হজ-ওমরাহ পালন করার সময় কিছু নির্দিষ্ট ভুল-ত্রুটি হলে কাফ্ফারা হিসেবে একটি কোরবানির উপযুক্ত পশু (একটি ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, অথবা গরু, মহিষ বা উটের এক সপ্তমাংশ) জবাই করে দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হয়। এই পশু জবাইকেই ‘দম দেওয়া’ বলা হয়। দম হারামের সীমানার ভেতরেই দিতে হয়। দমের পশুর সব গোশত দরিদ্রদের দান করে দিতে হয়। দম দাতা দমের পশুর গোশত খেতে পারে না।
যেসব কারণে দম ওয়াজিব হয়
মিকাত সংক্রান্ত ভুল
১. হজ, ওমরা বা অন্য যেকোনো কারণে মক্কায় যাওয়ার সময় মিকাত পার হওয়ার আগেই ইহরাম না বাঁধলে — মিকাতের বাইরে ফিরে গিয়ে ইহরাম বাঁধতে হবে, না হলে দম দিতে হবে।
খুশবু ব্যবহার সংক্রান্ত ভুল
২. ইহরাম অবস্থায় মাথা, মুখ, দাড়ি, হাত, পা, রান ইত্যাদি বড় অঙ্গে পুরোপুরি খুশবু লাগালে দম ওয়াজিব।
৩. নাক, কান, গোঁফ, আঙুলের মতো ছোট অঙ্গে বেশি পরিমাণ খুশবু লাগালেও দম ওয়াজিব।
৪. শরীরের বিভিন্ন জায়গায় একটু একটু করে খুশবু লাগানো হলে—সেগুলো একসাথে যোগ করলে যদি একটা বড় অঙ্গের সমান হয়, তাহলেও দম দিতে হবে।
৫. কাপড়ে এক বর্গবিঘত বা তার বেশি পরিমাণ খুশবু লাগিয়ে সেই কাপড় পুরো একদিন বা একরাত পরে থাকলে দম ওয়াজিব।
৬. মাজন বা টুথপেস্টে খুশবুর পরিমাণ বেশি থাকলে এবং তা ব্যবহার করলে দম ওয়াজিব।
৭. ঘ্রাণযুক্ত কিছু পুরো কপালে লাগালে দম দিতে হবে।
মেহেদি সংক্রান্ত ভুল
৮. ইহরাম অবস্থায় নারীরা হাতে মেহেদি লাগালে দম ওয়াজিব।
৯. পুরুষরা পুরো হাতের তালু বা পুরো দাড়িতে মেহেদি লাগালে দম ওয়াজিব।
পোশাক সংক্রান্ত ভুল
১০. শরীরের মাপে তৈরি সেলাইযুক্ত পোশাক ইহরাম অবস্থায় পুরো একদিন বা একরাত পরে থাকলে দম ওয়াজিব।
১১. ইহরাম অবস্থায় পায়ের মাঝের উঁচু হাড় ঢেকে যায় এমন জুতো, বুট বা মোজা পুরো একদিন বা একরাত পরলে দম ওয়াজিব।
১২. পুরো মাথা, থুতনি, মুখ বা অন্তত চার ভাগের এক ভাগ কাপড় দিয়ে পুরো একদিন বা একরাত ঢেকে রাখলে দম ওয়াজিব।
চুল ও পশম সংক্রান্ত ভুল
১৩. ইহরাম অবস্থায় মাথা বা দাড়ির চুলের এক-চতুর্থাংশ বা তার বেশি কাটলে, মুণ্ডন করলে বা উপড়ালে দম ওয়াজিব।
১৪. পুরো ঘাড়, পুরো বগল বা নাভির নিচের পশম সম্পূর্ণ পরিষ্কার করলে দম ওয়াজিব।
যৌন সম্পর্ক সংক্রান্ত ভুল
১৫. উত্তেজনার সাথে কোনো নারীকে চুমু দিলে বা লজ্জাস্থান মিলিত করলে দম ওয়াজিব—বীর্যপাত হোক বা না হোক। তবে এতে হজ নষ্ট হবে না।
১৬. আরাফার উকুফের আগে সহবাস করলে দম ওয়াজিব এবং হজও নষ্ট হয়ে যাবে। সেই বছর বাকি কাজগুলো করে যেতে হবে এবং পরের বছর হজ কাজা দিতে হবে।
তাওয়াফ সংক্রান্ত ভুল
১৭. জানাবাত বা হায়েজ-নেফাস অবস্থায় তাওয়াফে জিয়ারত করলে পূর্ণ গরু বা উট দম দিতে হবে।
আরাফা ও মুজদালিফা সংক্রান্ত ভুল
১৮. ৯ জিলহজ সূর্যাস্তের আগেই আরাফার সীমানা ছেড়ে চলে গেলে দম দিতে হবে। তবে সূর্যাস্তের আগেই ফিরে এলে দম লাগবে না।
