আমার ছোট সন্তান ইহানের বয়স ১১ মাস। গত এপ্রিলের ২৫ তারিখ ছিল তার হামের টিকা দেয়ার নির্ধারিত দিন। কিন্তু ওইদিন তার ঠান্ডাজনিত সর্দি এবং শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকায় ‘সূর্যের হাসি’ ক্লিনিকে ফোন করে জানতে চাইলাম, এ অবস্থায় টিকা দেয়া ঠিক হবে কি না। বলা হলো, কয়েক দিন পরে নিয়ে আসুন। তখন হামে শিশুমৃত্যুর মহামারি চলছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে শত শত শিশুর মৃত্যু আর হাসপাতালে ভোগান্তির চিত্রগুলো দেখে আমার স্ত্রী নিজের সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে এতটাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন যে, একপর্যায়ে তার নিজেরও তীব্র জ্বর হলো। সেই জ্বর ও কাশি আক্রান্ত করলো আমাদের ১১ বছরের মেয়েকে। এভাবে আমাদের চার সদস্যের পরিবারের তিনজনই একসঙ্গে অসুস্থ। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে এর আগে পড়িনি। তখন আমার মনের ভেতরেও ভয় ঢুকে গেলো যে, এবার আমিও যদি বিছানায় পড়ে যাই, কী অবস্থা হবে! তার চেয়ে বড় আতঙ্ক তৈরি হলো এই যে, যদি ছোট সন্তানের হাম হয়, তাহলে ওই পরিস্থিতি আমরা কী করে সামাল দেব এবং সরকারি হাসপাতালের যেসব ভয়াবহ চিত্র প্রতিদিন আমরা টেলিভিশনের খবরে দেখছিলাম, তাতে হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত সন্তান নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ারও সাহস হবে কি না ভাবছিলাম।
আমাদের মধ্যে আতঙ্ক এতটাই তীব্র হলে যে, কিছুক্ষণ পরপর ছোট সন্তানের শরীর ও কপালে হাত দিয়ে পরখ করছিলাম তাপমাত্রা বাড়ছে কি না। খবরে দেখছিলাম, বেসরকারি হাসপাতালগুলো হামে আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি নিচ্ছে না। ফলে আমাদের মনে আতঙ্ক আরও তীব্র হলো যে, যদি সত্যিই সন্তানের শরীরে হামের কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে আমরা বাসার কাছে যে বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণত চিকিৎসার জন্য যাই, সেখানেও সন্তানকে নিয়ে যেতে পারব কি না বা পারলেও সেখানে তার চিকিৎসা হবে কি না।
এরকম জটিল সব ভাবনায় আমাদের প্রতিটা দিন কাটতে থাকে। অবশেষে ছেলের শরীর কিছুটা ভালো হলে মে মাসের ১৮ তারিখ তাকে হামের টিকা দেয়া সম্ভব হয় এবং আমাদের মনে কিছুটা স্বস্তি আসে। কিন্তু চিকিৎকরা বলছেন, হামের টিকা দেয়ার চার সপ্তাহ পরে শরীরে অ্যান্টি বডি অর্থাৎ ওই রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। আবার অনেক হামে আক্রান্ত শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেও দ্বিতীয় দফায় হামে আক্রান্ত হয়েছে, এরকম খবরও এসেছে। সুতরাং, ভয় আমাদের পিছু ছাড়ে না। ফলে প্রতিদিন টেলিভিনের পর্দায়, সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা সংবাদ পোর্টালে যখন হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর মুখ দেখি, আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমার ইহানের মুখ। মৃত সন্তানকে বুকে জড়িয়ে উদভ্রান্ত পিতার মুখচ্ছবির দিকে আমি তাকাতে পরি না। মনে হয় আমি আমার ইহানকে বুকে জড়িয়ে দৌড়াচ্ছি। হাসপাতালের বেডে শিশু রেবার মায়ের আর্তি দেখে আমার মনে ওই তো ইহানের মা। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে লম্বা লাইনে অপেক্ষমাণ অভিভাবকের অস্থিরতা দেখে আমার অস্থির লাগে। কাজে মন বসে না। আমি আমার রিপোর্টারদের হামের স্ক্রিপ্ট দেখতে পারি না। খারাপ লাগে। অস্বস্তিবোধ হয়। কান্নারত শিশুদের মুখে আমি কেবলেই আমার ইহানের মুখ দেখি। আমার অস্থির বোধ হয়।
