড়ে। কিন্তু যখন ডিজিটাল নজরদারি, কঠোর শাস্তি বা স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং শুরু হয়, তখন আচরণ পাল্টাতে থাকে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি মানুষের ভেতরের নৈতিকতার ঘাটতি পূরণে একধরনের কৃত্রিম চাপ তৈরি করছে।

ঢাকার রাস্তায় নতুন লাগানো এআই ক্যামেরাগুলো আমাদের সমাজের একটি গভীর সত্য উন্মোচন করেছে। আমরা এখনো স্বেচ্ছায় শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি হতে পারিনি। আমাদের শৃঙ্খলা অনেক সময় বাহ্যিক চাপের ওপর দাঁড়িয়ে। তবু এটিকে পুরোপুরি নেতিবাচক বলাও ঠিক হবে না। ইতিহাস বলে, অনেক সমাজ প্রথমে কঠোর আইন ও শাস্তির মাধ্যমে আচরণ পরিবর্তন করেছে, পরে সেটিই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের পরিচ্ছন্নতা বা জাপানের ট্রাফিক শৃঙ্খলাও একদিনে তৈরি হয়নি।

এই জায়গায় এআই এক নতুন সামাজিক শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে। আগে ‘বিগ ব্রাদার’ ধারণাটি ছিল সাহিত্য বা রাজনৈতিক আলোচনায়; এখন সেটি বাস্তব নগরজীবনে দৃশ্যমান। ক্যামেরা শুধু ছবি তোলে না, বিশ্লেষণও করে। কোন গাড়ি লাল বাতি অমান্য করল, কে হেলমেট পরেনি, কোন গাড়ি নিষিদ্ধ লেনে ঢুকেছে—এসব তথ্য ডেটাবেজে জমা হয়। অর্থাৎ, এআই কেবল পর্যবেক্ষক নয়; এটি বিচার প্রক্রিয়ার প্রাথমিক সাক্ষীও।

কিন্তু এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, তা হলো—এই প্রযুক্তি কি নির্ভুল ও স্বচ্ছভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে? কারণ প্রযুক্তি নিরপেক্ষ হলেও এর ব্যবহারকারীরা মানুষ। যদি ভুল নম্বরপ্লেট শনাক্ত হয়? যদি নির্দোষ কেউ মামলার শিকার হন? যদি নজরদারি নাগরিক গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করে? উন্নত বিশ্বেও এআই নজরদারি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাই বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি ব্যবহারে জবাবদিহিতা, ডেটা সুরক্ষা এবং আপিল ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায় মানুষ প্রযুক্তিকে সহযোগী নয়, ভয়ের যন্ত্র হিসেবে দেখতে শুরু করবে।

তবে বাস্তবতা হলো, ঢাকার মতো বিশাল ও বিশৃঙ্খল নগরে প্রযুক্তি ছাড়া শৃঙ্খলা আনা কঠিন। প্রতিদিন লাখো যানবাহনের শহরে কেবল মানবশক্তি দিয়ে আইন প্রয়োগ কার্যকর করা সম্ভব নয়। সেখানে এআই ক্যামেরা একধরনের ‘ডিজিটাল ট্রাফিক পুলিশ’ হিসেবে কাজ করছে। এটি ক্লান্ত হয় না, ঘুস নেয় না, রাজনৈতিক পরিচয় দেখে ছাড়ও দেয় না—কমপক্ষে তাত্ত্বিকভাবে।

এই জায়গাটিই সাধারণ মানুষের আস্থার কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে আইন প্রয়োগ নিয়ে মানুষের বড় অভিযোগ হলো বৈষম্য। প্রভাবশালী কেউ নিয়ম ভাঙলেও অনেক সময় পার পেয়ে যায়, অথচ সাধারণ মানুষ শাস্তি পায়। যদি এআই প্রযুক্তি সত্যিকার অর্থে সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয়, তবে এটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে কেবল মামলা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সভ্যতা গড়ে তোলা যায় না। মামলা তাৎক্ষণিক শৃঙ্খলা আনতে পারে, কিন্তু টেকসই নাগরিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে না। একজন চালক জরিমানার ভয়ে সিগন্যাল মানবেন, কিন্তু সুযোগ পেলে আবারও নিয়ম ভাঙবেন—এমন প্রবণতা থাকলে বোঝা যাবে, পরিবর্তনটি বাহ্যিক; অন্তর্গত নয়।

সুতরাং প্রয়োজন দ্বিমুখী কৌশল। একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর আইন প্রয়োগ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক শিক্ষা। স্কুলে ট্রাফিক আইন শেখানো, গণপরিবহনে সচেতনতা প্রচার, মিডিয়ায় দায়িত্বশীল ক্যাম্পেইন—এসবও জরুরি। কারণ ভয় মানুষকে থামাতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ মানুষকে বদলায়।

ঢাকার রাস্তায় নতুন লাগানো এআই ক্যামেরাগুলো আমাদের সমাজের একটি গভীর সত্য উন্মোচন করেছে। আমরা এখনো স্বেচ্ছায় শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি হতে পারিনি। আমাদের শৃঙ্খলা অনেক সময় বাহ্যিক চাপের ওপর দাঁড়িয়ে। তবু এটিকে পুরোপুরি নেতিবাচক বলাও ঠিক হবে না। ইতিহাস বলে, অনেক সমাজ প্রথমে কঠোর আইন ও শাস্তির মাধ্যমে আচরণ পরিবর্তন করেছে, পরে সেটিই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের পরিচ্ছন্নতা বা জাপানের ট্রাফিক শৃঙ্খলাও একদিনে তৈরি হয়নি।

বাংলাদেশেও হয়তো প্রযুক্তি সেই রূপান্তরের সূচনা করতে পারে। আজ যে মানুষ মামলা এড়াতে হেলমেট পরছেন, কাল হয়তো নিজের নিরাপত্তাবোধ থেকেই পরবেন। আজ যে চালক ক্যামেরার ভয়ে সিগন্যাল মানছেন, ভবিষ্যতে হয়তো সেটিকে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখবেন।

তবে এজন্য প্রযুক্তিকে কেবল শাস্তির যন্ত্র না বানিয়ে সুশাসনের সহায়ক করতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে, এআই মানে শুধু নজরদারি নয়; এটি জীবন রক্ষার প্রযুক্তিও। একটি সিগন্যাল ভাঙা মানে কেবল আইন ভাঙা নয়, কারও জীবন ঝুঁকিতে ফেলা। একটি হেলমেট না পরা মানে কেবল নিজের ঝুঁকি নয়, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করা।

শেষ পর্যন্ত, ঢাকার রাস্তার এআই ক্যামেরা আমাদের সমাজকে এক অস্বস্তিকর আয়না দেখাচ্ছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, নৈতিকতার চেয়ে মামলার ভয় বেশি কার্যকর। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও দেখা যাচ্ছে যে, মানুষ বদলাতে পারে, যদি নিয়ম প্রয়োগ নিশ্চিত হয়। কাজেই ক্যামেরার রেকর্ড করা তথ্য দ্বারা মামলা দিয়ে মোটিভেশন করা হয়তো আদর্শ পথ নয়, কিন্তু বিশৃঙ্খল সমাজে এটি একটি কার্যকর অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হতে পারে। কারণ বাস্তবতা হলো, যেখানে মানুষের বিবেক ব্যর্থ হয়, সেখানে অনেক সময় অটো ভিডিও ক্যামেরাই সফল হতে পারে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন
fakrul@ru.ac.bd

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম