কিংবদন্তি পেলে তার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি মজা করছি না, সে আমার উত্তরসূরি হতে পারে।’ মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ শিরোপা যার হাতে উঠেছিল, ২৩ বছর বয়সে যিনি টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেন এবং ফাইনালে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করতে পারেন সেই কিলিয়ান এমবাপে সম্পর্কে ফুটবল সম্রাট পেলের এমন মন্তব্য করাটা খুব বেশি অবাক করার মত নয়।
২০২৬ বিশ্বকাপের আগে কিলিয়ান এমবাপের বয়স হচ্ছে ২৭ বছর। এই বয়সেই ফরাসী এই তারকা নিজেকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের কাতারে নিয়ে গেছেন। মোনাকো, প্যারিস সেন্ট জার্মেইন (পিএসজি) ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ক্লাব ফুটবলে তার সাফল্য এবং ফ্রান্স জাতীয় দলের জার্সিতে ৯৬ ম্যাচে ৫৬ গোল- সব মিলিয়ে এমবাপের অর্জনের গল্প লিখতে গেলে পুরো একটি বইও কম পড়ে যাবে।
২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপ জয় করে কিংবদন্তির কাতারে নাম লেখানো শুরু করেছিলেন এমবাপে। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও তিনি ফ্রান্সকে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনারে তুলেছিলেন। শুধু তাই নয়, ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে দলকে শিরোপার খুব কাছাকাছিও নিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও শ্বাসরুদ্ধকর ৩-৩ গোলে ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যায় ফ্রান্স।
বিশ্বকাপে আরেকটি ইতিহাসের অপেক্ষায় এমবাপে
২৭ বছর বয়সেই লক্ষ্য টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল
কিলিয়ান এমবাপের বয়স মাত্র ২৭ বছর। এ বয়সেই তিনি নিজেকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করেছেন। মোনাকো, পিএসজি এবং রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ক্লাব ফুটবলে যেমন সাফল্য পেয়েছেন, তেমনি ফ্রান্স জাতীয় দলের জার্সিতেও গড়ে তুলেছেন অসাধারণ এক ক্যারিয়ার। জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ৯৬ ম্যাচে করেছেন ৫৬ গোল।

২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৪-২ গোলের ব্যবধানে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতানোর পথে গোল করেছিলেন এমবাপে। পেলের পর বিশ্বকাপ ফাইনালে সবচেয়ে কম বয়সী হিসেবে গোল করেন তিনি।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও প্রায় একাই দলকে টানা দ্বিতীয় শিরোপা এনে দেয়ার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন এমবাপে। করেছিলেন দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক। তবে অবিশ্বাস্যভাবে ৩-৩ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে ৪-২ ব্যবধানে হেরে রানার্সআপ হতে হয় ফ্রান্সকে। যদিও দুই ফাইনালে ৪ গোল করে বিশ্বকাপের ফাইনালে সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব এখন এমবাপের দখলে।
এখন একটাই প্রশ্ন- প্যারিসের উপকণ্ঠের বন্ডির সেই ছেলেটি কি এবার টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠে নতুন ইতিহাস গড়তে পারবেন? উত্তর মিলবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে।
ক্লাব এবং জাতীয় দলে এমবাপের অর্জন
ক্লাব ফুটবলে ইতোমধ্যেই ১৮টি ট্রফি জয় করেছেন এমবাপে
* মোনাকোর হয়ে জেতেন ২টি শিরোপা।
* পিএসজির হয়ে জয় করেন ১৪টি ট্রফি, যার মধ্যে ৬টি ফরাসি লিগ ওয়ানের শিরোপা রয়েছে।
* ২০২৪ সালের জুনে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর জয় করেছেন আরও ২টি ট্রফি।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মোনাকোর হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল এমবাপের। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হন তিনি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলেও সাফল্যে ভরা কিলিয়ান এমবাপের ক্যারিয়ার…
* ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয় করেছেন
* ২০২২ বিশ্বকাপে হয়েছেন রানার্সআপ
* ২০১৮ বিশ্বকাপে ৪ গোল করে হয়েছেন সেরা উদীয়মান ফুটবলার
* ২০১৬ সালে জেতেন ইউরোপিয়ান অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা
* ২০২১ সালে জয় করেন উয়েফা নেশনস লিগ