এই অস্থিরতা, এই ভয়, এই উদ্বেগ এখন দেশের লাখ লাখ বাব-মায়ের মনে। বিশেষ করে যাদের সন্তানরা হাসপাতালে কাৎরাচ্ছে। মৃত্যুর দিন গুণছে। যারা কোনোমতে হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ পেলেও বেড পায়নি। বেড পেলেও প্রয়োজনের সময় পিআইসিইউ পাবে কি না তা নিশ্চিত নয়। হাসপাতালে ভর্তি হলেও সেখানে তাদের আদৌ কী চিকিৎসা হচ্ছে বা হবে, তা নিয়েও সংশয়ের অন্ত নেই। কারণ দেশে যখন হাম একটি মহামারি আকার ধারণ করেছে, তখনও বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে, বিশেষ করে যেসব হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রচুর শিশু ভর্তি আছে, সেসব হাসপাতালেও ঈদের ছুটি হয়েছে। ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য বিভাগের অনেকেই ছুটিতে গেছেন। ঈদের দুদিন আগে একটি টেলিভিশনের খবরে দেখানো হলো, শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় হাসপাতালটির ব্লাডব্যাংকে তালা ঝুলছে। অন্যান্য বিভাগেও লোক সংকট। অথচ এরকম একটি মহামারির কালে সংশ্লিষ্ট সকলের ছুটি বাতিলই কেবল নয়, বরং সবার দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা সেবায় নিয়োজিত থাকার কথা।
একটা জাতির জীবনে এরকম বিপজ্জনক পরিস্থিতি বারবার আসে না। যখন আসে তখন সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সেটি মোকাবিলা করতে হয়। কিন্তু গত আড়াই তিন মাসে একে একে প্রায় ছয়শো শিশু মরে গেলো, অথচ রাষ্ট্রের তেমন কোনো বিকার নেই। আছে শুধু অতীতের সরকারের ওপর দায় চাপানোর পুরোনো সংস্কৃতি আর ব্যবস্থা নেয়ার কথার ফুলঝুরি। যেন ক্ষমতার চেয়ারে বসলেই সকলের ভাষা অভিন্ন হয়ে যায়। বিরোধী দলে থাকলে যিনি অনেক প্রতিবাদী, প্রতিষ্ঠানিক অন্যায়-অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার—তিনিই ক্ষমতার চেয়ারে বসার পরে আর কোথাও কেনো অন্যায়-অনিয়ম বা দুর্নীতি চোখে দেখেন না। সবকিছু ঠিকঠাক। সমস্যা শুধু মানুষের। তারা সচেতন নয়। বিনা টিকায় ও বিনা চিকিৎসায় সন্তান মরে গেলেও তার দায় অভিভাবকের। কারণ তারা সচেতন নয়। তাদের সন্তান অপুষ্টির শিকার। শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম। অতএব এই মৃত্যুর দায় রাষ্ট্র কেন নেবে? অথচ জনগণের পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করাও যে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮) দায়িত্ব—রাষ্ট্র সেটা খেয়াল করে না অথবা করতে চায় না। বরং নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত অধিকারগুলো লঙ্ঘিত হলেও রাষ্ট্রকে দায় করা যায় না কারণ সংবিধান এসব অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি রাষ্ট্রের ওপর বাধ্যতামূলক করেনি। অধিকারকে এখনও সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং অপুষ্টি কিংবা বিনা চিকিৎসায় কারো মৃত্যু হলেও সেজন্য সরাসরি রাষ্ট্রকে দায়ী করার সুযোগ কম। যে কারণে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়নে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে এবং নিশ্চিত না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, এই বিধানটি সংবিধানে যুক্ত করার দাবি দীর্ঘদিনের।
বাস্তবতা হলো অধিকার, দায়িত্ব, দায় চাপানো আর অসচেতনার বিতর্কে মৃত্যু থেমে থাকে না। হাম ও হামের উপসর্গে এইসব অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ভেতরেই আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার আরও একটি মুখোশ খুলে দিলো রাজধানী মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভে ৬ শিশুর করুণ মৃত্যু।
