মানুষ পৃথিবীর প্রায় সবকিছুরই মূল্য নির্ধারণ করতে শিখেছে। জমির দাম আছে, স্বর্ণের দাম আছে, শ্রমের দাম আছে, এমনকি জ্ঞান ও প্রযুক্তিরও বাজারমূল্য আছে। কিন্তু এমন একটি সম্পদ আছে, যার প্রকৃত মূল্য আমরা জানি, তবু প্রায়শই তার প্রতি সবচেয়ে বেশি অবহেলা করি। সেই সম্পদের নাম সময়।
সময় এমন এক সম্পদ, যা একবার চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না। অর্থ হারালে তা পুনরুদ্ধার করা যায়, হারানো সম্পদ আবার অর্জন করা যায়, এমনকি ভেঙে যাওয়া সম্পর্কও অনেক সময় জোড়া লাগে। কিন্তু হারানো সময় কোনো শক্তি, কোনো ক্ষমতা, কোনো অর্থ দিয়েই ফিরিয়ে আনা যায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষও এক মিনিট অতিরিক্ত কিনে নিতে পারেন না। তাই সময়ের মূল্য নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, অন্য কোনো সম্পদকে ঘিরে সম্ভবত তত হয়নি।
ইংরেজ দার্শনিক বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন বলেছিলেন, ‘Time is money।’ কিন্তু বাস্তবে সময় কেবল অর্থ নয়; সময় জীবন। একজন মানুষের জীবন মূলত তার সময়ের সমষ্টি। আমরা যেভাবে সময় ব্যবহার করি, প্রকৃতপক্ষে সেভাবেই জীবনকে নির্মাণ করি।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সময়ের মূল্য নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের সমাজে সময়ানুবর্তিতার সংকট যেন এক নীরব সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কোনো সভা সকাল ১০টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলে অনেকেই ধরে নেন, তা ১১টার আগে শুরু হবে না। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান, অফিসের সভা, এমনকি অনেক সরকারি কর্মসূচিতেও নির্ধারিত সময়কে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। দেরি করাকে অনেক সময় আমরা স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছি। অথচ এই অভ্যাসের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশাল।
সময় এমন এক সম্পদ, যা একবার চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না। অর্থ হারালে তা পুনরুদ্ধার করা যায়, হারানো সম্পদ আবার অর্জন করা যায়, এমনকি ভেঙে যাওয়া সম্পর্কও অনেক সময় জোড়া লাগে। কিন্তু হারানো সময় কোনো শক্তি, কোনো ক্ষমতা, কোনো অর্থ দিয়েই ফিরিয়ে আনা যায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষও এক মিনিট অতিরিক্ত কিনে নিতে পারেন না।
ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যে যানজট সৃষ্টি হয়, তা শুধু জ্বালানি বা অর্থের অপচয় নয়; এটি সময়েরও অপচয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর কর্মজীবী মানুষ বছরে শত শত ঘণ্টা যানজটে নষ্ট করেন। এই সময় যদি উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা যেত, তাহলে ব্যক্তি ও জাতীয় অর্থনীতি উভয়ই লাভবান হতো। বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে যানজট বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রতি বছর বিপুল ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। কিন্তু এই ক্ষতির একটি বড় অংশ আসলে হারিয়ে যাওয়া সময়ের ক্ষতি।
সময়ের প্রকৃত মূল্য বোঝার জন্য বড় কোনো গবেষণার প্রয়োজন হয় না। একজন মানুষ, যিনি মাত্র এক মিনিটের জন্য ট্রেন মিস করেছেন, তিনি জানেন এক মিনিটের মূল্য কত। একজন পরীক্ষার্থী, যিনি নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট পরে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে সুযোগ হারিয়েছেন, তিনি সময়ের গুরুত্ব বোঝেন। একজন ব্যবসায়ী, যিনি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির নির্ধারিত সময় মিস করেছেন, তিনিও সময়ের মূল্য উপলব্ধি করেন।
আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেন একজন মরণব্যাধিতে আক্রান্ত রোগী। একজন দুরারোগ্য ক্যানসারের রোগীর কাছে প্রতিটি দিন মূল্যবান, কখনো কখনো প্রতিটি ঘণ্টাও। হাসপাতালে শয্যাশায়ী কোনো রোগী যখন জীবনের সঙ্গে লড়াই করেন, তখন সময় আর ঘড়ির কাঁটায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে অস্তিত্বের প্রশ্ন। একজন বৃদ্ধ মানুষ, যিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন, তিনিও প্রায়শই বলেন—‘আর কিছু সময় যদি পেতাম!’ জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে মানুষ সাধারণত অর্থ বা সম্পদের জন্য আফসোস করে না; আফসোস করে হারিয়ে যাওয়া সময়ের জন্য।
