মো. সাব্বির হোসাইন
একটি দিয়াশলাইয়ের বাক্সে অনায়াসে পুরে ফেলা যায় আস্ত একটি শাড়ি। আঙুলের আংটির ভেতর দিয়ে পার করে দেওয়া যায় গজকে গজ মিহি কাপড়। কোনো জাদু কিংবা অলীক রূপকথা নয়; বাংলার বুক চিরে গড়ে ওঠা মসলিন শিল্পের অবিশ্বাস্য মনে হওয়া এক বাস্তব ইতিহাস এটি। যে কাপড়ের অপার্থিব স্পর্শে মুগ্ধ হয়েছিলেন রোমের সম্রাজ্ঞী থেকে শুরু করে মোগল দরবারের শাহজাদারা, তার উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটেছিল এই বাংলার মাটিতেই। এই বিশ্বখ্যাত বস্ত্রের জন্ম ও বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে গাজীপুরের কালীগঞ্জ ও তার বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী শীতলক্ষ্যা নদী।
মসলিন কেবল একটি সুকুমার শিল্পকর্ম নয়, এটি ছিল তৎকালীন প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ আর প্রকৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। আর এই মেলবন্ধনের প্রধান অনুঘটক ছিল শীতলক্ষ্যা নদী ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক পরিবেশ।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের মাটি ছিল মসলিন তৈরির প্রধান কাঁচামাল ‘ফুটি কার্পাস’ তুলার চাষের জন্য সর্বাধিক উপযোগী। শীতলক্ষ্যার জল হাওয়া ও বাতাসের বিশেষ আর্দ্রতা এই তুলার আঁশকে দিত অনন্য এক নমনীয়তা। এই বিশেষ তুলার আঁশ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল, যা সাধারণ শুষ্ক আবহাওয়ায় সুতো কাটার সময় ছিঁড়ে যেত। তাই ভোরবেলা যখন বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকত, তখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা প্রকৃতিতে বসে নিপুণ আঙুলের স্পর্শ অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে চরকায় কাটা হতো সেই কিংবদন্তি সুতো।
কালীগঞ্জের নাগরী, তুমুলিয়া ও এর আশপাশের গ্রামের তাঁতিরা ছিলেন এই শিল্পের মূল জাদুকর। বংশপরম্পরায় তারা এই সূক্ষ্ম বস্ত্র বুননের জটিল ও সংবেদনশীল কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। পুরুষরা সুতো কাটার কাঁচামাল ও তাঁতের প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কাজ করলেও, অতি সূক্ষ্ম সুতো কাটার দুঃসাধ্য কাজটি মূলত সম্পন্ন করতেন ঘরের তরুণী ও নারীরা।
এই অঞ্চলেই উৎপাদিত হতো মসলিনের অন্যতম দুর্লভ ও বিশেষায়িত সংস্করণ ‘মেঘডম্বর’। মেঘের মতো কালো বা ধূসর রঙের এই শাড়িটি ছিল মেঘের মতোই হালকা, মিহি ও পরম আরামদায়ক। বর্ষার মেঘলা আকাশের রঙের সঙ্গে মিল রেখে বোনা এই মেঘডম্বর শাড়ি মোগল অন্তপুরের নারীদের কাছে ছিল পরম সমাদৃত ও আভিজাত্যের প্রতীক।
ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে মোগল শাসকদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকা ও এর আশপাশের সোনারগাঁও, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া অঞ্চলের মসলিন শিল্প সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছায়। দিল্লির রাজদরবার থেকে শুরু করে সুদূর ইউরোপের রাজপরিবারে এই কাপড়ের চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। রোমান অভিজাত নারীরা এই সূক্ষ্ম কাপড়কে অভিহিত করতেন ‘নেবুলা’ বা কুয়াশা নামে। তৎকালীন সময়ে আভিজাত্য আর রাজকীয় মর্যাদার অন্যতম মাপকাঠিই ছিল কার পরনে কত সূক্ষ্ম ও নান্দনিক মসলিন রয়েছে।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মসলিনের ভাগ্যেও নেমে আসে চরম বিপর্যয়। বিলাতের শিল্প বিপ্লব এবং ম্যানচেস্টারের কারখানায় তৈরি সস্তা কাপড়ের একচেটিয়া বাজার নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয় বাংলার এই গৌরবকে।
তাঁতিদের ওপর চাপানো হয় আকাশচুম্বী শুল্কের বোঝা। মসলিন প্রস্তুতকারী অতিদক্ষ কারিগরদের বুড়ো আঙুল কেটে দেওয়ার মতো নৃশংস ও অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়, যাতে তারা আর কোনোদিন চরকায় সূক্ষ্ম সুতো কাটতে না পারেন। কালের পরিক্রমায় ফুটি কার্পাসের চাষ বন্ধ হয়ে যায়, হারিয়ে যায় বংশানুক্রমিক বুনন প্রযুক্তি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে বিশ্বপটভূমি থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যায় ঢাকাই মসলিন।

দীর্ঘ ১৭০ বছর পর, হারিয়ে যাওয়া সেই মসলিন রূপকথার ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে প্রাণ পেয়েছে বাংলার মাটিতে। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ উদ্যোগে, একদল দেশীয় গবেষক ও কারিগরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ঢাকাই মসলিনকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়েছে।
যে শীতলক্ষ্যার অববাহিকায় এই শিল্পের জন্ম হয়েছিল, সেই নদীর তীরেই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে স্থাপন করা হয়েছে নতুন ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’। কাপাসিয়া ও রাঙামাটি অঞ্চল থেকে বুনো ফুটি কার্পাসের আদি জাত খুঁজে বের করে নতুন করে চাষাবাদ এবং তাঁতিদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে এই হারানো ঐতিহ্য। ২০২০ সালে ঢাকাই মসলিন বাংলাদেশের নিজস্ব ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ করায় বিশ্বমঞ্চে এই গৌরব পুনরুদ্ধারের পথ আরও সুগম হয়েছে।
মসলিনের এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি কাপড়ের ফিরে আসা নয়; এটি আমাদের হারানো আত্মমর্যাদা ও বাঙালি মেধার শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বজয়। যে ঐতিহ্যকে একদা বুড়ো আঙুল কেটে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল সাম্রাজ্যবাদীরা, আজ শতবর্ষ পরে সেই একই শীতলক্ষ্যার তীরে আবারও মুখরিত হচ্ছে তাঁতের ছন্দময় খটখট শব্দে। কালীগঞ্জ ও শীতলক্ষ্যা তীরের এই সোনালি ইতিহাসকে ধারণ করে ঢাকাই মসলিন আবারও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এ প্রত্যাশা এখন আপামর বাঙালির।
লেখক: শিক্ষার্থী, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী
- আরও পড়ুন
ফুটপাতে ভাতের হোটেল: ঢাকার শ্রমজীবীদের ৩ বেলা আহারের ভরসা
পৃথিবীর যেসব স্থানে গুপ্তধন পাওয়া গেছে
কেএসকে