কোরবানির ঈদের আগের দিন বুধবার সকালে তিন ঘণ্টার মধ্যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভে একে একে ৬ নবজতকের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে দুজন ছিল জমজ। এসির গ্যাসলাইনে লিকেজ বা অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে পুলিশের ধারণা।
এই ঘটনার তিনদিন পরে শনিবার বিকালে হাসপাতালটি পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেখতে পান আদ্-দ্বীন মেডিকেলের ছাদে একটি বেকারি কারখানা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বেকারিটি আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ভেতরে নয়, বরং আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের পাশে অবস্থিত। কারখানাটি থেকে রোগীদের জন্য খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহ করা হতো।
সন্তান ডেলিভারি তথা গর্ভবতী মা নবজাতককের জন্য সুপরচিতি একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের সাথেই এরকম বেকারির কারখানা থাকার পক্ষে যত যুক্তিই দেখানো হোক না কেন, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বেকারি বা বিস্কুটের কারখানা মানে সেখানে ওভেন আছে। সেখানে প্রচুর ময়লা জমে। সেখানে অতিরিক্ত তাপ উৎপাদিত হয়। সুতরাং, যে হাসপাতালটি মূলত নবজাতক এবং তাদের মায়েদের সেবার জন্য বিশেষভাবে নিয়োজিত, সেই জায়গাটি এবং তার আশেপাশের পরিবেশ যেরকম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং সুরক্ষিত থাকার কথা, তা যে আদ্-দ্বীনে আদৌ নেই বা ছিল না, সেই নির্মম সত্যটি উন্মোচিত হলো ৬ শিশুর করুণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
শুধু তাই নয়, হাসপাতালের যে পোস্ট অপারেটিভে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, সেই ওয়ার্ডে নির্মাণ ত্রুটিও পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তার মানে এই ৬ শিশুর মৃত্যু কেবলই একটি দুঃখজনক ঘটনা নয়। বরং এটি স্পষ্টতই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ফৌজদারি অপরাধ এবং তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হওয়া উচিত। কিন্তু তা হয়নি। একজন ভুক্তভোগী অভিভাবক যে মামলা করেছেন, সেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলেও পেনাল কোডের ৩০৪-এ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ পাঁচ বছর জেল হবে। এত বড় একটি অপরাধের শাস্তি কেবল পাঁচ বছরে জেল—এটা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত। সেইসঙ্গে, এই ৬ শিশুর মৃত্যু যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি এবং সামগ্রিকভাবে ব্যবস্থাপনার সংকট—সেটিও স্বীকার করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালের পোস্ট অপরেটিভ, আইসিইউসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটিগুলো ঠিকঠাক আছে কি না, সেখানের বৈদ্যুতিক লাইন ও এসির লাইন ঠিক আছে কি না, এসব জায়গায় পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশের সুযোগ আছে কি না—এসব নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় কি না, নাগরিকদের মনে সেই প্রশ্নও আছে।
সুতরাং ৬ শিশুর মৃত্যুর যৌক্তিক এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগী পরিবার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি, পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা, আইজীবী ও বিচারকের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা, সেখানে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করতেও সরকারকে কঠোর হতে হবে। যাতে কোনো শিশুর করুণ মৃত্যুর ঘটনাগুলো কেবলই সংবাদের শিরোনামে আটকে না থাকে।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।
এইচআর/এমএস

