একসময় প্রায় নির্মূলের পথে থাকা হাম আজ আবার ফিরে এসেছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাসহ আক্রান্ত দেশগুলোতে যে রোগটিকে প্রায় নির্মূলের পথে বলে মনে করা হয়েছিল, সেই হাম আবারও ফিরে এসে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ নতুন করে বাড়ছে। দেশজুড়ে অতি সংক্রামক রোগ হাম উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত দুই মাসে (১৯ মে, ২০২৬ পর্যন্ত) হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে ৪৭৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ৬১ জেলায় রোগটির বিস্তার ঘটেছে। সর্বশেষ ৮.০৫.২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ‘… এ সময়ের মধ্যে ৩৪ হাজার ৩৮৬ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে এবং ২৩ হাজার ৪৪২ জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় চার হাজার। প্রতিদিন ৩০০–৪০০ নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও কিটের অভাবে গড়ে ১২০টির মতো পরীক্ষা করা যাচ্ছে।’ ‘…বাংলাদেশ বর্তমানে হামের এক ভয়াবহ মহামারির কবলে। দেশের হাসপাতালগুলোতে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগী শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে।’
ভাবনার বিষয় হচ্ছে, কেন এমনটি হলো? যে রোগ প্রতিরোধযোগ্য, টিকা দ্বারা নিয়ন্ত্রণযোগ্য, সেটি কীভাবে আবার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠল? প্রায় নির্মূল হওয়া হাম কেন ও কীভাবে প্রাণসংহারী হলো?
জানা গেছে, “হাম এমন একটি রোগ, যা এক দশক আগে বিজ্ঞানীরা নির্মূল করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু এখন এটি অনেক দেশে নাটকীয়ভাবে ফিরে আসছে। কানাডা এবং বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সম্প্রতি তাদের ‘হাম-মুক্ত’ মর্যাদা হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০’র বেশি হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। ২০০০’র দশকের শুরুতে তা ছিল মাত্র ১০০’র মতো। মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাজুড়েও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান টিকা-অনীহা, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদানে বিঘ্ন এবং যুদ্ধ—এসবই হাম ফিরে আসার কারণ।”
হামের এই ভয়াবহ সংক্রমণকে এখন বলা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যনীতিগত শৈথিল্য, সামাজিক বিভ্রান্তি ও বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সম্মিলিত ফল। কিন্তু যে রোগকে নির্মূল বলা হচ্ছিল, তা কি আমরা সত্যিই নির্মূল করেছিলাম, নাকি কেবল নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলাম? আমাদের দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে কয়েকশ শিশুমৃত্যুর ঘটনা এখন বিভ্রান্তি থেকে চরম আক্ষেপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে বহু শিশুমৃত্যুর পেছনে প্রথম যুক্তি হলো, টিকাদান কভারেজের সামান্য পতনই হামের পুনরুত্থানের প্রধান কারণ। হামের মতো উচ্চ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। কিন্তু ইপিআইয়ের আওতায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু এলাকায় এই হার কমে গেছে। ফলে হার্ড ইমিউনিটি ভেঙে পড়ে, আর ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয়ত, কোভিড-১৯ মহামারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এমনভাবে ব্যাহত করেছে যে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। বহু শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। এটি একটি ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি করেছে, যা হামের মতো রোগের জন্য উর্বর ক্ষেত্র।
বাংলাদেশ যদি আবারও হামের বিরুদ্ধে জয়ী হতে চায়, তবে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, অভিভাবক—সবার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ একটি শিশুর জীবননাশ শুধু একটি পরিবার বা সমাজের ক্ষতি নয়; এটি আমাদের পুরো জাতির অনাগত ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের অশনি সংকেত। তাই এর মোকাবিলায় অত্যন্ত যত্নবান হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
তৃতীয় যুক্তি হলো, টিকার ভ্যাকসিন নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব অনেক অভিভাবককে টিকা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। অথচ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, হাম টিকা নিরাপদ ও কার্যকর। এখানে তথ্যের অভাব নয়, বরং তথ্যের বিকৃতি বড় সমস্যা।
চতুর্থত, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও চলাচল। বাংলাদেশে ঘনবসতি ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসন হামের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে। একটি এলাকায় সংক্রমণ শুরু হলে তা দ্রুত অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
আমরা জানি, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম। উচ্চ জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লাল ফুসকুড়ি—এসবই এর প্রধান লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।
হাম রোগ একটি বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করে। প্রথমত, শিশুমৃত্যুর হার বাড়ায়। অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। দ্বিতীয়ত, পরিবারগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ পড়ে—চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো ইত্যাদি কারণে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। যখন একসঙ্গে অনেক শিশু আক্রান্ত হয়, তখন হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দেয়। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোও চাপে পড়ে। চতুর্থত, শিক্ষার ওপর প্রভাব পড়ে। অসুস্থতার কারণে শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না, দীর্ঘমেয়াদে তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ বারবার সতর্ক করেছে যে, হামের টিকাদানের হার কমে গেলে দ্রুত প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকা, ইউরোপ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে হামের পুনরুত্থান দেখা গেছে। অর্থাৎ, এটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বাংলাদেশ অতীতে হামের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। ২০১৪–২০১৬ সালের মধ্যে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে লাখো শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।
প্রথমত, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। প্রতিটি শিশুকে নির্ধারিত সময়ে দুটি ডোজ হাম টিকা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক সবাইকে যুক্ত করে টিকা বিষয়ে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দিতে হবে। গুজব প্রতিরোধে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল, ওষুধ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। চতুর্থত, বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর দিকে নজর দিতে হবে। বস্তিবাসী, পাহাড়ি এলাকা এবং শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী শিশুদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন। পঞ্চমত, তথ্যভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। কোথায় কতজন শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত তা দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
হাম ফিরে আসা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে জনস্বাস্থ্য অর্জনগুলো স্থায়ী নয়—সেগুলো রক্ষা করতে হয় নিয়মিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। একটি ছোট্ট অবহেলা, একটি ভুল ধারণা কিংবা একটি ব্যাহত কর্মসূচি—সব মিলেই বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ যদি আবারও হামের বিরুদ্ধে জয়ী হতে চায়, তবে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, অভিভাবক—সবার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ একটি শিশুর জীবননাশ শুধু একটি পরিবার বা সমাজের ক্ষতি নয়; এটি আমাদের পুরো জাতির অনাগত ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের অশনি সংকেত। তাই এর মোকাবেলায় অত্যন্ত যত্নবান হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।
fakrul@ru.ac.bd
এইচআর/এমএফএ/এমএস

