Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

আইসিসিবিতে চলছে ফুড এগ্রো মেডিটেক্স ও হেলথ ট্যুরিজম এক্সপো 

রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ফুড, এগ্রো, মেডিটেক্স ও হেলথ ট্যুরিজম এক্সপো- ২০২৬। বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুর ১২টায়...
Homeঅতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা

অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা

শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন আর কোনো ‘নীরব বিষয়’ নয়; এটি দ্রুতই একটি বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগে পরিণত হচ্ছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, শিক্ষার চাপ এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে শিশুদের মানসিক অবস্থায় নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

জাতীয় শিশু মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা সপ্তাহ উপলক্ষে এসব বিষয় নিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. জেবুন নাহারের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ।

জাগো নিউজ: বর্তমানে বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিত্রটা আপনি কীভাবে দেখছেন? সবচেয়ে বেশি কোন ধরনের সমস্যাগুলো সামনে আসছে?

ডা. জেবুন নাহার: বর্তমানে বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক সমস্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৭-১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে শতকরা ৯৪ ভাগের মানসিক রোগ বিদ্যমান রয়েছে। আমরা ক্লিনিক্যালি যেসব সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখি তার মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা, অস্থিরতা বা উদ্বেগজনিত সমস্যা এবং আচরণগত সমস্যা যেমন অতিরিক্ত রাগ বা আক্রমণাত্মক আচরণ।

এখন অনেক শিশুর মধ্যে মনোযোগের ঘাটতি ও অতিচঞ্চলতা দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও ইন্টারনেটে আসক্তি, এমনকি পর্ণ আসক্তি ও মাদকাসক্তি ও লক্ষ্যণীয়। কিছু ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা একাকীত্বের প্রবণতাও বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো অনেক শিশু সমস্যায় ভুগলেও তারা দীর্ঘদিন ধরে শনাক্ত হয় না, ফলে সমস্যা জটিল হয়ে ওঠে।

জাগো নিউজ: সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে?

ডা. জেবুন নাহার: ডিজিটাল ডিভাইস এখন শিশুদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এর ইতিবাচক দিক থাকলেও নেতিবাচক প্রভাবও কম নয়। ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া, মাথাব্যথা, খিটখিটে মেজাজ খুব বেশি দেখা যায়। এর পাশাপাশি সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল করে দিচ্ছে।

অনেক শিশু এখন ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটায়, ফলে বাস্তব জীবনে বন্ধুত্ব বা পারিবারিক যোগাযোগে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের শিশু খুব অল্পতেই একাকিত্বে ভোগে। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো সাইবার বুলিং বা হয়রানি, যা অনেক শিশুর মধ্যে গভীর মানসিক আঘাত তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন
নীরবে বাড়ছে কোলোরেক্টাল ক্যানসার, সচেতনতার ঘাটতিতে দেরিতে শনাক্ত
বমি-ডায়রিয়া হালকাভাবে নেবেন না, হতে পারে ‘স্টমাক ফ্লু’
ভয় নয়, সময়মতো সার্জারি বাঁচাতে পারে জীবন

জাগো নিউজ: পড়াশোনার চাপ, প্রতিযোগিতা ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা এসব বিষয় শিশুদের মানসিক অবস্থাকে কতটা প্রভাবিত করছে?

ডা. জেবুন নাহার: এটি একটি বড় কারণ। অনেক শিশু এখন পড়াশোনাকে আনন্দ হিসেবে নয়, চাপ হিসেবে অনুভব করে। ভালো ফলাফল, ভালো স্কুল বা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা-এই প্রত্যাশাগুলো অনেক সময় শিশুর ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। অনেক অভিভাবক না জেনে শিশুর তুলনামূলক ক্ষমতার বাইরে প্রত্যাশা চাপিয়ে দেন। ফলে শিশুর মধ্যে ভয়, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং ব্যর্থতার আতঙ্ক তৈরি হয়। শিশু যখন অনুভব করে যে তার ভালোবাসা শুধু সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে, তখন তার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

জাগো নিউজ: শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়?

ডা. জেবুন নাহার: শহরাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে মূল সমস্যা হলো পড়াশোনার চাপ, প্রতিযোগিতা, ডিজিটাল আসক্তি ও মাদকাসক্তি। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে সমস্যা অনেক সময় ভিন্ন; সেখানে সচেতনতার অভাব, স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ এবং পারিবারিক দারিদ্র্যের চাপ বেশি দেখা যায়। তবে একটি সাধারণ বিষয় দুই জায়গাতেই রয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না থাকা। শহরে যেমন সমস্যা দ্রুত শনাক্ত হয়, গ্রামে অনেক সময় সমস্যা অনেক দেরিতে ধরা পড়ে।

জাগো নিউজ: পরিবারে অশান্তি, বিচ্ছেদ বা সহিংসতা শিশুদের মানসিক বিকাশে কীভাবে প্রভাব ফেলে?