১৯. সুবহে সাদিকের আগে মুজদালিফা ছেড়ে চলে গেলে দম দিতে হবে। (অসুস্থ ও নারীদের জন্য মাফ।)
কঙ্কর নিক্ষেপ সংক্রান্ত ভুল
২০. সব দিনের রমী বা কোনো একদিনের পুরো রমী ছেড়ে দিলে অথবা কিছু অংশ না করলে দম দিতে হবে।
২১. ১১ ও ১২ জিলহজ সূর্য ঢলার আগে কঙ্কর নিক্ষেপ করলে সূর্য ঢলার পর আবার করতে হবে, না করলে দম ওয়াজিব।
কোরবানি ও ধারাবাহিকতা সংক্রান্ত ভুল
২২. কিরান ও তামাত্তু হজকারীদের জন্য দমে শোকর (হজের কোরবানি) ওয়াজিব। না করলে আলাদা দম দিতে হবে।
২৩. কিরান ও তামাত্তু হজকারীদের ক্ষেত্রে — কঙ্কর নিক্ষেপ → কোরবানি → মাথা মুণ্ডন, এই ক্রম মানা ওয়াজিব। ইফরাদ হজকারীর ক্ষেত্রে — কঙ্কর নিক্ষেপ → মাথা মুণ্ডন, এই ক্রম মানা ওয়াজিব। ক্রম উল্টে গেলে দম দিতে হবে।
২৪. ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে হলক বা কছর না করলে দম ওয়াজিব।
বিদায়ী তাওয়াফ সংক্রান্ত ভুল
২৫. বিদায়ী তাওয়াফ না করলে দম দিতে হবে।
যেসব কারণে সদকা ওয়াজিব হয়
হজ-ওমরাহ পালনের সময় কিছু ভুলের কারণে দম ওয়াজিব না হলেও ‘সদকা’ ওয়াজিব হয়। সদকা হলো এক ফিতরা পরিমাণ অর্থ বা খাবার দান করে দেওয়া। সদকা ওয়াজিব হওয়ার কারণগুলোও তুলে ধরা হলো।
খুশবু সংক্রান্ত ভুল
১. ছোট অঙ্গে অল্প পরিমাণ খুশবু লাগালে সদকা ওয়াজিব।
২. কাপড়ে খুশবুর পরিমাণ এক বর্গবিঘতের কম হলে বা একদিন-একরাতের কম সময় পরলে সদকা ওয়াজিব।
পোশাক সংক্রান্ত ভুল
৩. সেলাইযুক্ত পোশাক একদিনের কম কিন্তু এক ঘণ্টার বেশি পরলে সদকা ওয়াজিব।
৪. এক ঘণ্টার কম পরলে শুধু এক মুষ্টি গম পরিমাণ সদকা করলেই হবে।
৫. মাথা ঢাকার ক্ষেত্রে একদিন-একরাতের কম সময় ঢাকলে সদকা ওয়াজিব।
৬. পায়ের হাড় ঢাকা জুতো বা মোজা একদিনের কম পরলে সদকা ওয়াজিব।
চুল ও পশম সংক্রান্ত ভুল
৭. মাথা বা দাড়ির এক-চতুর্থাংশের কম চুল কাটলে বা উপড়ালে সদকা ওয়াজিব।
৮. ঘাড়, বগল বা নাভির নিচের পশমের কিছু অংশ (পুরো নয়) পরিষ্কার করলে সদকা ওয়াজিব।
৯. অজু বা অন্য কোনোভাবে তিনটি চুল পড়ে গেলে এক মুষ্টি গম পরিমাণ সদকা করতে হবে। ইচ্ছাকৃত উপড়ালে প্রতিটির জন্য আলাদাভাবে এক মুষ্টি করে দিতে হবে। তিনের বেশি উপড়ালে পূর্ণ সদকা দিতে হবে।
১০. রান্নার সময় চুল পুড়ে গেলে সদকা করতে হবে। তবে রোগের কারণে বা ঘুমের মধ্যে পুড়লে কিছু ওয়াজিব হয় না।
নখ সংক্রান্ত ভুল
১১. আঙুলের নখ কাটলে প্রতিটি নখের জন্য একটি করে সদকা ওয়াজিব। তবে ভাঙা নখ কাটলে কিছু ওয়াজিব হয় না।
উকুন সংক্রান্ত ভুল
১২. ইহরাম অবস্থায় একটি উকুন মারলে একটি রুটি বা খেজুর দান করতে হবে। দুই বা তিনটি মারলে এক মুষ্টি গম পরিমাণ দান করতে হবে। তিনের বেশি মারলে পূর্ণ একটি সদকা দিতে হবে।
হারামের ভেতরে গাছ ভাঙার ভুল
১৩. হারামের সীমানায় নিজে থেকে জন্মানো কোনো গাছ কাটলে বা ভাঙলে সদকা ওয়াজিব।
ওএফএফ

