দক্ষিণ এশিয়ার তিন প্রতিবেশী দেশ—বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান। রান্নার প্রধান জ্বালানি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির (LPG) জন্য এই তিন দেশই আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিশ্ববাজারে জ্বালানির চড়া মূল্যের কারণে তিন দেশই তাদের গ্যাসের দাম পুনর্নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এই মূল্য সমন্বয়ের পর দেখা যাচ্ছে এক বৈপরীত্য।
চলতি জুন মাসের বাজার দর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজি গ্যাসের দাম অনেকটাই বেশি। এমনকি চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তানের চেয়েও বাংলাদেশের মানুষকে বেশি টাকা দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে একই প্রোপেন ও বিউটেন আমদানি করা সত্ত্বেও প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে রান্নার গ্যাসের দাম কেন এত বেশি—তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ভারতে নতুন করে বাড়ল এলপিজির দাম, তবু…
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির চড়া মূল্যের কারণে ভারতে গত ৭ জুন প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি গ্যাসের দাম এক লাফে ২৯ রুপি বাড়ানো হয়েছে। গত তিন মাসের মধ্যে এটি দ্বিতীয় দফায় মূল্যবৃদ্ধি। এর আগে গত ৭ মার্চ আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে সিলিন্ডারপ্রতি ৬০ রুপি বাড়িয়েছিল দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো।
নতুন এই দাম কার্যকর হওয়ার পর ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ১৪ দশমিক ২ কেজির একটি গৃহস্থালি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ৯৪২ রুপি, যা আগে ছিল ৯১৩ রুপি।
তবে ভারত (India) সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত খরচ বাড়লেও সাধারণ ভোক্তাদের বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা করা হয়েছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার দর ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ১৪ দশমিক ২ কেজির একটি সিলিন্ডারের প্রকৃত সরবরাহ খরচ ১ হাজার ৬০০ রুপিরও বেশি। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা কিনছেন ৯৪২ রুপিতে। বাকি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এছাড়া ‘প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা’র (PMUY) আওতায় থাকা দরিদ্র সুবিধাভোগীরা আরও কম দামে, মাত্র ৬৪২ রুপিতে এই সিলিন্ডার পাচ্ছেন।
ভারতের গ্যাস সিলিন্ডার/ ছবি: জাগোনিউজ
বাংলাদেশে জুনে কমেছে এলপিজির দাম
বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম কিছুটা কমিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সৌদি আরবের কোম্পানি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের নতুন মূল্য নির্ধারণের ওপর ভিত্তি করে গত ২ জুন এই দাম কমানো হয়।
নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে (Bangladesh) সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকা থেকে ৫৫ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৮৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সরকারি এলপিজির দাম ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা অপরিবর্তিত রয়েছে। গাড়িতে ব্যবহৃত অটো গ্যাসের দামও প্রতি লিটার ৮৬ টাকা ৯৩ পয়সা করা হয়েছে।
পাকিস্তানে গ্যাসের দাম
এই তিন দেশের মধ্যে রান্নার গ্যাসের দামে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে পাকিস্তান (Pakistan)। দেশটির তেল ও গ্যাস নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জুন মাসের জন্য এলপিজির দাম ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ বাড়িয়েছে।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০৮ দশমিক ৭৬ পাকিস্তানি রুপি। এর ফলে দেশটিতে একটি ১১ দশমিক ৮ কেজির গৃহস্থালি সিলিন্ডারের দাম মে মাসের ৩ হাজার ৫৮৫ রুপি থেকে ৫৮ রুপি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪ পাকিস্তানি রুপি। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক ৪৫ দশমিক ৪ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২২৫ রুপি বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৮৮৬ রুপি, যা দেশটির রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের ওপর বড় আঘাত হেনেছে।
তিন দেশের দামের তুলনামূলক সমীকরণ
ভিন্ন ভিন্ন দেশের সিলিন্ডারের ওজন এবং ভিন্ন মুদ্রার কারণে সাধারণ চোখে দামের পার্থক্য বোঝা কঠিন। তাই প্রকৃত তুলনা করার জন্য প্রতি কেজি গ্যাসের দাম এবং বাংলাদেশি টাকায় (বর্তমান বিনিময় হার আনুমানিক: ১ ভারতীয় রুপি = ১.২৯ টাকা, ১ পাকিস্তানি রুপি = ০.৪৪ টাকা ধরে) রূপান্তর করে নিচে একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:
| দেশের নাম | সিলিন্ডারের ওজন | স্থানীয় মুদ্রায় দাম | বাংলাদেশি টাকায় | প্রতি কেজি গ্যাসের দাম |
| ভারত (দিল্লি) | ১৪.২ কেজি | ৯৪২ রুপি | ১২১১ টাকা | ৮৫.২৮ টাকা |
| বাংলাদেশ | ১২ কেজি | ১,৮৮৫ টাকা | ১,৮৮৫ টাকা | ১৫৭.০৮ টাকা |
| পাকিস্তান | ১১.৮ কেজি | ৩,৬৪৩.৪ রুপি | ১,৬০৪ টাকা | ১৩৫.৯৩ টাকা |
ওপরের টেবিল থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, প্রতি কেজি গ্যাসের মূল্যের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ভোক্তারা সবচেয়ে কম দামে এলপিজি গ্যাস পাচ্ছেন (প্রতি কেজি প্রায় ৮৫ টাকা)। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান (প্রতি কেজি প্রায় ১৩৫ দশমিক ৯৩ টাকা) এবং সবচেয়ে বেশি দাম দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষকে (প্রতি কেজি প্রায় ১৫৭ টাকা)।
ভারত-পাকিস্তানে কম, বাংলাদেশে বেশি হওয়ার কারণ কী?