এমবাপের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু গতি নয়, গোল করার অসাধারণ দক্ষতাও। পিএসজির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা এমবাপে, করেছেন ২৫৬ গোল। ২০১৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা ছয়বার ফরাসি লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপ ফাইনালে এমবাপের গোলসংখ্যাও সবার চেয়ে বেশি। ২০১৮ সালের ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একটি এবং ২০২২ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে করেছিলেন হ্যাটট্রিক, মোট ৪টি।
এমবাপেকে নিয়ে ফুটবল কিংবদন্তিদের মন্তব্য
কিংবদন্তি পেলে বলেন, ‘এমবাপে আমার উত্তরসূরি হতে পারে, আমি মজা করছি না। গতির সঙ্গে খেলার যে ক্ষমতা, সেখানে আমি নিজের অনেক কিছুই তার মধ্যে দেখি।’

১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী জিনেদিন জিদান বলেন, ‘সে ইতিহাস গড়বে এবং সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে।’
প্রেডরাগ মিয়াতোভিচ বলেন, ‘এই মুহূর্তে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় আছে- তিনি কিলিয়ান এমবাপে।’
আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসির মন্তব্য, ‘সে ভিন্ন ধরনের খেলোয়াড়। এক-অন-ওয়ানে ভয়ঙ্কর, দ্রুতগতির, প্রচুর গোল করে। সে সম্পূর্ণ একজন ফুটবলার।’
সাবেক পিএসজি এবং বর্তমানে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের কোচ টমাস টুখেল বলেন, ‘তার মানসিকতা হাঙরের মতো। সবকিছু জিতে নিতে চায়।’
ব্রাজিলয়ান কিংবদন্তি রোনালদিনহো বলেন, ‘কি অসাধারণ এক ফুটবলার! তাকে খেলতে দেখতেই ভালো লাগে।’
এমবাপেকে নিয়ে কিছু অজানা তথ্য
১৪ বছর বয়সে এক সপ্তাহের ট্রায়ালের জন্য রিয়াল মাদ্রিদে গিয়েছিলেন এমবাপে। সেখানে তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন জিনেদিন জিদান নিজে। তবে পরে এমবাপে মোনাকোতেই যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
যদিও ছোটবেলা থেকে রিয়াল মাদ্রিদের ভক্ত ছিলেন, তবুও আরেকটি বিদেশি ক্লাবও অনুসরণ করতেন- এসি মিলান। তার মা ফায়জা লামারি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মিলান হারলে এমবাপে রিমোট ছুড়ে মারত এবং ইতালিয়ান ভাষায় গাল দিত।’

