ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, অনেকের কাছে এটি আবেগ, ভালোবাসা এবং জীবনের অংশ। আর সেই আবেগকেই পেশায় পরিণত করেছেন ব্রাজিলের সাবেক ধাতু শ্রমিক জার্বাস মেনেঘিনি কার্লিনি।
পশ্চিম রিও ডি জেনিইরোর ক্যাম্পো গ্রান্ডে এলাকায় নিজের ছোট্ট কর্মশালায় তিনি হাতে তৈরি করেন ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিরূপ (রেপ্লিকা), যা এখন ব্রাজিলের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বস্তু হয়ে উঠেছে।
দুঙ্গার হাতে ট্রফি দেখে মুগ্ধতায় শুরু
কার্লিনির এই যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। সে বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ব্রাজিল চতুর্থবারের মতো শিরোপা জেতে। ফাইনাল শেষে তৎকালীন অধিনায়ক দুঙ্গাকে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে দেখে মুগ্ধ হয়ে যান তিনি। সেই মুহূর্ত তার মনে গভীর ছাপ ফেলে।
কার্লিনি জানান, তখন তিনি নিজেও এমন একটি ট্রফি সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাজারে তা পাওয়া যেত না। তাই একসময় সিদ্ধান্ত নেন, নিজের হাতে নিজেই ট্রফি তৈরি করবেন।
‘তখন এসব ট্রফি বিক্রির জন্য পাওয়া যেত না। তাই আমি নিজেই বানানো শুরু করি। আজ আমি একজন ট্রফি নির্মাতা’-বলেন কার্লিনি।

যারা এই ট্রফির ক্রেতা
বর্তমানে ৫৮ বছর বয়সী এই কারিগর প্রতিটি ট্রফি হাতে তৈরি করেন। প্রথমে ছাঁচ তৈরি করা হয়, এরপর প্লাস্টার দিয়ে কাঠামো গড়ে তোলা হয়। পরে বিশেষ রং ও পালিশের মাধ্যমে সেগুলোকে আসল বিশ্বকাপ ট্রফির মতো করে সাজানো হয়। ছোট থেকে বড় বিভিন্ন আকারের ট্রফি তিনি তৈরি করেন, যার দাম প্রায় ১ ডলার থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
তার তৈরি ট্রফিগুলো সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামের আশপাশে। সেখানে ম্যাচ দেখতে আসা পর্যটক, ফুটবল সমর্থক এবং সংগ্রাহকেরা স্মারক হিসেবে এগুলো কিনে থাকেন।
তবে শুধু সাধারণ ক্রেতাই নন, ব্রাজিলের বেশ কয়েকজন কিংবদন্তি ফুটবলারও কার্লিনির তৈরি ট্রফি পেয়েছেন। তিনি উপহার দিয়েছেন পেলে, রোনালদিনহো এবং জর্জিনহোর মতো তারকাদের। এছাড়া তার তৈরি ট্রফি শুধু ব্রাজিলেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও পৌঁছেছে।

কার্লিনির মতে, তার কাজের সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো মানুষের মুখে হাসি দেখা। অনেক ফুটবলপ্রেমী তার ট্রফি হাতে নিয়ে ছবি তোলেন এবং নিজেদেরকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মতো অনুভব করেন।
তিনি বলেন, ‘যখন মানুষ ট্রফি হাতে নেয়, তাদের চোখেমুখে যে আনন্দ দেখা যায়, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। সবাই বিশ্বসেরা হতে চায়, সবাই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখে।’
আসল বিশ্বকাপ ট্রফিটি ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ দিয়ে তৈরি হলেও কার্লিনির ট্রফিগুলো প্লাস্টারের। কিন্তু তিনি মনে করেন, আবেগের দিক থেকে দুটির মূল্য অনেকটাই একই।
তার ভাষায়, ‘এগুলো সোনার নয়, কিন্তু মানুষ যখন হাতে নেয় তখন তাদের অনুভূতি ঠিক আসল ট্রফি ছোঁয়ার মতোই হয়।’
শুধু বিশ্বকাপেই সীমাবদ্ধ নয়
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিরূপেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বর্তমানে তিনি ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত পুরোনো বিশ্বকাপ ট্রফির মডেল, কোপা লিবার্তাদোরেস ট্রফি, গোল্ডেন বল, গোল্ডেন গ্লাভস এবং গোল্ডেন বুটের প্রতিরূপও তৈরি করেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে কার্লিনির কর্মশালায় এখন ব্যস্ত সময় চলছে। তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ২০০টি ট্রফি প্রস্তুত করেছেন। তবে তার বিশ্বাস, যদি ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিততে পারে, তাহলে বিক্রির সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ব্রাজিলকে আবার চ্যাম্পিয়ন দেখার স্বপ্ন
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। তারা পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তবে সর্বশেষ শিরোপা এসেছে ২০০২ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছে দেশটির সমর্থকেরা।
কার্লিনিও সেই অপেক্ষার একজন অংশীদার। তিনি বিশ্বাস করেন, ব্রাজিলের ফুটবলের আসল শক্তি তার আনন্দময় ও সৃজনশীল খেলার ধরণ।
‘ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের পরিচয় হলো আনন্দ, সৌন্দর্য আর শিল্প। আমরা যদি সেই ফুটবল খেলতে পারি, তাহলে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে’-বড় আশা নিয়েই কথাগুলো বলেন এই ফুটবলপ্রেমী কারিগর।
সূত্র: এপি
এমএমআর

