Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: পর্দার নায়ক নায়িকারা ব্যালটে কেমন করলেন?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে রীতিমতো যেন বইছে গেরুয়া ঝড়। সব হিসাব নিকাশ পাল্টে দিয়ে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায়...
Homeপশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া ঝড়ে লন্ডভন্ড মমতার ঘাসফুল

পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া ঝড়ে লন্ডভন্ড মমতার ঘাসফুল

ধৃমল দত্ত, কলকাতা

১৫ বছর পর পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায় ফের পালাবদল। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

রাজ্যটির ২৯৪টি আসনের মধ্যে এদিন ২৯৩টি আসনে (অনিয়মের অভিযোগে ফলতা আসনে ভোটগ্রহণ আগামী ২১ মে) গণনা হয়। সরকার গড়তে দরকার ১৪৭ আসন। এরমধ্যে স্থানীয় সময় রাত ৮টা পর্যন্ত ২০৪ আসনে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি, ৮১ আসনে এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) ১টি আসনে, ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ (এজেইউপি) ১টি আসনে ও কংগ্রেস ২টি আসনে এগিয়ে রয়েছে।

কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে সোমবার (৪ মে) এই ২৯৩ আসনের গণনা শুরু হয়। এর জন্য গোটা রাজ্যে ৭৭টি গণনাকেন্দ্র খোলা হয়েছিল।

মোট ২৯৪ আসনে ভোট হয়েছে দুই দফায়। গত ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ১৫২ আসনে ও ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২ আসনে ভোটগ্রহণ হয়। দ্বিতীয় দফার ভোট শেষেই বিভিন্ন বুথ ফেরত সংস্থার জরিপেও বিজেপির সরকারে আসার ইঙ্গিত মিলেছিল। আর ফের একবার সেই বুথ ফেরত সমীক্ষার সঙ্গে মিলে গেলো আসলো ফলাফল।

এদিন ভোটের ফলাফল সামনে আসতেই কলকাতা থেকে জেলা সর্বত্র বিজেপি কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। বিজয়োল্লাসে মেতে ওঠে গেরুয়া শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা। পাশাপাশি সিঙ্গুরে ঝাল-মুড়ি বানিয়ে, ভাগ করে খান বিজেপি কর্মীরা। দেড় দশক আগে হুগলির সিঙ্গুর থেকে উত্থান হয়েছিল তৃণমূলের। সেই সিঙ্গুরেই তৃণমূল দুর্গের পতন ঘটিয়ে উত্থান হলো বিজেপির।

রাজ্যের মন্ত্রী বেচারাম মান্নাকে পিছনে ফেলে বিজেপির প্রার্থী অরূপ কুমার দাস এগোতেই আনন্দে ঝালমুড়ি বানিয়ে খান বিজেপি কর্মীরা। আবার বুলডোজার নিয়ে অভিনবভাবে জয়ের আনন্দে মাতেন মালদহের বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। সেই সঙ্গে একাধিক ডিজে বাজনা ও চলছে আবির খেলা। এমনকি, দলটির রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকেও উচ্ছ্বাসে মেতে উঠতে দেখা যায়। দলের কর্মী-সমর্থকরা তাকে মিষ্টিমুখ করান। এরপর বাজনার তালে তালে নৃত্য করতে দেখা যায় সাবেক এই কূটনীতিকে।

এবারে নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত আসন ভবানীপুর। এই আসনে তৃণমূলের প্রার্থী মমতা ব্যানার্জী। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। ১৭ রাউন্ড গণনার শেষে ২,৯৫৬ ভোট এগিয়ে আছেন শুভেন্দু। এরই মধ্যে নন্দীগ্রাম আসন থেকে জয়ী হয়েছেন শুভেন্দু। তিনি হারিয়েছেন তৃণমূলের প্রার্থী পবিত্র করকে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে এই দুইটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শুভেন্দু।