আমদানিনির্ভরতা তিন দেশেরই রয়েছে। ভারতের পেট্রোলিয়াম প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিস সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতের মোট চাহিদার (৩৩ দশমিক ২ মিলিয়ন টন) প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানি করতে হয়েছে।
আমদানিনির্ভর হওয়া সত্ত্বেও ভারতে দাম কম থাকার প্রধান কারণ হলো সরকারের বিশাল অংকের নগদ ভর্তুকি। যেখানে ১ হাজার ৬০০ রুপির সিলিন্ডার সরকার ৯৪২ রুপিতে দিচ্ছে, অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে প্রায় ৬৬০ রুপি সরকার নিজে বহন করছে।
বিপরীতে, পাকিস্তানে এলএনজিতে কোনো সরাসরি ভর্তুকি নেই। তবে এই খাত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। পাকিস্তানের এলএনজি আমদানির প্রায় ৮৭ শতাংশ আসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে করা দীর্ঘমেয়াদি সরকারি (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে। সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান যেমন—পাকিস্তান স্টেট অয়েল (PSO) এবং পাকিস্তান এলএনজি লিমিটেড (PLL) আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি ও স্পট কার্গো কেনার মূল দায়িত্ব পালন করে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের এলএনজি খাত প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান-নির্ভর। এই খাতে নেই কোনো সরকারি ভর্তুকিও। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো ধকল এসে পড়ে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।
একটি এলএনজি ট্যাংকার/ ফাইল ছবি: এএফপি
পাইপলাইনের সীমিত সুবিধা ও এলপিজি-নির্ভরতা
ভারতে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের চেষ্টা থাকলেও তা এখনো মাত্র কয়েকটি বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ভারতের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী দিল্লিতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার পাইপলাইনের গ্যাস পায়। গুজরাটে ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং মহারাষ্ট্রে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, বিহার বা পশ্চিমবঙ্গ—সব জায়গাতেই পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারের হার এক শতাংশের নিচে।
ফলে ভারতের সিংহভাগ মানুষকে সিলিন্ডার গ্যাসের ওপরই নির্ভর করতে হয়। আর এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করেই দেশটিতে এলপিজি গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে ভর্তুকির আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
পাকিস্তানেও বিশাল একটি জনগোষ্ঠী পাইপলাইন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকায় রান্নার গ্যাস হিসেবে তারা সিলিন্ডার এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। দেশটির প্রায় ৯৫ শতাংশ বা তারও বেশি এলপিজি লোহার ও ফাইবারের সিলিন্ডারে ভরে বাজারজাত করা হয়। পাকিস্তানের পাহাড়ি অঞ্চল (গিলগিট, কাশ্মীর), গ্রামীণ এলাকা এবং নতুন গড়ে ওঠা উপশহরগুলোতে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাসের পাইপলাইন সংযোগ নেই। এসব এলাকার মানুষ সম্পূর্ণ সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশে এলপিজি (LPG) সরবরাহের ক্ষেত্রে পাইপলাইনের তুলনায় সিলিন্ডারের ব্যবহার অনেক বেশি। দেশের অধিকাংশ এলপিজি ব্যবহারকারী সরাসরি সিলিন্ডার কিনে ব্যবহার করেন। নতুন করে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় এবং সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে রান্নার জ্বালানি কিনতে।
সার্বিক অর্থনীতি ও বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো কার্যকর সরকারি ভর্তুকি নীতি ও শক্তিশালী বাজার মনিটরিং না থাকার কারণেই বাংলাদেশের ভোক্তাদের সবচেয়ে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এ অবস্থায় টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য বাংলাদেশেও সরকারি পর্যায়ে এলপিজিতে ভর্তুকি দেওয়া অথবা কঠোরভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: বিইআরসি, ডন, দ্য ন্যাশন, আল-জাজিরা, ইন্ডিয়া টুডে
কেএএ/






