খেলাপ্রেমী ও ক্রীড়ানুরাগী বলা বোধ হয় কম হবে। তারা আসলে একটা ক্রীড়া পরিবার। যে পরিবারের প্রথম দুই বড় ভাই ছিলেন সিরিয়াস ফুটবলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভাই শাহিন খেলতেন খুলনা লিগে।
একটা সময়, ৮০ ও ৯০-এর দশকে খুলনা ফুটবল লিগ ছিল জমজমাট। ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর দেশের তৃতীয় আকর্ষণীয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও জনপ্রিয় ফুটবল আসর বসতো খুলনায়। খুলনা লিগে অংশ নিতেন ঢাকা লিগের বেশির ভাগ নামি-দামি তারকা ও প্রতিষ্ঠিত ফুটবলাররা। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খুলনা লিগে চালনা পোর্টের হয়ে খেলতেন হাবিবুল বাশার সুমনের বড় ভাই শাহিন।
আর মেজ ভাই খাদেমুল বাশার তুহিন ছিলেন ঢাকা ফুটবলের পরিচিত মুখ। রীতিমতো দেশের নামকরা ফুটবলার। প্রথমে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে কয়েক বছর খেলার পর মোহামেডানে যোগ দেন তুহিন। মোহামেডানের গোলরক্ষক হিসেবে একটা সময় বেশ সুনামও অর্জন করেন তিনি। ইনজুরির কারণে ক্যারিয়ার দীর্ঘ হয়নি। তবে যতদিন খেলেছেন সুনামের সঙ্গে খেলেছেন এবং গোলরক্ষক হিসেবে পরিচিতিও পেয়েছিলেন বেশ।
খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের ছোট ভাই হিসেবে হাবিবুল বাশারও ফুটবল খুব পছন্দ করতেন। তারও প্রথম পছন্দ ছিল ফুটবল।
সবচেয়ে মজার কথা হলো, দেশের ক্রিকেটের অনেক বড় নাম, উজ্জ্বল তারকা হাবিবুল বাশার ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ও সেভাবে ক্রিকেটই খেলতেন না। ফুটবলই ছিল তার প্রিয় খেলা এবং ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন, ইচ্ছা তো বহুদূর, চিন্তায়ও ক্রিকেট ছিল না। পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন এবং ফুটবলার হওয়ার চিন্তাই ছিল বেশি।
স্কুলে নাইনে উঠে তার ক্রিকেটে হাতে খড়ি এবং আরও মজার বিষয় হলো, ক্রিকেট চর্চা শুরুর কিছুদিন পরই হাবিবুল বাশারের মনে হলো, ‘আরে! আমি যে সেই ছেলেবেলা থেকে ফুটবল ফুটবল করে দিন কাটিয়েছি, আসলে আমি তো ক্রিকেটই ভালো খেলি।’
ব্যাস, এই উপলব্ধি থেকেই ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছে জাগলো। সেই থেকে নিজেকে তৈরি করে ফেললেন এবং তিন বছরের মধ্যে জাতীয় যুব (অনূর্ধ্ব-১৯) দলে জায়গা করে নিয়ে ১৯৮৮ সালে ঢাকায় হওয়া এশিয়া কাপ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটে জাতীয় যুব দলের হয়েও অংশগ্রহণ করলেন তিনি।
এরপরের কাহিনী তো সবার জানা। একসময় দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার হয়ে ওঠা, টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম হাফ সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখানো এবং টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর বেশ কয়েক বছর তিনিই ছিলেন দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটার। সে সঙ্গে নামের পাশে ‘মিস্টার ফিফটি’ তকমা লাগিয়েও বসেন।
