Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাবিতে পুনরায় বসেছে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড

২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) পুনরায় শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড বসিয়ে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (৭ মে)...
Homeনৈতিক অবক্ষয় এবং উত্তরণের উপায়

নৈতিক অবক্ষয় এবং উত্তরণের উপায়

নৈতিক অবক্ষয় আমাদের কোন পর্যায় পৌঁছেছে তা এই সংবাদটির শিরোনাম দেখলেই বুঝা যায়, ‘ধর্ষণে ১১ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বা : মাদ্রাসাশিক্ষক কারাগারে।’ প্রতিদিন কোথাও না কোথাও এ ধরনের জঘন্য কর্মের সংবাদ পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া একের পর এক ধর্ষণ গোটা জাতিকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

নৈতিক অবক্ষয়ের চরম সীমায় যেন আমরা বসবাস করছি। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের এমন এমন সংবাদ আসে যা শুনে খুবই খারাপ লাগে। ইসলাম ধর্ষণকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি। বরং বিবাহবহির্ভূত যে-কোনো যৌন সম্পর্কই ইসলামে অপরাধ হিসেবে গণ্য। ফলে ব্যভিচারী ও ধর্ষক উভয়ের জন্যই কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করেছে ইসলাম।

জিনা-ব্যভিচারের শাস্তির বিষয়ে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর। ধর্ষণ থেকে বাঁচতে যদি ধর্ষণকারীকে হত্যা করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়, তাতেও সমর্থন দিয়েছে ইসলাম। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘোষণাতেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

হজরত সাঈদ ইবনে জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে, সে শহিদ। জীবন রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সে শহিদ। দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সেও শহিদ। আর সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সেও শহিদ।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি)

হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, যদি কোনো ব্যক্তি নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে আর সে প্রতিরোধে হত্যার মতো কোনো ঘটনা ঘটে, তাতেও কোনো দোষ নেই। কেননা সম্ভ্রম বাঁচাতে গিয়ে যদি প্রতিরোধকারী নিহত হয় তবে সে পাবে শাহাদাতের মর্যাদা। এ প্রতিরোধে সম্ভ্রম লুণ্ঠনকারীও নিহত হতে পারে।

ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই সমাজে জিনা-ব্যভিচার দিন দিন বাড়ছে। নৈতিক অবক্ষয় আর চরিত্রহীনের নিন্দনীয় কাজের সব শেষের নিকৃষ্ট কাজটি হচ্ছে ব্যভিচার। শুধু ইসলাম নয়, কোনো ধর্মেই ব্যভিচারের শিক্ষা নেই। ইসলামে ব্যভিচারকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ এবং হারাম আখ্যায়িত করেছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা প্রকাশ্য অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত মন্দ পথ।’ (সুরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৩২) আর বাইবেলে বলা হয়েছে ‘তোমরা ব্যভিচার করবে না।’

শুধু ইসলাম না, কোনো ধর্মই ব্যভিচারের শিক্ষা দেয় না। দিনের পর দিন ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের মাত্রা যেন বেড়েই চলেছে। অথচ ইসলাম ও বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিশ্বব্যাপী নারী সমাজের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার এক জীবন্ত আদর্শ স্থাপন করেছেন। মানব মন ও মানব সমাজে নারী প্রগতির গোড়াপত্তন করে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। ইসলামে নারীর স্বাধীন মত প্রকাশের মৌলিক বাক-স্বাধীনতা আছে। নর-নারী উভয়ে আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে স্বীকৃত এবং কর্মফল অনুযায়ী স্বর্গ লাভের সম অধিকার প্রাপ্য। 

ধর্ষণমুক্ত একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে প্রতিটি পরিবারে নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। শুধু পরিবারে নয় বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নৈতিক শিক্ষার বিস্তার করতে হবে। এছাড়া ধর্ষক যে রাজনৈতিক দলেরই হোক না কেন, তাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দেশের আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

যেভাবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘তিনি তোমাদের এক-ই সত্তা হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার জীবনসঙ্গিণীকে একই উপাদান হতে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১) 

পবিত্র কুরআন এবং মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয়, তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যাবে না। আমাদেরকে এমনসব কর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে যা নিজেদের মনে কু-প্রভাবের সৃষ্টি করে।

হজরত রসুল করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার দু’চোয়ালের হাড্ডির মাঝখান অর্থাৎ জবানের এবং দু’পায়ের মাঝখানের অর্থাৎ লজ্জাস্থানের জামানত আমাকে দিবে, আমি তার জান্নাতের জামিন।’ (বুখারি)

যাদেরকে মহানবি (সা.) জান্নাতের নিশ্চয়তা দিয়েছেন:

এক হাদিসে রয়েছে, হজরত জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার জন্য ছয়টি গুণের নিশ্চয়তা দিতে পারবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী? তিনি বললেন,

১. কথা বলার সময় সত্য বলবে।

২. প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূরণ করবে।

৩. আমানত রাখা হলে তা যথাযথভাবে ফিরিয়ে দেবে।

৪. যে নিজের দৃষ্টি সংযত রাখবে।

৫. নিজের লজ্জাস্থান হেফাজত করবে।

৬. নিজের হাত বা প্রাণ অন্যের ক্ষতি থেকে বিরত রাখবে।’ (শুয়াবুল ইমান)

ব্যভিচারীর দোয়া আল্লাহ কবুল করেন না:

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘শেষ রাতে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে, কোনো প্রার্থনাকারী আছে কি, তার দোয়া কবুল করা হবে। কোনো আহ্বানকারী আছে কি, যার আহ্বানে সাড়া দেওয়া হবে। কোনো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আছে কি, যার দুশ্চিন্তা দূর করা হবে। তখন ব্যভিচারী এবং জালেম ছাড়া সব মুসলমানের দোয়া কবুল করা হয়।’ (তাবরানি)

বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ স্ত্রী ছাড়া কারো সাথে কোনরূপ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাকে ইসলাম কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং এটিকে মহাপাপ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই পবিত্র কুরআনের সুরা নিসায় যুদ্ধবন্দিনীকেও বিবাহ না করা পর্যন্ত তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতি তো দেয়নি, বরং কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে যে, এই বন্দিনীগণকে স্ত্রীরূপে রাখার পূর্বে স্বাধীন নারীদের ন্যায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে।

তাই আমাদেরকে প্রকৃত ইসলাম কি শিক্ষা দেয় তা গ্রহণ করতে হবে। যারা এসব অপকর্মে লিপ্ত তারাওতো কোনো না কোনো পিতা-মাতারই সন্তান। প্রত্যেকেই যদি তার পরিবারের প্রতি সব সময় খেয়াল রাখতেন তাহলে হয়ত আপনার আমার সন্তানটি ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজে জড়াতো না। আমাদের সন্তানেরা কোথায় যায়, কি করে, কার সাথে সময় কাটায় তা নিয়ে কি আমরা আদৌ চিন্তিত? এছাড়া আমাদের সন্তানরা আজ ইন্টারনেটের প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়ছে যে মনে হয় ইন্টারনেটই তার কাছে সব কিছু। সন্তানরা যেন ইন্টারনেটের অপব্যবহার না করতে পারে সে বিষয়েও পিতামাতাকে নজর রাখতে হবে। 

আমরা যদি আমাদের সন্তানকে ছোট বেলা থেকেই উত্তমভাবে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতাম তাহলে কি আজ এ ধরনের জঘন্য কাজে জড়িয়ে পরার সুযোগ পেত? অবশ্যই না। আজ আমরা আধুনিকতার নামে সন্তানদের প্রতি কোনো খেয়ালই রাখি না। আমরা আমাদের সন্তানদের উত্তম তরবিয়তের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু পাওয়ার আশা আমরা কি করে করতে পারি।

ব্যভিচারের বিভিন্ন ধরন :

