রাজধানীর ব্যস্ততম প্রবেশপথগুলোর একটি যাত্রাবাড়ীর ধোলাইপাড়। বছরের অন্য সময়ে যানজট আর কোলাহলে মুখর থাকা এ এলাকা ঈদুল আজহা সামনে এলেই যেন আরও বদলে যায়। নগরজীবনের ক্লান্তি পেছনে ফেলে প্রিয়জনের কাছে ফিরতে হাজারো মানুষ ভিড় জমায় এখানে।
ঈদযাত্রা ঘিরে এসময় বাস কাউন্টার, ফুটপাত, অলিগলি-সবখানেই ঘরমুখো মানুষের ব্যস্ত পদচারণা থাকে। হাতে ব্যাগ, কাঁধে শিশু, মুখে ক্লান্তি থাকলেও ঈদযাত্রীদের চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠে বাড়ি ফেরার আনন্দ।
সোমবার (২৫ মে) দুপুর থেকেই ধোলাইপাড় এলাকায় বাড়তে থাকে মানুষের চাপ। দূরপাল্লার বাসগুলো একের পর এক ছেড়ে যাচ্ছে দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে। যাত্রীরা কেউ বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে টিকিটের খোঁজ করছেন। বাস কাউন্টার ঘিরে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সারি। যানজট, ভ্যাপসা গরম আর মানুষের ভিড়—সবকিছুর মাঝেও ছিল ঈদের আমেজ।

সন্ধ্যার দিকে ধোলাইপাড় এলাকা জনস্রোতে পরিণত হয়। বাসের হর্ন, যাত্রীদের ডাকাডাকি আর যানবাহনের শব্দে পুরো এলাকা সরগরম হয়ে ওঠে। তবুও সেই কোলাহলের মাঝেও ছিল উৎসবের আবহ। ক্লান্তি আর দুর্ভোগ ছাপিয়ে মানুষের মুখে ছিল ঘরে ফেরার তৃপ্তি। এখানে প্রতিটি বাস যেন বহন করে নিয়ে যাচ্ছে মানুষের অপেক্ষা, ভালোবাসা আর শেকড়ে ফেরার গল্প।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাস ধরতে এসেছেন অনেকে। শিশুদের হাতে ছোট ব্যাগ, কেউ আবার নতুন জামা পরে যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছে। অনেকেই বলছিলেন, বছরের পুরো সময়টা ঢাকায় কাটলেও ঈদ মানেই গ্রামে ফেরা। সেখানে অপেক্ষায় থাকেন বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন আর শৈশবের কতশত স্মৃতি।
বরিশালগামী এক যাত্রী মো. জসিম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, সারাবছর চাকরির কারণে ঢাকায় থাকি। ঈদের সময়টুকু পরিবারের সঙ্গে কাটানোর জন্যই এতো কষ্ট করে রওনা দিয়েছি। রাস্তায় ভোগান্তি আছে, তারপরও বাড়ি যাওয়ার আনন্দটাই বড়।
একই কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গৃহিণী রুমানা আক্তার বলেন, ছোট দুই সন্তান নিয়ে ভিড় সামলানো কঠিন। কিন্তু গ্রামে না গেলে ঈদই যেন পূর্ণ হয় না। বাচ্চারাও দাদা-দাদির সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য অপেক্ষা করে থাকে।

ধোলাইপাড় এলাকায় শুধু যাত্রী নয়, ব্যস্ত সময় পার করছেন পরিবহন শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। বাসের সহকারীরা যাত্রীদের ব্যাগ উঠানো, সিট বুঝিয়ে দেওয়া এবং গন্তব্য ঘোষণা নিয়ে ব্যস্ত। অন্যদিকে, ফুটপাতজুড়ে জমে উঠেছে পানীয়, শুকনো খাবার ও ভ্রমণসামগ্রীর অস্থায়ী দোকান। কেউ পানি কিনছেন, কেউ শিশুদের জন্য বিস্কুট বা চিপস নিচ্ছেন। বিক্রেতাদের মুখেও ছিল বাড়তি বিক্রির হাসি।
স্থানীয় এক ফল বিক্রেতা সাইদুল ইসলাম বলেন, ঈদের আগে এই কয়দিন আমাদের বেচাকেনা অনেক বেড়ে যায়। সারাদিন মানুষ আসা-যাওয়া করে। পানি, ফল আর হালকা খাবারের চাহিদা বেশি থাকে।
যাত্রাবাড়ী-ধোলাইপাড় এলাকা রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র হওয়ায় এখানে প্রতিবার ঈদেই বাড়তি চাপ তৈরি হয়। তবে এবার যাত্রীদের অভিযোগ ছিল, অনেক পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করছে। কেউ কেউ সময়মতো বাস না পাওয়ার অভিযোগও করেন। দীর্ঘ অপেক্ষায় শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের ভোগান্তিও চোখে পড়েছে।
খুলনাগামী যাত্রী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, টিকিট আগে কেটেছিলাম, তারপরও নির্ধারিত সময়ে বাস ছাড়েনি। কয়েক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। ঈদের সময় এসব সমস্যা প্রতিবছরই হয়।
তবে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের কারণে শিডিউলে কিছুটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। সড়কে যানজট কমাতে ট্রাফিক পুলিশও কাজ করছে। বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিও দেখা যায়।
একটি পরিবহনের কর্মী মো. মিলন বলেন, পশুর হাটের কারণে রাস্তায় কিছু কিছু জায়গায় যানজট হচ্ছে। এ কারণে গাড়ি কাউন্টারে আসতে দেরি হচ্ছে। এছাড়া অন্য কোনো সমস্যা নেই। গাড়ি এলে আমরা আটকে রাখছি না। যত দ্রুত সম্ভব যাত্রী তুলে বাস ছেড়ে দিচ্ছি।

ধোলাইপাড়ের চিত্রে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে মানুষের আবেগ। কেউ বৃদ্ধ মাকে নিয়ে বাসে উঠছেন, কেউ শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে ভিড় ঠেলে এগোচ্ছেন। আবার কেউ প্রিয়জনকে বিদায় জানিয়ে চোখ মুছছেন। নগরজীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও ঈদ যেন মানুষকে আবার শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে নেয়।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা ছিল বেশি। অনেকে বছরের একমাত্র লম্বা ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যান। সেখানে পশু কোরবানি, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা এবং উৎসব ভাগাভাগির আনন্দই তাদের প্রধান আকর্ষণ। তাই বাড়তি ভাড়া কিংবা দীর্ঘ যাত্রা—কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারে না।
ঝিনাইহদের গ্রামের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসের অপেক্ষায় ধোলাইপাড়ের ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মুহাইমিনুল বলেন, ঢাকায় সব আছে, কিন্তু ঈদের সময় গ্রামের মতো শান্তি কোথাও নেই। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঈদের নামাজ, কোরবানি—সবকিছুর জন্য মন টানে। তাই কষ্ট হলেও প্রতিবার ঈদের সময় গ্রামে যাই।
এমএএস/এমকেআর

