Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img
Homeক্রসম্যাচ ছাড়াই রক্ত দিচ্ছে রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড সেন্টার

ক্রসম্যাচ ছাড়াই রক্ত দিচ্ছে রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড সেন্টার

রাজধানীর তিব্বত কলোনির বাসিন্দা আরিফুজ্জামান। হিমোফিলিয়ার আক্রান্ত। নিয়মিত ধানমন্ডির একটি বেসরকারি ক্লিনিকে হেমাটোলজিস্ট দেখান।

চলতি বছরের শুরুতে তাকে ৮ ব্যাগ ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা (এফএফপি) দেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। ২১ জানুয়ারি রাজধানীর রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড সেন্টার (আরসিবিসি) থেকে প্লাজমা সংগ্রহও করেন। ঝামেলা বাধে পুশ করতে গিয়ে। ধানমন্ডির সেই ক্লিনিকের মেডিকেল টেকনোজিস্টের সন্দেহ হয়। তিনি জানতে চান, রক্তের ক্রসম্যাচ করেছেন কি না? তারা জবাব দেন ‘না’। তাহলে রিপোর্ট কীভাবে আসছে?

জবাবে রোগীর স্বজন মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমি তো রোগীকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছি। রক্ত টানেনি। ক্রসম্যাচও করেনি। সেখানকার (আরসিবিসি) টেকনোলজিস্ট বলেছেন, হিমোফিলিয়ার রোগীর ক্রসম্যাচ প্রয়োজন হয় না। এভাবেই দিয়ে দিয়েছে।’

ক্রসম্যাচ লাগবে না, এমন কোনো নির্দেশনা আমাদের নেই। আমার জানা মতে, অবশ্যই ক্রসম্যাচ করতে হবে। আরও নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এটা তো তাদের বিষয়।-হিমোফিলিয়া সোসাইটির দায়িত্বরত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান

এ নিয়ে দুই মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রোগীর স্বজনের মোবাইল ফোনে কথাও বলেন। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। ক্রসম্যাচ ছাড়া প্লাজমা দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। বাধ্য হয়ে টাকা জমা দিয়ে ক্রসম্যাচ করেন এবং পরে প্লাজমা পুশ করা হয়।

হিমোফিলিয়ার রোগীর প্লাজমা দিতে কি আসলেই ক্রসম্যাচ লাগে না? তাহলে ক্রসম্যাচ রিপোর্ট দিলো কেন রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড সেন্টার? নাকি এটাই স্বাভাবিক, ধানমন্ডির ওই ক্লিনিকি অযথাই অর্থ আদায় এবং সময়ক্ষেপণ করেছে?

এসব প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে গত ২৮ এপ্রিল জাগো নিউজের এই প্রতিবেদক রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড সেন্টারে (আরসিবিসি) যান। সেখানে দায়িত্বরত অফিস সহকারী মাসুদা বেগম বলেন, ‘হিমোফিলিয়ার রোগীর ক্রসম্যাচ লাগে না। আমরা করি না। এ বিষয়ে হিমোফিলিয়া সোসাইটির নির্দেশনা আছে।’

ক্রসম্যাচ ছাড়া প্লাজমা দেওয়ার সুযোগ নেই। ক্রসম্যাচ বাধ্যতামূলক। ক্রসম্যাচ ছাড়া দিলে রোগীর শরীরে যে কোনো সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রাণঘাতী সমস্যাও হতে পারে।-ডা. হুমায়রা আলীম

তবে সেই নির্দেশনা তিনি দেখাতে পারেননি। এ নিয়ে কথা বলতে ব্লাড ব্যাংকের ইনচার্জকে (উপ-পরিচালক) অফিসে পাওয়া যায়নি।

পরে হিমোফিলিয়া সোসাইটির অফিসে যোগাযোগ করলে সংস্থাটির দায়িত্বরত হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ক্রসম্যাচ লাগবে না, এমন কোনো নির্দেশনা আমাদের নেই। আমার জানা মতে, অবশ্যই ক্রসম্যাচ করতে হবে। আরও নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এটা তো তাদের বিষয়।’

আরও পড়ুন
হামে একের পর এক শিশুর মৃত্যু, দায় কার?
ভর্তি হতে মাসের পর মাস অপেক্ষা, ভোগান্তিতে রোগীরা
হাসপাতাল ভবন আছে, সেবার কার্যক্রম নেই

