অসংখ্য খবরের ভিড়ে হয়তো এ খবরটা অনেকের চোখেই পড়েনি কিন্তু এই একটি খবরই আমাদের সামনে কৃষক ও কৃষির অসহায়ত্ব এবং কষ্টের কথা তুলে ধরেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের মধ্যবয়সী কৃষক আহাদ মিয়া নিজের ছয় বিঘা জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেখে জমিতেই জ্ঞান হারিয়ে মারা গেছেন। প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনি এমনই হতদরিদ্র হয়ে পড়েছিলেন। এর ওপরে যখন ফসল তলিয়ে গেলো, আহাদ মিয়া সেই আঘাত আর সহ্য করতে পারেননি।
বাংলাদেশের কৃষক দেশের খাদ্যনিরাপত্তার মূল স্তম্ভ, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে এখনো এরাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ। আমরা মার্কিন চুক্তি, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, মেয়র ইলেকশন, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ, বর্তমান সরকারের কার্ড রাজনীতি, শিশু মুক্তিযোদ্ধা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে ভাবছি। অথচ আহাদ মিয়ার বেঁচে থাকার স্বপ্নই ছিল তার জমির ধান। তার মৃত্যুর সাথে সাথে পরিবারও নিঃসন্দেহে দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। তারা ভাবছে সামনের দিনগুলো চলবে কীভাবে? কীভাবে ঋণ শোধ হবে?
আহাদ মিয়া একা নন, সারাদেশের আরও অসংখ্য কৃষক আছেন ক্ষতির এই তালিকায়। ফসলি জমি, মাছের ঘের, সবজি বাগান, গরু-ছাগল, সড়ক ও ফসল রক্ষাকারী বাঁধ এবং এমনকি ঘরবাড়ি পর্যন্ত তলিয়ে গেছে। এপ্রিল-মে মাসে (বিশেষ করে এপ্রিলের শেষ দিকে) অসময়ের ভারী বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বজ্রবৃষ্টিতে অসংখ্য গরু মারা গেছে। গরু কৃষকের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
কৃষির ক্ষতি মানে শুধু কৃষকের একার ক্ষতি নয়। এই ক্ষতি দেশের সাড়ে ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের। আমরা সবাই কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত নই কিন্তু এই উৎপাদিত ফসল খেয়েই বেঁচে আছি। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হয়েও এদেশের মানুষের দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের অভাব হয় না, শুধু উচ্চফলনশীল এই চাষবাসের কারণে।
বাংলাদেশে প্রায় ৯৩,৯৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকা কৃষিজমির আওতাভুক্ত। এটি দেশের মোট আয়তনের শতকরা ৭২ শতাংশের বেশি। সবসময় স্লোগান শোনা যায় কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কিন্তু এই কৃষকই এখন চরম বিপদের মুখে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বেশকিছু জেলায় হাওরের পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ধান কাটতে না পেরে কৃষকরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
উত্তরবঙ্গের কয়েকটি এলাকার হাজার হাজার হেক্টর আলু ক্ষেত তলিয়ে গেছে । অসময়ের এই বৃষ্টিতে পাকা ও আধা-পাকা আলু জমিতেই পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বোরো ধান ও আলু আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি ফসল, অথচ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষকের চোখের সামনেই তাদের সোনার ফসল পানির নিচে চলে যাচ্ছে, যা তাদের সারা বছরের আয়ের প্রধান উৎস। এবারের বোরো মৌসুম শুরু হয়েছিল খরা দিয়ে, আর শেষ হচ্ছে টানা বৃষ্টিতে। শিলাবৃষ্টির কারণে দেশের আম ও লিচুর বাগানে বড়ধরনের ফলন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ঝরে পড়েছে মুকুল ও গুটি, যা আম ও লিচু উৎপাদকদের সারা বছরের আয়ের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। মাঠের পর মাঠ ধান এখন পানির নিচে পচে যাচ্ছে। কোন কোন জায়গায় কৃষক জলমগ্ন জমিতে নেমে বুক সমান পানিতে ডুব দিয়ে আধাপাকা ধান কাটার চেষ্টা করছেন।
