Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

পাবনার হাটে এখনো জমেনি বেচাকেনা

পাবনায় এখনো জমে ওঠেনি কোরবানির পশু বেচা-কেনার হাট। হাটগুলো ক্রেতা-বিক্রেতায় ঠাসা থাকলেও কেনা-বেচা হচ্ছে কম। তবে বেচাকেনা যেটুকু হচ্ছে তাতে গরুর মণ প্রতি দর...
Homeধুলো ওড়ানো সেই দুপুরের স্মৃতি আজ এক চিলতে দীর্ঘশ্বাস

ধুলো ওড়ানো সেই দুপুরের স্মৃতি আজ এক চিলতে দীর্ঘশ্বাস

 

কার্তিক-অগ্রহায়ণের সোনালী ধান কেটে নেওয়ার পরই গ্রামবাংলার মাঠগুলো খাঁ খাঁ রূপ নিত। ঠিক তখনই শুরু হতো এক অন্যরকম উন্মাদনা। মাটির সোঁদা গন্ধ আর শুকনো খড়ের ওড়াউড়ি ছাপিয়ে চারপাশ থেকে ভেসে আসত গমগমে ঢোলের আওয়াজ- ‘দ্রিম দ্রিম, ঠাট ঠাট!’

সেই চেনা বাদ্যির আওয়াজ শুনেই চাদর মুড়ি দেওয়া বুড়ো থেকে শুরু করে ছেলে-ছোড়ার দল ছুটে যেতেন পাড়ার বড় মাঠে। হ্যাঁ, বলা হচ্ছে গ্রাম-বাংলার একসময়ের তুমুল জনপ্রিয়, শৌর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক ‘ষাঁড়ের লড়াই’-এর কথা।

এইতো, মাত্র দুই-দশক আগেও গ্রামে গ্রামে হরহামেশা দেখা যেত ‘ষাঁড়ের লড়াই’। দেখা যেত, এক জোড়া অবলা জীবের শক্তির মহড়া। সেই লড়াইয়ে ছিল টানটান উত্তেজনা। উদাস দুপুরের সেই আয়োজন দেখতে জড়ো হতেন পাড়াগাঁয়ের হাজারো মানুষ। আজ সময়ের বিবর্তনে, আধুনিকতার করাল গ্রাসে সেই উৎসবের ঢোলে কাঠি পড়ে না বললেই চলে।

রাজকীয় লালন আর বিচিত্র নামের বাহার

এই খেলায় অংশ নেওয়া ষাঁড়গুলো সাধারণ কোনো গৃহপালিত পশু ছিল না। তারা ছিল গৃহস্থের অহংকার। লড়াইয়ের জন্য ষাঁড় বাছাই করে তাকে আলাদাভাবে পরম যত্নে লালন-পালন করা হতো। খইল, ভুসি, কলা, ডিম আর খাঁটি খাঁটি দুধ খাইয়ে তাদের শরীরটাকে করা হতো পাথরের মতো নিরেট।

লড়াইয়ের দিন সকালে এদের সাজানো হতো রাজপুত্রের মতো। কপালে লাল কাপড়, গলায় বাহারি রঙের ঘুঙুর আর শিংয়ে মাখানো হতো খাঁটি সরিষার তেল। রোদে সেই শিং যখন চকচক করে উঠত, তখন তাদের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ জাগত মনে। একেকটি ষাঁড়ের নামও হতো খাসা ‘কালা মানিক’, ‘পদ্মার ঢেউ’, ‘বাংলার বাঘ’, কিংবা ‘তুফান’। নামের ডাকেই যেন অর্ধেক লড়াই জিতে যেত তারা!

মাঠ কাঁপানো সেই উন্মাদনা

খেলা শুরুর আগে যখন মাইকে বা ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হতো, তখন দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে মানুষ পিলপিল করে ছুটে আসত। মাঠের চারপাশের গাছে, ঘরের চালে তিল ধারণের জায়গা থাকত না। যখন দুই দিক থেকে দুই দানবীয় ষাঁড় মাটিতে ক্ষুর দিয়ে ধুলো উড়িয়ে, ফোঁস ফোঁস গর্জন করে একে অপরের দিকে ছুটে আসত, গ্যালারিতে তখন পিনপতন নীরবতা।

আর যখনই দুটোর শিংয়ে শিংয়ে ঠোকাঠুকি হতো, মটমট শব্দে কেঁপে উঠত বাতাস, অমনি হাজারো মানুষের সমবেত চিৎকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠত। জয়ী ষাঁড়ের মালিককে দেওয়া হতো কাঁসার থালা, কলসি কিংবা রঙিন টেলিভিশন। তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল গ্রামের মানুষের সেই বুক চিতিয়ে বলা অহংকার ‘ঐডা আমাগো গাঁয়ের বলদ!’

আরও পড়ুন:

কেন থমকে গেল ঐতিহ্য?

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই উৎসবের মাঠগুলো খাঁ খাঁ করে। পঞ্জিকার পাতা উল্টে শীত আসে, খরা আসে, কিন্তু গ্রামীণ মেঠো পথ ধরে আর কোনো লড়াকু ষাঁড় বুক ফুলিয়ে হেঁটে যায় না।

এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে কিছু অমোঘ বাস্তবতা-

প্রাণী অধিকার ও নিষ্ঠুরতার বিতর্ক: আধুনিক সময়ে প্রাণী কল্যাণ সংস্থাগুলোর তীব্র আপত্তি এই খেলার ওপর বড় ধাক্কা দিয়েছে। অবলা প্রাণীকে বিনোদনের স্বার্থে এভাবে ইনজুরি বা আঘাতের মুখোমুখি করাকে নিষ্ঠুরতা হিসেবে গণ্য করা হয়, যা আইনত নিষিদ্ধ।

তহবিল ও অর্থনৈতিক সংকট: একটি লড়াকু ষাঁড়কে বছরের পর বছর রাজকীয়ভাবে খাইয়ে-দাইয়ে বড় করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখন আর সেই বাড়তি সচ্ছলতা বা বিলাসিতা নেই বললেই চলে।

সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি: জুয়া বা বাজি ধরার প্রবণতা এবং ধর্মীয় ও নৈতিক কারণেও সময়ের সাথে সাথে সমাজ থেকে এই খেলা কমে গেছে।

স্মৃতির ক্যানভাসে এক চিলতে দীর্ঘশ্বাস

স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা আজকের প্রজন্ম হয়তো কোনোদিন বুঝবে না, একটা ষাঁড়ের পিঠে হাত বুলিয়ে পুরো একটা গ্রামের মানুষের একাত্ম হয়ে যাওয়ার আনন্দ কেমন ছিল।

নিষ্ঠুরতার বিতর্ক একপাশে সরিয়ে রাখলেও, গ্রামীণ বাংলার মিলনমেলা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য আর মেঠো সংস্কৃতির যে নিটোল রূপ এই উৎসবগুলোতে লুকিয়ে ছিল, তা সত্যিই অনন্য। ষাঁড়ের লড়াই হয়তো আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী, কিন্তু গ্রামীণ মানুষের হৃদয়ে আজও সেই ঢোলের বাড়ি আর ধুলো ওড়ানো দুপুরের স্মৃতি এক চিলতে দীর্ঘশ্বাস হয়েই রয়ে গেছে।

জেএস/