২০১৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৪-৩ গোলে জয়ের ম্যাচের পর ফ্রান্স দলের কয়েকজন সতীর্থ তাকে ডাকতেন ‘৩৭’ নামে। কারণ, ওই ম্যাচে এক অবিশ্বাস্য দৌড়ে তার গতি ধরা পড়েছিল ঘণ্টায় ৩৭ কিলোমিটার।
২০২৪ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইউরোপের একটি পেশাদার ক্লাবের মালিকদের একজন হয়ে যান এমবাপে। নিজের কোম্পানির বিনিয়োগ শাখার মাধ্যমে ফরাসি ক্লাব এসএম কাঁ-র ৮০ শতাংশ মালিকানা কিনে নেন তিনি।
ইনস্টাগ্রামে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফরাসি ফুটবলারও এমবাপে। তার অনুসারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি।
বিশ্বকাপে এমবাপের পরিসংখ্যান
- ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে এক বিশ্বকাপ ফাইনালে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন এমবাপে। এর আগে ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্ট ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেছিলেন।
- ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে মাত্র ২৩ বছর ১১ মাস ২৯ দিন বয়সে দুইটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলার হন এমবাপে।
- ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স ফাইনালে উঠলে ব্রাজিলের কাফুর রেকর্ডও স্পর্শ করতে পারেন তিনি। কাফু টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছিলেন- ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২ সালে।
- বর্তমানে বিশ্বকাপে এমবাপের গোল সংখ্যা ১২। ২০২৬ বিশ্বকাপে আরও ৫ গোল করতে পারলে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাবেন তিনি।
- একই সঙ্গে ফ্রান্সের কিংবদন্তি জাস্ট ফন্টেইনের ১৩ গোলের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবেন। মাত্র দুই গোল করলেই বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবেন তিনি।
বিশ্বকাপে এমবাপের যাত্রা
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ ছিল এমবাপের প্রথম বিশ্বকাপ আসর। আর প্রথম আসরেই বাজিমাত করেন তিনি।
* গ্রুপ পর্বে পেরুর বিপক্ষে করেন জয়সূচক গোল
* আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ ষোলোতে করেন জোড়া গোল
* আদায় করেন একটি পেনাল্টিও
* ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও গোল করেন
* ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রেখে জিতে নেন হুন্দাই ফিফা ইয়াং প্লেয়ার অ্যাওয়ার্ড।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও ছিলেন দুর্দান্ত..
* অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪-১ জয়ে গোল করেন
* ডেনমার্কের বিপক্ষে ২-১ জয়ে জোড়া গোল করেন
* পোল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে আবারও দুই গোল করেন
* সঙ্গে একটি অ্যাসিস্ট

সবশেষে ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্মরণীয় হ্যাটট্রিক করেন। যদিও টাইব্রেকারে হারায় শিরোপা জেতা হয়নি। তবে টুর্নামেন্ট শেষে ৮ গোল করে জিতে নেন অ্যাডিডাস গোল্ডেন বুট এবং অ্যাডিডাস সিলভার বল।
২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সম্ভাবনা
তারকায় ঠাসা দল নিয়ে এবারও শিরোপার অন্যতম দাবিদার ফ্রান্স। রক্ষণে আছেন উইলিয়াম সালিবা ও দায়ো উপামেকানো। মিডফিল্ডে আছেন মানু কোনে ও আদ্রিয়েন রাবিও, এনগোলা কন্তে।
তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তাদের আক্রমণভাগ। অধিনায়ক এমবাপের পাশাপাশি উসমান ডেম্বেলে গত এক বছরে ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। ২০২৫ সালে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে এনে দেয় ‘দ্য বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার’ ও ব্যালন ডি’অর পুরস্কার।
বায়ার্ন মিউনিখের মাইকেল ওলিসেও হতে পারেন টুর্নামেন্টের বড় তারকা। বুন্দেসলিগায় ৫৫ ম্যাচে তার গোল ২২টি, অ্যাসিস্ট ৩৬টি। এছাড়া রায়ান শেরকি ও দেজিরে দুয়ের মতো তরুণরাও আলোচনায় আছেন। ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে সেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হন দুয়ে।
২০২৬ বিশ্বকাপের পরই ১৪ বছরের দায়িত্ব শেষে বিদায় নেবেন কোচ দিদিয়ের দেশম। তাই শেষটা রাঙাতে মরিয়া থাকবে এমবাপে ও তার দল।
ফ্রান্স তাদের গ্রুপ ‘আই’ অভিযান শুরু করবে ১৬ জুন নিউইয়র্কের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। এরপর ২২ জুন ফিলাডেলফিয়ায় খেলবে ইরাকের বিপক্ষে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ২৬ জুন বোস্টনে মুখোমুখি হবে আরলিং হালান্ডের নরওয়ের।
আইএইচএস/