এমন দেশবরেণ্য ক্রিকেটার আজ দেশের ক্রিকেটের প্রধান নির্বাচক; কিন্তু ফুটবলের মায়া ও আকর্ষণ মুছে যায়নি এখনো।
ছেলেবেলা থেকেই সুন্দর, ছন্দময়, নান্দনিক ফুটবলের ভক্ত হাবিবুল বাশার সুমন। যখন কিছু বুঝে ফুটবল দেখা শুরু, ঠিক সেই সময়, তথা ৮০’র দশকের মাঝামাঝি সময়ে, হাবিবুল বাশার সুমনের কৈশোরে সেই ছন্দময় ফুটবলটা খেলতো ব্রাজিল। তাই ১৯৮৬ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ দেখতে শুরু করা সুমনের প্রথম প্রিয় দল হয়ে যায় জিকো, সক্রেটিস আর ফ্যালকাওয়ের ব্রাজিল।
টিভি পর্দায় প্রথম বিশ্বকাপ সরাসরি দেখার স্মৃতিটা এখনো জাগরুক আছে। তবে সেটা সুখকর নয়। জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে সেই প্রথম বিশ্বকাপ দেখা ও ফুটবল নিয়ে তার নিজের ভালো লাগা, ভালোবাসার কথা জানাতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন সুমন।
তিনি বলেন, ‘আমি টিভিতে প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল দেখি ১৯৮৬ সালে। যতদূর মনে আছে, ওই আসরে বাংলাদেশ সময় সম্ভবত রাতে বিশ্বকাপ খেলা হতো। সেই বিশ্বকাপটা আমি পরিবার-পরিজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে বসে দেখেছি। আমাদের কুষ্টিয়ার বাসার ছাদেই টিভি সেট করে দেওয়া হয়েছিল। ওই ছাদে বসে বসে রাত জেগে টিভিতে বিশ্বকাপের খেলা দেখতাম। সবাই মিলে দেখতাম বলে খুব মজা হতো। হইহুল্লোড় করে খেলা উপভোগ করতাম।’
‘তবে টিভিতে বিশ্বকাপ দেখার স্মৃতিটা তেমন মধুর না। কারণ ৮৬’র বিশ্বকাপের স্মৃতিটা দুঃখের, কষ্টের। আমার তখনকার প্রিয় দল ব্রাজিল ভালো খেলতে খেলতে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছিল। তাই ওই বিশ্বকাপটা আমার মোটেই সুখের ছিল না।’
‘আর একটা বিশ্বকাপের কথাও খুব মনে আছে। সেটা সম্ভবত ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ। কারণ আমি ১৯৯৭ সালে বিয়ের পর যে বিশ্বকাপ হয়েছে, সেবার আমার ওয়াইফের দায়িত্ব ছিল রাতে খিচুড়ি রান্না করে সবাইকে খাওয়ানো।’
হাবিবুল বাশার সুমনের পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যই ব্রাজিল সমর্থক। সে হিসেবে সুমনও বুঝি ব্রাজিলের অন্ধ সমর্থক বা ব্রাজিল অন্তঃপ্রাণ। আসলে বিষয়টা তা নয়। তার নিজের মূল্যায়ন, ‘আসলে আমি ছেলেবেলা থেকেই ফুটবল খেলতাম। ফুটবল ভালোবাসতাম। তাই ভালো ফুটবল পছন্দ করতাম। পরিচ্ছন্ন ফুটবল, সাজানো-গোছানো খেলা, নিজেদের মধ্যে দেওয়া-নেওয়া করে খেলা, খুব ভালো স্কিল থাকবে, ছন্দ ও গতিময় দৃষ্টিনন্দন ফুটবল। আশির দশকে আসলে ব্রাজিলই খেলতো সবচেয়ে ভালো। তাই আমি তখন ব্রাজিলের খেলাই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতাম। কিন্তু তাই বলে যদি কেউ আমাকে ব্রাজিলের অন্ধ সাপোর্টার ভাবেন, তাহলে ভুল হবে। আমি তো ম্যারাডোনারও অনেক বড় ফ্যান। ম্যারাডোনার জাদুকরি ফুটবল প্রতিভা, স্কিল, তার ড্রিবলিং, বডি ডজ, পায়ের কাজ, গতি, শরীরের ঝাঁকুনি, নিপুণ ডিস্ট্রিবিউশন আর লক্ষ্যভেদি শুটিং ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করতো। তাই আমি ম্যারাডোনাকে খুব পছন্দ করি। এখন যেমন মেসি আমার প্রিয় ফুটবল তারকা। আসলে আমি সব সময়ই ভালো ও দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের ভক্ত।’