এদিকে, বিজেপির এগিয়ে থাকার খবর আসতেই বেশ কিছু জায়গায় তৃণমূল প্রার্থীদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ব্যারাকপুর রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজের গণনা কেন্দ্রে নোয়াপাড়া বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ ওঠে বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে তৃণাঙ্কুরকে উদ্ধার করেন তারা। আবার এই গণনাকেন্দ্রেই বীজপুর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সুবোধ অধিকারীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।

এর পাশাপাশি এই গণনাকেন্দ্রে ব্যারাকপুরের তৃণমূল প্রার্থী ও চলচ্চিত্র পরিচালক রাজ চক্রবর্তীকে ঘিরে চোর চোর স্লোগান দেখা যায়। বর্ধমানের এমবিসি গণনাকেন্দ্রের বাইরেও উত্তেজনা ছড়ায়। বিজেপি এগিয়ে যেতেই অতি উৎসাহীদের তাণ্ডব ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে। বর্ধমান উত্তরের তৃণমূল প্রার্থীর এজেন্টকে মারতে মারতে গণনা কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে।

কোথাও আবার তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। ফলাফল ঘোষণার আগেই কাঁথি পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ের তালা ভেঙে দেন বিজেপির কর্মী ও সমর্থকরা। পরে তৃণমূলের প্রতীকে গেরুয়া রঙ লাগিয়ে সেই কার্যালয়ের দখল নেন তারা। পশ্চিম বর্ধমানের জামুরিয়া ও বারাবনিতে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে।

অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিজেপির জয়ের খবর আসার পরে এদিন দুপুরে আচমকাই রাজ্যের সচিবালয় নবান্নের কাছে পৌঁছে যান বিজেপির নারী কর্মীরা। মুখে আবির মাখা অবস্থায়, হাতে দলীয় পতাকা নিয়ে নবান্নের সামনে তারা স্লোগান দিতে থাকেন। কিছুসময় সেখানে থাকার পরে পুলিশ তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। যদিও তার আগে নবান্নের সামনে মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনী। সূত্রের খবর, নবান্ন থেকে কোনোরকম গুরুত্বপূর্ণ নথি যাতে বাইরে বেরিয়ে না যায় সেই কারণে সেখানে উপস্থিত কর্মীদের প্রবেশ ও বাহিরের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, নির্বাচনে তৃণমূলের এই খারাপ ফলাফল নিয়ে দলের সিনিয়র সংসদ সদস্য সৌগত রায় জানিয়েছেন, ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিপিআইএম প্রার্থী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হেরে গিয়েছিলেন। রাজনীতিতে এটা হয়েই থাকে। এসআইআর ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়নি। কারণ অনেক ভোট কমে গেছে।

আরও পড়ুন
মোদী বললেন ‘অবিস্মরণীয় জয়’, অমিত শাহের উচ্ছ্বাস 
পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদল হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব পড়বে না 

বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের প্রার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে সৌগত বলেন, আমাদের লোকেরা প্রতিরোধ করবে। চার্চিলের উক্তি উদ্ধৃতি করে তিনি বলেন, জয়ের সময় উদার হও, হেরে গেলে রুখে দাঁড়াও। আমরা সেটাই করবো। তাছাড়া এতে এত বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ বাড়তে থাকায় মুখ খুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শতাব্দী রায়। তার অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল কর্মীদের বাড়ি ভাঙচুর চলছে, কিন্তু পুলিশ কোনো সহযোগিতা করছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে বারবার জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ফোন করা হলেও কেউ ফোন ধরছেন না। ফলে সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

যদিও, সিউড়ি বিধানসভায় বিজেপি প্রার্থী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জয়ের পর বলেন, বাংলার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তার কথায়, বাংলার বাঙালি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে বিদায় জানিয়েছে।

এদিকে, ভোট গণনা চলাকালীন ভবানীপুর আসনের গণনাকেন্দ্র সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে তৃণমূল প্রার্থী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর প্রবেশ করা নিয়ে উত্তেজনা ছড়ায়। মমতার আসার খবর পেয়ে গণনাকেন্দ্রে পৌঁছে যান শুভেন্দু অধিকারীও। একসময় প্রবল উত্তেজনা ছড়ায় এই আসনে। শীর্ষ দুই নেতার কাছ থেকেই মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ভবানীপুর আসনের গণনা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। নির্বাচন কমিশন জানায়, যতক্ষণ না ওই দুই প্রার্থী গণনা কেন্দ্র থেকে বের হবেন, ততক্ষণ নতুন করে গণনার কাজ শুরু হবে না। পরে মমতা নিজেই গণনাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যান। পরে ফের শুরু হয় গণনা।