ডা. জেবুন নাহার: পরিবার একটি শিশুর প্রথম নিরাপত্তা বলয়। সেই বলয় ভেঙে গেলে শিশুর মানসিক স্থিতি নষ্ট হয়। পরিবারে অশান্তি বা সহিংসতা থাকলে শিশুর মধ্যে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা এবং পারস্পরিক আস্থার অভাব তৈরি হয়। অনেক শিশু এই অভিজ্ঞতার কারণে বড় হয়ে সম্পর্ক তৈরি করতে সমস্যায় পড়ে। কেউ কেউ আবার আক্রমণাত্মক আচরণ শিখে ফেলে, কেউ আবার পুরোপুরি নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

জাগো নিউজ: অনেক সময় অভিভাবকরা শিশুদের মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না বা বুঝতে পারেন না, এক্ষেত্রে কী কী লক্ষণ দেখলে সতর্ক হওয়া উচিত?

ডা. জেবুন নাহার: কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো অবহেলা করা উচিত নয়। যেমন: শিশুর আচরণ হঠাৎ পরিবর্তন হওয়া, অতিরিক্ত রাগ বা কান্না, ঘুমের সমস্যা, পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়া, একা থাকতে চাওয়া বা বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া। এছাড়া শরীরে কোনো কারণ ছাড়াই ব্যথা অনুভব করা বা বারবার অসুস্থতার অভিযোগ করাও মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। যদি এসব লক্ষণ দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জাগো নিউজ: স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

ডা. জেবুন নাহার: স্কুল শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। শিক্ষকদের উচিত শুধু পাঠ্যবই নয়, শিশুর মানসিক অবস্থাও বোঝার চেষ্টা করা। স্কুলে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকা দরকার, যেখানে শিশু নিরাপদভাবে নিজের সমস্যাগুলো বলতে পারে। পাশাপাশি সহপাঠীদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সহনশীলতা গড়ে তোলাও জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তাহলে অনেক সমস্যা কমে যাবে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কতটা সহজলভ্য? এই খাতে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?

ডা. জেবুন নাহার: বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য। শহরাঞ্চলে কিছু সুবিধা থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তা খুবই কম। প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো-বিশেষজ্ঞের অভাব, সচেতনতার ঘাটতি এবং সামাজিক ট্যাবু। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী শিশু-কিশোরদের মধ্যে চিকিৎসা সেবাপ্রাপ্তি গ্যাপ প্রায় শতকরা ৯৪ ভাগ। অনেক পরিবার এখনও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে রোগ হিসেবে না দেখে দুর্বলতা কিংবা বদ নজর বা জিনের আছর হিসেবে দেখে। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত সেবার ঘাটতিও রয়েছে।

জাগো নিউজ: শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে এখনো নানা ধরনের ট্যাবু বা ভুল ধারণা রয়েছে, এগুলো দূর করতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

ডা. জেবুন নাহার: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। গণমাধ্যম, স্কুল, মাদরাসা এবং পরিবার, সব জায়গা থেকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার। মানসিক স্বাস্থ্যকে লজ্জার বিষয় হিসেবে না দেখে একটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত। কেননা মানসিক স্বাস্থ্যকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ কখনোই বলা যাবে না। এছাড়া শিক্ষাক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যেন ছোটবেলা থেকেই সচেতনতা তৈরি হয়।

জাগো নিউজ: অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের জন্য আপনার নির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ কী, যাতে তারা শিশুদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে পারেন?

ডা. জেবুন নাহার: অভিভাবকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়, বরং শিশুর কথা শোনা জরুরি। শিশুকে সময় দিতে হবে, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে তার সক্ষমতা অনুযায়ী প্রত্যাশা রাখা উচিত। প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ করা দরকার, পাশাপাশি বাস্তব জীবনের খেলাধুলা ও সামাজিক কার্যক্রমে উৎসাহিত করা উচিত।

জাগো নিউজ: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। সবশেষে যদি পাঠকদের জন্য কোনো বার্তা দিতেন।

ডা. জেবুন নাহার: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আসলে শিশুর মানসিক বিষয় নিয়ে একবাক্যে কিছু বলা সম্ভব নয়। পরিবার, স্কুল ও সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে তবেই একটি সুস্থ ও মানসিকভাবে শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব।

জেএস/এমএমএআর