কৃষকের জন্য এসব কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব যদি সরকার তাদের পাশে দাঁড়ায়। সরকার অবশ্য বোরো কৃষকদের জন্য তিন মাসের ক্ষতিপূরণ সহায়তা দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ঋণের বোঝা কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। অন্যান্য কর্মকাণ্ডের পেছনে ব্যয় কমিয়ে কৃষককে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে দ্রুত। এর পাশাপাশি দরকার সহজ শর্তে কৃষিঋণ, বিনামূল্যে বীজ, সার বা প্রণোদনা ভাতা, ফসলের ন্যায্যমূল্য, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিনীতি।
কৃষকরা এখন এমন লোকসানের মুখে পড়েছেন, যাতে তারা উৎপাদন খরচও তুলতে পারবেন না। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ কৃষকই ঋণ করে চাষাবাদ করেন। নেত্রকোনার কৃষক দিনু মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘ধারদেনা করে চাষ করেছিলাম। আশা ছিল ধান বেচে দেনা শোধ করব। কিন্তু এই অকাল বৃষ্টি তো আমাদের পথে বসিয়ে দিল। ঘরে চাল নেই, মাঠে ধান নেই। সামনে যে আকাল (দুর্ভিক্ষ) আসছে, তা পরিষ্কার বুঝতে পারছি।’ এই কথা দিনু মিয়ার একার নয়, অধিকাংশ কৃষক পরিবারের।
কৃষকরা বাধ্য হয়ে ঋণ নেন, আশা থাকে ধান বিক্রি করে শোধ করবেন। এবছর ফলনও ভালো হয়েছিল, কিন্তু অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সব শেষ। পরিশ্রমের ফসল তলিয়ে যেতে দেখে কৃষকরা হু হু করে কেঁদেছেন, কেউ কেউ বুক সমান পানির মধ্যে নেমে দুহাতে ধানের গোছা তুলে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। কয়েকদিন আগেও হাওরের যে মাঠজুড়ে ছিল ফসলের হাতছানি, সেখানে এখন থৈ থৈ করছে পানি। কোথাও কোথাও ডুবে যাওয়া ধানগাছের ডগা উঁকি দিয়ে নিজের বেঁচে থাকার কথা জানান দিচ্ছে। সময় যতো যাচ্ছে বাতাসে বেড়ে যাচ্ছে পচা ধানের গন্ধ।
আরও কষ্টের কথা হচ্ছে এই আবহাওয়ায় কৃষকরা ধান কাটার শ্রমিকও পাচ্ছেন না। পেলেও মজুরি অনেক বেশি। বেশি মজুরি দিয়ে ধান কাটলেও ক্ষতি, আবার ধান পচে গেলেও ক্ষতি। এদেশের অসহায় কৃষকদের দাঁড়িয়ে থেকে এই ক্ষতি সহ্য করতে হচ্ছে। এমনকি ধান শুকানোর জায়গাও পাচ্ছেন না অনেক কৃষক।
মাঠজুড়ে সবুজ ফসল, সোনালি ধান, পাট, ভুট্টা, সরিষা ক্ষেত দেখে আমরা মুগ্ধ হই। কিন্তু এই সোনার ফসল ফলানোর জন্য কৃষকদের সারাবছর যে কতটা পরিশ্রম ও কষ্ট করতে হয়, সেটা আমরা অনুধাবন করতে পারি না। তেমনি অনুভব করতে পারছি না মাঠজুড়ে সোনালি ফসল পানিতে তলিয়ে গেলে তাদের জীবন কতটা এলোমেলো হয়ে যায়।
বিভিন্ন জেলা, উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারাও বলছেন, এবারের অকাল বৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের বড় একটি অংশ এখন পানির নিচে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের কৃষকরা আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন, যার ফলন ও মান দুটোই খুব নিম্নমুখী। এছাড়া টমেটো, শসা, ঝিঙা ও খিরাসহ গ্রীষ্মকালীন সবজির মাচাগুলো বৃষ্টির পানিতে পচে নষ্ট হচ্ছে। এতে বাজারে সবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে এবং আরও যাবে।
খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অকালের এই বৃষ্টি কেবল কৃষকের ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হলে চালের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বাজারে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিলে নিম্নবিত্ত মানুষের পাতে দু’বেলা খাবার জোটানো কঠিন হয়ে পড়বে।