আবার হেস্টিংসের গণনাকেন্দ্রে ঢোকার পরেই সেখানকার বিজেপিরসহ অন্যান্য দলের প্রার্থী ও তাদের কাউন্টিং এজেন্টরা কমিশনে অভিযোগ জানান। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মমতার ভাতিজা ও তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জীকে গণনাকেন্দ্র থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একটা সময় তাকে দেখে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা চোর বলে স্লোগান দিতে থাকে।

পরে দলের এই ফলাফল নিয়ে বিকালে মুখ খোলেন অভিষেক। বলেন, মানুষ যে রায় দেবে, সভ্য সমাজের উচিত তা মাথা পেতে নেওয়া। এখনো গণনার অনেক সময় বাকি রয়েছে। আমি দলের কাউন্টিং এজেন্টদের বলবো তারা যেন গণনাকেন্দ্র ছেড়ে বের না হন, তারা যেন ধৈর্য ধরেন।

পশ্চিমবঙ্গে এবার প্রায় ২৯০০ এর বেশি প্রার্থীর ভাগ্য পরীক্ষা হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী ছাড়াও বিজেপির জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন দিলীপ ঘোষ (খড়গপুর সদর), সাবেক কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক (মাথাভাঙ্গা), অগ্নিমিত্রা পাল (আসানসোল দক্ষিণ), স্বপন দাশগুপ্ত (রাসবিহারী), অভিনেত্রী রুপা গাঙ্গুলী (সোনারপুর দক্ষিণ), অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ (শিবপুর), অভিনেতা হিরণ্ময় চ্যাটার্জি (শ্যামপুর), আরজিকর হাসপাতালের ধর্ষণের পর হত্যার শিকার চিকিৎসকের মা রত্না দেবনাথ প্রমুখ।

অন্যদিকে, তৃণমূলের যেসব প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রী শোভন দেব চট্টোপাধ্যায় (বালিগঞ্জ), মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম (কলকাতা বন্দর), মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস (টালিগঞ্জ), অভিনেত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় (চৌরঙ্গী) প্রমুখ।

অন্য দলগুলোর মধ্যে ভাঙ্গর আসনে জয়ী হয়েছেন ‘ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের’ (আইএসএফ) প্রার্থী পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকী। বাবরি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর (রেজিনগর) প্রমুখ।

গেরুয়া ঝড়ে এবার তৃণমূলের একাধিক মন্ত্রী, বিধায়ক ও তারকা প্রার্থীরা ধরাশায়ী হয়েছেন। যাদের মধ্যে অন্যতম মন্ত্রী শশী পাঁজা (শ্যামপুকুর), মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (উত্তর দমদম), মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী (মন্তেশ্বর), মন্ত্রী সুজিত বসু (বিধান নগর), অভিনেত্রী সায়ন্তিকা ব্যানার্জি (বরানগর), পরিচালক রাজ চক্রবর্তী (ব্যারাকপুর), মন্ত্রী রথীন ঘোষ (মধ্যমগ্রাম), উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ (দিনহাটা), সাবেক মন্ত্রী গৌতম দেব (শিলিগুড়ি), অভিনেত্রী লাভলী বন্দ্যোপাধ্যায় (সোনারপুর দক্ষিণ), এশিয়ান গেমসে স্বর্ণজয়ী অ্যাথলেট স্বপ্না বর্মন (রাজগঞ্জ)।

অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরাজিত হেভিওয়েট প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন কংগ্রেসের অধীর রঞ্জন চৌধুরী (বহরমপুর), কংগ্রেসের মৌসম বেনজির নুর (মালতিপুর) প্রমুখ।

ডিডি/এসএএইচ/কেএসআর