ক্রিকেটার হওয়ার আগে ফুটবল নিয়ে মেতে থাকতেন সুমন। ১২ বছর বয়স থেকে ১৪/১৫ বছর পর্যন্ত পাড়ায় ও এলাকায় প্রচুর ফুটবল খেলেছেন। সেই সময়ের গল্প শোনাতে গিয়ে সুমন বলেন, ‘কৈশোরে যখন পাড়ায় নিয়মিত ফুটবল খেলতাম, তখন আমি খুব ‘চালু’ (চালাক) স্ট্রাইকার ছিলাম। তখন আমার ১৪ বছর বয়স। আমাদের পাড়ায় অনেক খালি জায়গা ছিল, তখন পাড়ার ছেলেরা মিলে ফুটবল খেলতাম। আমি ছিলাম স্ট্রাইকার। খুব একটা ছোটাছুটি করতাম না। তেমন দৌড়াতাম না। চালু স্ট্রাইকার ছিলাম। সুযোগ পেলে মিস করতাম না। আমি যাদের সঙ্গে খেলতাম, তাদের আমার ওপর খুব আস্থা ছিল। তারাই বলে দিত, তুই ওপরে ওপরেই থাকবি, নিচে নামবি না। আমিও পোস্টের আশপাশে থাকতাম। নিচে নামতাম না। সুযোগের অপেক্ষায় ওঁত পেতে থাকতাম। দুটি চান্স পেলে একটি কাজে লাগিয়ে গোল করে ফেলতাম।’
গোল করার দক্ষতা ও পারদর্শিতা থাকলেও সুমনের মূল্যায়ন, ‘এমন না যে আমি খুব ভালো ফুটবলার ছিলাম। আমাদের ব্যাচের মধ্যে ভালো খেলতাম, এই আর কি।’
ওই সময়টাতে ব্যাটও ধরে দেখেননি হাবিবুল বাশার সুমন। তিনি বলেন, ‘আমি ১২ বছর বয়স থেকে প্রায় ১৬ বছর পর্যন্ত শুধু ফুটবলই খেলেছি। ব্যাট-বল ধরিইনি। বাসায় ফুটবলেরই চর্চা ছিল। আমাদের বড় ভাই- তুহিন তখন স্টার। মোহামেডানে খেলতেন। আমার বড় ভাইও ভালো খেলতেন। তিনি খুলনা লিগের নামকরা দল চালনা পোর্টে খেলতেন।’
তাহলে আপনার ক্রিকেটে হাতে খড়ি কবে? ‘অনেক পরে। আমি ক্রিকেট শুরু করেছি ১৯৮৭-৮৮তে।’
আপনি বললেন, ৮৬’র বিশ্বকাপটা আপনার জন্য সুখের ছিল না। তার মানে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ব্রাজিলের হারটা আপনাকে কষ্ট দিয়েছিল। তাহলে কি আপনি ব্রাজিলের সাপোর্টার? সুমনের জবাব, ‘নাহ! আই অ্যাম নট ব্রাজিল ফ্যান। আসলে আমি ব্রাজিল সাপোর্টার না। আমি ভালো, ছন্দময় ও ধ্রুপদি ফুটবলের ভক্ত। যেহেতু ব্রাজিল তখন ওই ফুটবলটাই খেলতো, তাই ব্রাজিলের খেলা দেখে খুব ভালো লাগতো।’
সুমন যোগ করেন, ‘ব্রাজিলের খেলার ধরন ও কৌশল ছিল পছন্দ। তার মানে এই না যে আমি ম্যারাডোনার ভক্ত হতে পারবো না। আমার খুব অবাক লাগে, যখন আমি বলি আমি ম্যারাডোনা ও মেসির ভক্ত। তা শুনে কেউ কেউ অবাক হন। আমি ব্রাজিলের বিগ টাইম ফ্যান না। আমি বেসিক্যালি সুন্দর দৃষ্টিনন্দন ফুটবল পছন্দ করি। ব্রাজিলের খেলার স্টাইল খুব পছন্দ করতাম। তার মানে এই নয় যে আমি আর্জেন্টিনাকে ঘৃণা করতাম। আর ওই সময় আর্জেন্টিনা ছিল মূলত ওয়ানম্যান শো। মানে আর্জেন্টিনা দলটাই নির্ভরশীল ছিল ম্যারাডোনার ওপর।’
‘বাট আমার যতদূর মনে পড়ে, আমি ১৯৮৬ ও ১৯৯০ সালে এক জার্মান ফুটবলারের বিশাল ভক্ত ছিলাম। নাম লোথার ম্যাথাউস। সুঠামদেহী জার্মান, যার খেলা খুব পছন্দ করতাম আমি। শক্ত চোয়াল, মুখাবয়বই বলে দিত এক আত্মপ্রত্যয়ী ফুটবলারের প্রতিমূর্তি।’
এআরবি/আইএইচএস/