এমনিতেই বিশ্বের যে ১০টি দেশ সবচেয়ে বেশি তীব্র খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকির মধ্য দিয়ে গেছে, গত বছর (২০২৫), সেই তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক এক বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের প্রধান কারণ হলো যুদ্ধ ও সংঘাত। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাব এই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
২০২৬ সালের পূর্বাভাস দিতে গিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা আগামী বছরকে অত্যন্ত ‘ভয়াবহ’ করে তুলতে পারে। ২০২৬ এর পূর্বাভাস ইতোমধ্যে সত্যি হতে শুরু করেছে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে। সেচ, জ্বালানি ও সার সংকট, অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ফসলের ক্ষতি, পরিবেশ বিপর্যয়, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের প্রধান আলভারো লারিও বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেছেন, ‘সার এবং জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে চলতি চাষ মৌসুমে উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ তিনি ক্ষুদ্র কৃষকদের জলবায়ু-সহনশীল ফসল চাষে বিনিয়োগ বাড়ানোর এবং স্থানীয়ভাবে সার উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের কৃষককে অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা ও নদীভাঙন, পাহাড়ি ঢল, ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, সার, বীজ ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের চাপ, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য ও কৃষিজমি কমে যাওয়া এগুলো বিপর্যয়ের সাথে সবসময় লড়াই করতে হয়। যেহেতু প্রতি বছরই কোনো না কোনো দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়, বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন যত বেশি সম্ভব চাষ পদ্ধতির অ্যানালগ সিস্টেম পরিবর্তন করতে। ভবিষ্যতে টিকে থাকতে কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় সমবায়ভিত্তিক সহায়তা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
নিজেদের উদ্যোগে জমিতে যত দ্রুত সম্ভব নালা কেটে পানি বের করতে হবে। বিশেষ করে ধান, সবজি ও মরিচজাতীয় ফসল দীর্ঘসময় পানিতে থাকলে শিকড় পচে যায়। আংশিক বেঁচে থাকা গাছ বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বন্যা বা অতিবৃষ্টির পরে দ্রুত ফলন দেয় এমন ফসল লাগাতে হবে, যেমন: লালশাক, ডাটা শাক, মুলা, সরিষা, কলমি শাক ও স্বল্পমেয়াদি ধান।
কৃষকের জন্য এসব কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব যদি সরকার তাদের পাশে দাঁড়ায়। সরকার অবশ্য বোরো কৃষকদের জন্য তিন মাসের ক্ষতিপূরণ সহায়তা দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ঋণের বোঝা কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। অন্যান্য কর্মকাণ্ডের পেছনে ব্যয় কমিয়ে কৃষককে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে দ্রুত। এর পাশাপাশি দরকার সহজ শর্তে কৃষিঋণ, বিনামূল্যে বীজ, সার বা প্রণোদনা ভাতা, ফসলের ন্যায্যমূল্য, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিনীতি।
আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের কৃষকের বড় শক্তি হলো তাদের সহনশীলতা ও যোদ্ধা মনোভাব। কৃষকের মনের জোরই গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে।
৫ এপ্রিল, ২০২৬
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।
এইচআর/এমএফএ/এমএস

