নিশ্চিত টিকিট থাকার পরও যাত্রীদের আসন দিতে না পারায় ভারতীয় রেলওয়েকে বড় অংকের জরিমানা করেছেন দেশটির একটি আদালত। ট্রেনের সংরক্ষিত আসন খালি না পেয়ে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে বাধ্য হওয়ায় চার যাত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের বিহার রাজ্যের ভোজপুর জেলা ক্রেতা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গত ১২ মে এই ঐতিহাসিক রায় দেন। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে গত ২৭ মে। রায়ে সেবার ঘাটতি এবং যাত্রীদের হয়রানির জন্য উত্তর-মধ্য রেলওয়ে ও ভারতের রেল মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে দায়ী করা হয়েছে।
কী ঘটেছিল সেদিন?
চার যাত্রী উত্তর প্রদেশের বিন্ধ্যাচল (মির্জাপুর) থেকে বিহারের আরা (ভোজপুর) যাওয়ার জন্য লোকমান্য তিলক টার্মিনাস (এলটিটি) পাটনা এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কেটেছিলেন।
তবে ট্রেনের কামরায় উঠে তারা দেখতে পান, তাদের সংরক্ষিত আসনগুলো আগে থেকেই কিছু লোক দখল করে রেখেছেন, যারা নিজেদের রেলওয়ের নিজস্ব কর্মী বলে পরিচয় দেন। ভুক্তভোগী যাত্রীরা তাদের আসন ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেও লোকগুলো তা শোনেননি এবং আসন ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। ফলে পুরো যাত্রা পথেই ওই চার যাত্রীকে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে হয়।
আরও পড়ুন>>
ভারতে রেল দুর্ঘটনায় এক বছরে ২১ হাজারের বেশি মৃত্যু
ট্রেনের ধাক্কায় এক বছরে ১৩ হাজার গরুর মৃত্যু, বিপাকে ভারত
ভারতের ইতিহাসে যত ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা
অভিযোগে বলা হয়, ট্রেন চলাকালীনই ভুক্তভোগী যাত্রীরা রেলওয়ের অফিশিয়াল হেল্পলাইন নাম্বার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রেল সেবা’ ও ‘রেল মন্ত্রণালয়’কে ট্যাগ করে অভিযোগ জানান। মোবাইল ফোনে অভিযোগের ট্র্যাকিং নম্বর সংবলিত একটি ফিরতি এসএমএস এলেও ট্রেন যাত্রার মধ্যে রেল কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
পরবর্তীতে ট্রেনটি বক্সার স্টেশনে পৌঁছালে সেখানে কর্তব্যরত একজন টিটিই (ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনিয়ার)-এর কাছেও যাত্রীরা এই বিষয়ে প্রতিকার চান। কিন্তু ওই টিটিই রেলে প্রচণ্ড ভিড়ের অজুহাত দেখিয়ে যাত্রীদের নিজেদের মতো পরিস্থিতি ‘ম্যানেজ’ বা মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
আদালতে রায়, বড় জরিমানা
মামলাটি ক্রেতা আদালতে গড়ালে রেলওয়ে প্রশাসন নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। আদালতের কাছে তাদের যুক্তি ছিল, যাত্রীদের আসন দখলসংক্রান্ত এই বিরোধটি আসলে একটি আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা, যা সরকারি রেলওয়ে পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত, রেল প্রশাসনের নয়। একই সঙ্গে, তারা সেবার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতির কথাও অস্বীকার করে।
তবে যাত্রীদের জমা দেওয়া ট্রেনের টিকিট, ট্র্যাকিং মেসেজ এবং ঘটনার ছবি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে আদালত রেলওয়ের দাবি নাকচ করে দেন। ভোজপুর ক্রেতা আদালতের সভাপতি কৃষ্ণ প্রতাপ সিং এবং সদস্য কমল কিশোর সিংয়ের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে বলেন, রেলওয়ের সেবার চরম ঘাটতির কারণে যাত্রীরা তীব্র ‘মানসিক, শারীরিক ও অর্থনৈতিক হয়রানির’ শিকার হয়েছেন।
এর ফলে ভোজপুর ক্রেতা আদালত পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে চার অভিযোগকারীকে বড় অংকের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে রেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভাররতীয় রেলওয়েকে ট্রেনের মূল টিকিটের মূল্য ১ হাজার ৮৭৬ দশমিক ৮০ রুপি আট শতাংশ বার্ষিক সুদসহ ফেরত দিতে হবে। যাত্রীদের মানসিক ও শারীরিক হয়রানির জন্য ২০ হাজার রুপি জরিমানা দিতে হবে। পাশপাশি, মামলা পরিচালনার খরচ বাবদ দিতে হবে আরও ১৫ হাজার রুপি দিতে হবে।
আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যদি নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করা না হয়, তবে অভিযোগকারীরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বার্ষিক ১০ শতাংশ সুদে ওই অর্থ আদায় করার অধিকারী হবেন।
সূত্র: এনডিটিভি
কেএএ/

