এক হামজা দেওয়ান চৌধুরী এসে বাংলাদেশের ফুটবলের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন। এরপর বাংলাদেশ ফুটবলে যোগ হন সামিত সোম, ফাহমিদুল ইসলামের মত প্রবাসী ফুটবলাররা। যারা বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন জাগরণ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) হামজা-সামিত সোমদের মতো আরও প্রবাসী বাংলাদেশী ফুটবলারের খোঁজ করতে শুরু করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবল দলে খুঁজে আনা হয়েছিল রোনান সুলিভান এবং ডেক্লান সুলিভানের মতো ফুটবলারদের। যারা বাংলাদেশের ফুটবলকে নতুন স্বপ্নে বিভোর করে তুলেছে।
এবার বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন সংযোজন হতে যাচ্ছেন ইংল্যান্ডে খেলা আরও দুই তরুণ সম্ভাবনাময়ী ফুটবলার- ফারহান আলি ওয়াহিদ এবং রায়ান আলি ওয়াহিদ। ফারহান আলী ওয়াহিদ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ-২ (বয়স ভিত্তিক দলের ফুটবলারদের জন্য প্রিমিয়ার লিগ) এ খেলেন ফুলহ্যামের হয়ে। লেফট উইং পজিশনের এই ফুটবলার মে মাসের সেরা প্রিমিয়ার লিগ-২ ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার ছোট ভাই রায়ান আলি ওয়াহিদ খেলেন ওকিং এফসির হয়ে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য ইংল্যান্ড প্রবাসী এই দুই ফুটবলার সম্মতি জানিয়েছেন বলে আজ এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন বাফুফে সহ-সভাপতি ফাহাদ করিম।
কয়েকদিন আগেই একটি টিভিকে ফাহাদ করিম বিদেশী বংশোদ্ভূত দুই ভাইয়ের বাংলাদেশের হয়ে খেলার কথা জানিয়েছিলেন। আজ ভিডিও বার্তায় সেই দুই ভাইয়ের নাম এবং পরিচয় বিস্তারিত তুলে ধরেন বাফুফের এই সহ-সভাপতি।
তিনি বলেন, ‘আমি সম্প্রতি একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রবাসী খেলোয়াড়ের এনাউন্সমেন্টের কথা বলেছিলাম। এ নিয়ে তুমুল আগ্রহ দেখতে পেয়েছি। আজকে আসলে আমি একজন নয়, দু’জন খেলোয়াড়ের নাম ঘোষণা করবো। সম্প্রতি আমি সুলিভান ব্রাদারসকে নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজকেও আমি দুই ভাইয়ের কথা বলব, তবে তারা জমজ নয়। ওয়াহিদ ব্রাদার্স; একজন হল অনেক পরিচিত। তিনি হচ্ছেন ফারহান আলি ওয়াহিদ এবং একই সাথে তার ছোট ভাই রায়ান আলী ওয়াহিদ। ওয়াহিদ ব্রাদার্স এখন বাংলাদেশের।’
কিভাবে ইংল্যান্ড প্রবাসী এই দুই ভাইকে বাংলাদেশের ফুটবলে নিয়ে আসতে যাচ্ছেন, সে ঘটনা প্রকাশ করেন ফাহাদ করিন। তিনি বলেন, ‘ঘটনার শুরুটা হয় গত মাসে অ্যাডাম রবার্টস নামে একজন ফুটবল এজেন্ট, যিনি দুই ওয়াহিদ ভাইয়েরই এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। তিনি মূলত যুক্তরাজ্যের একটি কোম্পানির হয়ে কাজ করেন। তিনি আমাদের ফেডারেশনের যে অফিসিয়াল ইমেইল আছে সেখানে ইমেইল করে বলেন যে, ফারহানকে রিপ্রেজেন্ট করছেন এবং তিনি বাংলাদেশের জন্য আমাদের কারো সাথে কথা বলতে চান। ওই ইমেইলটা আমরা সভাপতি মহোদয়কে (তাবিথ আউয়াল) ফরোয়ার্ড করি এবং তিনি তখন আমাকে এবং টেকনিক্যাল টিমকে ইমেইলটা ফরোয়ার্ড করেন।’
‘ওই সময় আমরা কানাডায় ছিলাম ফিফা ও এএফসি কংগ্রেসে। সেখানে থাকতেই ইমেইলটা দেখি এবং সাথে সাথে আমি প্রেসিডেন্টকে বলি যে- আমরা সঠিক পথে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি। কারণ, এই দুই ফুটবলারের মাঝে দারুণ প্রতিভা রয়েছে। উনি তখনই আমাকে অনুমতি দেন এবং আমি কানাডায় বসেই তার যে এজেন্ট এডামের সাথে কথা বলি। আমরা একমত হই যে ফারহান, রায়হান এবং তার বাবা- একই সাথে আমি তাদের সাথে জুম মিটিং করতে চাই। কারণ, খেলোয়াড়দের বাবা-মায়ের অনুমতিটা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।’
‘আমরা একটা জুম মিটিং করি যেখানে রায়ান, ফারহান ছিল এবং তার বাবা ও অ্যাডাম ছিল। এদিকে আমি ছিলাম। আমরা অনেকক্ষণ- বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করি। ফারহানের অনেক কিছু জানার ছিল, রায়ানও কিছু কথা বলে এবং তাদের বাবা- যাকে আমি আব্দুল ভাই বলে ডাকি- তারও অনেক কিছু প্রশ্ন ছিল। সে সঙ্গে তাদের মায়েরও অনেক কিছু জানার ছিল। একই সাথে রিপ্রেজেন্টিং অ্যাডাম- তিনিও অনেক কোশ্চেন করেন বাংলাদেশ সম্পর্কে, আমাদের দলের অবস্থান সম্পর্কে, আমাদের প্ল্যান সম্পর্কে, আমাদের কোন কোন খেলা হবে না হবে- সব কিছু নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হয়।’
‘মিটিংয়ের পর আমাদের সঙ্গে আব্দুল ভাই অর্থাৎ তাদের বাবা একমত হন যে- হ্যাঁ, তিনি তার উভয় ছেলেকেই সম্মতি দিচ্ছেন বাংলাদেশের পক্ষে খেলার জন্য, লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য!’