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের প্রধান এবং সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুমায়রা আলীমের শরণাপন্ন হয় জাগো নিউজ। তিনি বলেন, ‘ক্রসম্যাচ ছাড়া প্লাজমা দেওয়ার সুযোগ নেই। ক্রসম্যাচ বাধ্যতামূলক। ক্রসম্যাচ ছাড়া দিলে রোগীর শরীরে যে কোনো সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রাণঘাতী সমস্যাও হতে পারে।’

হিমোফিলিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে ক্রসম্যাচ করা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়, বিশেষ করে যদি আগে থেকে কোনো স্যাম্পল সংরক্ষিত না থাকে। কারণ, এ ধরনের রোগীদের রক্ত নেওয়ার জন্য প্রিক করলে রক্তপাত দীর্ঘসময় বন্ধ না হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে নতুন করে রক্তের স্যাম্পল নেওয়া হয়নি।-রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ব্লাড প্রোগ্রামের পরিচালক ডা. শাহানা জাফর

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা শারমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ক্রসম্যাচ না করে দেওয়ার সুযোগ নেই। অবশ্যই, ক্রসম্যাচ করতে হবে।’

বিষয়টি নিয়ে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ব্লাড প্রোগ্রামের পরিচালক ডা. শাহানা জাফর জাগো নিউজের কাছে দাবি করেন, ‘হিমোফিলিয়ার রোগীর রক্তের ক্রসম্যাচ প্রয়োজন হয় না।’

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা তো বলছেন ক্রসম্যাচ লাগে। তাহলে কার বক্তব্য সঠিক? জবাবে ডা. শাহানা জাফর বলেন, ‘আমি জানি যে, ক্রসম্যাচ করা লাগে না। তারপরও টেকনোলজিস্টরা বলতে পারবেন। কাজটা তো তারা করেন।’

ক্রসম্যাচ ছাড়া রিপোর্ট দেওয়ার সুযোগ আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না। রিপোর্ট তো দেওয়ার কথা না।’

প্রতিটি ব্লাড ব্যাংকে ব্লাড ট্রান্সফিউশন স্পেশালিস্ট থাকার কথা। সেটা আছে কি না, থাকলে তার হাত দিয়ে কীভাবে এরকম ক্রসম্যাচ ছাড়া রিপোর্ট এবং ব্লাড গেলো? এগুলো তদন্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।-স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আবু আহসান মোহাম্মদ মইনুল হোসেন

পরে রিপোর্ট দেখালে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ব্লাড প্রোগ্রামের পরিচালক বলেন, ‘হিমোফিলিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে ক্রসম্যাচ করা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়, বিশেষ করে যদি আগে থেকে কোনো স্যাম্পল সংরক্ষিত না থাকে। কারণ, এ ধরনের রোগীদের রক্ত নেওয়ার জন্য প্রিক করলে রক্তপাত দীর্ঘসময় বন্ধ না হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে নতুন করে রক্তের স্যাম্পল নেওয়া হয়নি।’

তিনি আরও দাবি করেন, ‘রোগী তার হিমোফিলিয়া কার্ড প্রদর্শন করেছেন, যা বিবেচনায় নিয়ে তাকে প্রিক করা থেকে বিরত রাখা হয়, যাতে অনিয়ন্ত্রিত রক্তক্ষরণের ঝুঁকি এড়ানো যায়। সংশ্লিষ্ট টেকনোলজিস্ট ভুলবশত ক্রসম্যাচ করা হয়েছে বলে টিক চিহ্ন দিয়েছেন, যদিও বাস্তবে ক্রসম্যাচ করা হয়নি।’

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আবু আহসান মোহাম্মদ মইনুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিটি ব্লাড ব্যাংকে ব্লাড ট্রান্সফিউশন স্পেশালিস্ট থাকার কথা। সেটা আছে কি না, থাকলে তার হাত দিয়ে কীভাবে এরকম ক্রসম্যাচ ছাড়া রিপোর্ট এবং ব্লাড গেলো? এগুলো তদন্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

হিমোফিলিয়া রোগীদের শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন (ফ্যাক্টর VIII বা IX) থাকে না। সময়মতো প্লাজমা বা ফ্যাক্টর কনসেনট্রেট না দিতে পারলে রোগীর শরীরে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এসইউজে/এএসএ/এমএফএ