সময়ের মূল্য শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে—তারা সময়কে সম্মান করতে শিখেছে। জাপানে ট্রেন কয়েক সেকেন্ড দেরি করলেও কর্তৃপক্ষ ক্ষমা চায়। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুরে সময়ানুবর্তিতা শুধু একটি অভ্যাস নয়; এটি একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সেখানে সময়মতো উপস্থিত হওয়া অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অংশ।
অন্যদিকে সময়কে অবহেলা করার সংস্কৃতি একটি জাতির সামগ্রিক অগ্রগতিকে ব্যাহত করে। যখন কোনো কর্মকর্তা নিয়মিত দেরিতে অফিসে আসেন, কোনো প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের বহু পরে শেষ হয় কিংবা কোনো সেবা পেতে নাগরিককে অযথা দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, তখন শুধু সময়ই নষ্ট হয় না; রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও কমে যায়।
আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে তাকালেও সময়ের প্রতি অবহেলার একটি নির্মম চিত্র দেখা যায়। একজন বাসচালক কয়েকজন যাত্রীর আশায় অকারণে দাঁড়িয়ে থাকেন। নির্ধারিত সময়ের কোনো গুরুত্ব থাকে না। ফলে শত শত যাত্রীর মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। একজন কর্মজীবী মানুষ অফিসে দেরি করেন, একজন রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি করেন, একজন শিক্ষার্থী ক্লাস মিস করেন। একজনের সামান্য অসচেতনতা বহু মানুষের সময় কেড়ে নেয়। অথচ সময়ের প্রতি সম্মান মানে শুধু নিজের সময়কে মূল্য দেওয়া নয়; অন্যের সময়কেও সম্মান করা।
প্রযুক্তির এই যুগে সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আমরা দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছি, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর সুবিধা পেয়েছি, কিন্তু একই সঙ্গে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অকারণে সময় ব্যয়, উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং এবং ডিজিটাল আসক্তি অনেক মানুষের উৎপাদনশীল সময় কেড়ে নিচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তি ব্যবহার করা, প্রযুক্তির দ্বারা ব্যবহৃত না হওয়া।
সময়কে মূল্য দিতে শেখার শুরু হতে পারে পরিবার থেকেই। শিশুদের ছোটবেলা থেকে সময়মতো ঘুমানো, পড়াশোনা করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং সময়ানুবর্তিতার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও সময় ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সময়মতো কাজ সম্পন্ন করাকে শুধু নিয়ম নয়, পেশাগত নৈতিকতার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও সময়ের মূল্যায়ন জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে, সরকারি সেবায় জটিলতা হ্রাস করতে হবে এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ উন্নয়ন শুধু অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে আসে না; উন্নয়ন আসে সময়ের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে।
সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—এটি কখনো থেমে থাকে না। নদীর স্রোতের মতো সময়ও নিজের গতিতে বয়ে চলে। আমরা তাকে কাজে লাগাতে পারি, আবার অপচয়ও করতে পারি। কিন্তু সে কারও জন্য অপেক্ষা করে না।
প্রকৃতপক্ষে সময়ের মূল্য কত—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর নেই। একজন ট্রেন মিস করা যাত্রীর কাছে এক মিনিটের মূল্য এক রকম, মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর কাছে একদিনের মূল্য আরেক রকম, আর একটি জাতির কাছে কয়েক বছরের অপচয় উন্নয়নের বহু সুযোগ হারানোর সমান। তাই সময়ের মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না; তা মাপা যায় সম্ভাবনা, অর্জন, সম্পর্ক, জীবন ও ভবিষ্যতের পরিমাপে।
আমরা প্রায়ই বলি, ‘সময় নেই।’ অথচ সত্য হলো, আমাদের সবার কাছেই দিন-রাতের সমান ২৪ ঘণ্টা থাকে। পার্থক্য তৈরি করে আমরা সেই সময়কে কতটা সম্মান করি। যে ব্যক্তি সময়কে মূল্য দেয়, সময়ও শেষ পর্যন্ত তাকে মূল্য দেয়। আর যে জাতি সময়কে সম্মান করতে শেখে, উন্নয়ন ও অগ্রগতিও শেষ পর্যন্ত সেই জাতির দরজায় কড়া নাড়ে।
প্রশ্নটি তাই আমাদের সবার জন্য—আমরা কি এখনো সময়কে অবহেলা করে যাব, নাকি সময়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে নিজের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও সুশৃঙ্খল ও সমৃদ্ধ করে তুলব? কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সাধারণত একটি কথাই উপলব্ধি করে—পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল সময়, অথচ সেটিই সবচেয়ে বেশি অপচয় করেছি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
drharun.press@gmail.com
এইচআর/এমএফএ/এএসএম