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আদম সন্তানের উপর ব্যভিচারের কিছু অংশ লিপিবদ্ধ হয়েছে; সে অবশ্যই তার মধ্যে লিপ্ত হবে। (তাহলো)-

১. দুই চোখের ব্যভিচার হল দৃষ্টি,

২. আর তার দুই কানের ব্যভিচার শোনা,

৩. মুখের ব্যভিচার হল কথা বলা,

৪. হাতের ব্যভিচার হল স্পর্শ করা এবং

৫. পায়ের ব্যভিচার হল পদক্ষেপ আর

৬. অন্তরে ব্যভিচারের আশা ও ইচ্ছার সঞ্চার হয়, অবশেষে লজ্জাস্থান একে সত্যে অথবা মিথ্যায় পরিণত করে দেয়।’ (মুসলিম)

ইসলামের প্রথম যুগের জোরপূর্বক ব্যভিচার তথা ধর্ষণের কিছু বিচারের বর্ণনা-

হজরত ওয়াইল ইবনে হুজর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় এক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হলে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধর্ষককে হদের (ব্যভিচারের) শাস্তি দেন।’ (ইবনে মাজাহ) (কুরআন-হাদিসে বহু অপরাধের ওপর শাস্তির বিধান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে যে-সব শাস্তির পরিমাণ ও পদ্ধতি কুরআন-হাদিসে সুনির্ধারিত তাকে হদ বলে।)

হজরত নাফি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, ‘(হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর আমলে) এক ব্যক্তি এক কুমারী মেয়েকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে এবং ধর্ষণের ফলে মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। লোকজন ধর্ষণকারীকে হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে উপস্থিত করলে সে (ধর্ষক) ব্যভিচারের কথা অকপটে স্বীকার করে। লোকটি ছিল অবিবাহিত। তাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ মোতাবেক লোকটিকে বেত্রাঘাত করা হলো। এরপর তাকে মদিনা থেকে ফাদাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।’ (মুয়াত্তা মালিক)

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে সরকারি মালিকানাধীন (কাজে নিযুক্ত) এক গোলাম এক দাসির সঙ্গে জবরদস্তি করে ব্যভিচার (ধর্ষণ) করে। এতে ওই দাসির কুমারিত্ব নষ্ট হয়ে যায়। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ওই গোলামকে কশাঘাত (বেত্রাঘাত) করেন এবং নির্বাসন দেন। কিন্তু দাসিকে কোনো শাস্তি প্রদান করেননি।’ (বুখারি)

ইসলাম যদিও মানব সমাজকে জিনা-ব্যভিচারের আশঙ্কা থেকে বাঁচানো জন্য দণ্ডবিধি আইনের কথা উল্লেখ করেছেন। এটি নিছক বিচারের শেষ উপায়।

এ বিধান নাজিলের উদ্দেশ্য এটি নয় যে, মানুষ অপরাধ করে যেতে থাকবে আর ইসলাম হদ প্রয়োগ তথা বেত্রাঘাত, হত্যা বা দেশান্তরিত করতে থাকবে। বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, লোকেরা যেন এ অপরাধ না করে এবং কাউকে শাস্তি দেওয়া বা কারো উপর জোর-জবরদস্তি করার সুযোগই না পায়।

মূলত ধর্ষণ একটি সামাজিক ব্যাধি। মানুষের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধের ঘাটতি থাকলে সমাজে এই ব্যাধি বেড়ে যায়। কাজেই ধর্ষণ রোধের একমাত্র মুখ্য উপায় নৈতিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি করা।

ধর্ষণমুক্ত একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে প্রতিটি পরিবারে নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। শুধু পরিবারে নয় বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নৈতিক শিক্ষার বিস্তার করতে হবে। এছাড়া ধর্ষক যে রাজনৈতিক দলেরই হোক না কেন, তাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দেশের আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

তাই একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে হলে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিক ও প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে পারলে এই অপরাধ কমানো সম্ভব।

লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।
masumon83@yahoo.com

এইচআর/জেআইএম