ফাহাদ করিম এরপর বলেন, ‘আমি দ্রুত তাদের দুজনের সকল ডকুমেন্টস কালেক্ট করে ফেলি এবং আমরা কিছুটা প্রিলিমিনারি কাজও করেছি। আমরা আশা করছি ঈদের পরই তাদের কাজ একদম ফুলফিল হবে। এবং আমরা খুব আত্মবিশ্বাসী যে জুলাইয়ের শুরুর কিংবা সর্বোচ্চ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের উভয়েরই পাসপোর্ট সংক্রান্ত সকল কাগজের কাজ শেষ হয়ে যাবে।’
ফারহানের পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে ফাহাদ করিম বলেন, ‘একটু বলতে চাই ফারহান সম্বন্ধে। ফারহান এই মুহূর্তে ফুলহ্যামের হয়ে খেলছে প্রিমিয়ার লিগ-২ এ। যেখানে তিনি বেশ কয়েকবার প্লেয়ার অফ দ্য মান্থ নমিনেশন পেয়েছিলেন এবং নভেম্বরে লাস্ট এখন কিন্তু উনি প্লেয়ার অফ দ্য সিজনের যে নমিনিজ আছে তার মধ্যেও আছেন। তার সামনে দারুণ ক্যারিয়ার রয়েছে। তার যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক ছোট বয়সে চেলসির যুব একাডেমি থেকে। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন খেলেন এবং তারপর তিনি চলে আসেন ফুলহ্যাম এবং গত কয়েক বছর উনি ফুলহ্যামের সাথে আছেন। নিয়মিত এই দলের হয়ে অনূর্ধ্ব-২১ প্রিমিয়ার লিগ ২-তে খেলছেন। আশা করছি খুব দ্রুতই অন্য আরেকজন বাংলাদেশী খেলোয়াড় হিসেবে হয়তোবা মেইন প্রিমিয়ার লিগে দেখব ইনশাল্লাহ।’
‘ফারহান একজন হচ্ছে ডান পায়ে খেলা একজন উইঙ্গার। খেলায় গোল করা এবং অ্যাসিস্ট করার ক্ষেত্রে দারুণ মুন্সিয়ানা রয়েছে তারা। আমি মনে করি, ফারহান আলীর সংযোজন আমাদের সিনিয়র ন্যাশনাল টিমের জন্য দারুণ কিছু হবে। আমি উদগ্রিব হয়ে অপেক্ষায় আছি, আগামী সেপ্টেম্বর উইন্ডোতে তাকে বাংলাদেশ দলে যুক্ত করার। ওই সময় আমরা যে টুর্নামেন্টটা চিন্তা করছি, যে আমরা আয়োজন করব কিংবা আমরা কোন একটা টুর্নামেন্ট বিদেশে যাব, সেখানে ডেফিনেটলি ফারহানকে স্বাগত জানাতে পারবো। এছাড়া পরের নভেম্বরে সাফ হবে ইনশাল্লাহ, সেখানেও ডেফিনেটলি দতকে আশা করছি।’
এরপর ফারহানের ছোট ভাই রায়ানকে নিয়ে ফাহাদ করিন বলেন, ‘রায়হান এখন ওকিং এফসি নামে একটি ক্লাবে আছেন। উনি গ্রাসরুট লেভেলে শফ এফসিতে খেলছিলেন, যেখান থেকে ওই টিমটা গ্রাসরুট লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। রায়হানও ডান পায়ের এবং উনি মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতে পছন্দ করেন। উনি এখনও বেশ তরুণ। আমাদের বয়সভিত্তিক যে দলটা হবে- অনূর্ধ্ব-২০ বা অনূর্ধ্ব-২৩, সেখানে অবশ্যই তাকে যুক্ত করতে পারবো। আমরা খুব আত্মবিশ্বাসী যে ওয়াহিদ ব্রাদার্সের দুই ভাই- ফারহান আলি ওয়াহিদ এবং রায়হান আলি ওয়াহিদ দুজনকে ইনশাল্লাহ আমরা বাংলাদেশের হয়ে খেলতে, লাল সবুজের জার্সি পরে খেলতে খুব শিগগিরই দেখব ইনশাল্লাহ।’
আইএইচএস/

