অর্ণব দাশ
‘মায়ের কোল শিশুর প্রথম স্বর্গ’-এই কথাটার গভীরতা আসলে সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় তখন, যখন সেই আশ্রয়টা থেকে আমাদের দূরে থাকতে হয়। আমার ক্ষেত্রে একটা জিনিস খুব স্পষ্ট-পড়াশোনার জন্য দেশের বাইরে থাকায় প্রতিটা সেকেন্ডে মায়ের শূন্যতা অনুভব করি। সেই একা ঘরে বসে হঠাৎ মনে হয়, ‘ইশ, মায়ের সঙ্গে যদি একটু কথা বলতে পারলে হয়তো ভালো লাগত!’ একটা ছোট ফোন কল, মায়ের কণ্ঠস্বর-এগুলোই তখন সবচেয়ে বড় তৃপ্তি হয়ে ওঠে। যেটা হয়তো দেশে থাকাকালীন কখনো এভাবে অনুভবই করা হয়নি। মায়ের উপস্থিতি যেন আমাদের বিশাল একটা শক্তি, আর তার অনুপস্থিতি আমাদের সবচেয়ে বড় শূন্যতা।
বাবার বিরামহীন পথচলায় মা যেন এক অদৃশ্য পাওয়ার হাউস একটা নিঃশব্দ নিউক্লিয়ার শক্তি, যেখান থেকে পরিবারের প্রতিটা মানুষের শক্তির সঞ্চার হয়, সাহস পায়, বেঁচে থাকার প্রেরণা পায়। বাবা বাইরে যুদ্ধ করেন, আর মা ঘরের ভেতর থেকেই সেই যুদ্ধের জ্বালানি জোগান-নিঃশব্দে, নিরলসভাবে, কোনো অভিযোগ ছাড়া।
প্রতিদিন খেতে বসলে আমাদের মধ্যে ছোটখাটো ঝগড়া হতোই-কখনো তুচ্ছ কারণে, কখনো একেবারেই অকারণে। কিন্তু সেই ঝগড়া বেশিক্ষণ থাকত না, কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার একসঙ্গে হেসে উঠতাম। এখন মাঝে মাঝে ভাবি, এগুলো আসলে ঝগড়া না এটাই আমাদের ভালোবাসার একটা আলাদা ভাষা। এই খুনসুটিগুলোই আমাদের বন্ধনকে আরও গভীর করে, বন্ধুত্বের থেকেও বেশি আপন করে তোলে।
মা দিবসে আমি ভাবনায় মগ্ন হয় বৃদ্ধাশ্রমের মায়েদের। সন্তান কে দেখার তৃষ্ণায় যারা ঐ করিডোরে দিন গননা করেন। তাদের আর্তনাদের কথা লিখতে গিয়ে কলম থেমে যায়। আজকের দিনে আমি যদি আমার মাকে নিয়ে ভাবি, একদিন আমরা সবাই আমাদের মাকে নিয়েই ভাবতে শিখব। আর সেই ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হয়ে ওঠার দিনটিই হবে সত্যিকারের সাফল্য, তাৎপর্যপূর্ণ দিন। যেদিন পৃথিবীর কোনো বৃদ্ধাশ্রমে আর কোনো মাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেদিন আমাদের কাছে মা দিবস হবে গর্বের, হবে পরিপূর্ণতার।
আমার মায়ের মধ্যেই আমি পৃথিবীর সব মাকে খুঁজে পাই। তার হাসিতে, তার কষ্টে, তার ভালোবাসায় আমি যেন প্রতিটি মায়ের প্রতিচ্ছবি খোঁজার চেষ্টা করি। তখন অনুভব করতে পারি মা মানে একটা জীবন্ত কাব্যগ্রন্থ। কখনো বলা হয়ে উঠেনি তোমায় কতটা ভালোবাসি মা।
মাকে ভালোবাসার জন্য কিংবা মায়ের কথা বলার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন লাগে না, একটা মাত্র দিন যথেষ্টও না। তবুও মা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা যেন অন্তত একদিন থেমে মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কিন্তু শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা তখনই প্রকাশ পায়, যখন প্রতিটি দিনেই আমরা মা কে সম্মান করি, তার খোঁজ নিই, তার গল্প শুনি, তার পাশে থাকি। ভালো থাকুক সব জগৎ জননী মা।
লেখক: শিক্ষার্থী, চন্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত এবং সংগঠক, তরুণ লেখক ও কলামিস্ট
- আরও পড়ুন
পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ: ঐতিহ্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্তের পকেট
তারুণ্যের ভাবনায় রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস
কেএসকে

