দেশের স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, নগদ লেনদেনের অস্বচ্ছতা, রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস সংরক্ষণে দুর্বলতা এবং চিকিৎসকদের আয়ের প্রকৃত তথ্য গোপনের অভিযোগ মোকাবিলায় পুরো খাতকে অটোমেশনের আওতায় আনার চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার।
স্বাস্থ্যসেবা অটোমেশনের অংশ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন, কেন্দ্রীয় রোগী ডাটাবেইস, রেফারেল সিস্টেম ও প্রেসক্রিপশন অডিট চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে চিকিৎসকদের ফি ডিজিটাল মাধ্যমে গ্রহণ এবং সেই লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণেরও চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে বলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস সহজে সংরক্ষণ ও যাচাই করা যাবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের প্রকৃত আয়, রোগী দেখার সংখ্যা ও ফি গ্রহণের তথ্যও কর প্রশাসনের আওতায় চলে আসবে।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোসহ কম খরচে সেবা নিশ্চিতের আহ্বান
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে
ঈদ আসে-যায়, শেষ হয় না চিকিৎসকদের অপেক্ষা
মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় কাজের দ্বৈততা কমাতে আসছে সমন্বিত কাঠামো
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে ধাপে ধাপে পুরোপুরি ডিজিটাল কাঠামোয় নিয়ে যেতে চায়। এর অংশ হিসেবে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, প্রেসক্রিপশন, রোগী রেফারেল, ওষুধ ব্যবস্থাপনা, বিলিং ও আর্থিক লেনদেনকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা চলছে। এ বিষয়টি বিএনপির নির্বাচন ইশতেহারে রয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল অনুবিভাগ) মো. খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ই-প্রেসক্রিপশন চালু নিয়ে আমরা কাজ করছি। ই-প্রেসক্রিপশন, রেফারেল সিস্টেম ও অটোমেশন—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন একজন রোগী উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে সেই কাগজপত্র পরে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় তা হারিয়ে যায়। কিন্তু অটোমেশন চালু হলে রোগীর সব তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে।’
জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউটে আবাসিক সার্জনের কক্ষের সামনে রোগীদের ভিড়, ফাইল ছবি
অতিরিক্ত সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে প্রত্যেক রোগীর একটি ইউনিক স্বাস্থ্য পরিচিতি নম্বর থাকবে। এনআইডির মতো সেই নম্বর ব্যবহার করে দেশের যেকোনো হাসপাতাল থেকে রোগীর আগের চিকিৎসা ইতিহাস দেখা যাবে। ফলে একই রোগীর জন্য বারবার পরীক্ষা করানো, প্রেসক্রিপশন হারিয়ে যাওয়া বা ভুল তথ্যের কারণে চিকিৎসাজনিত ঝুঁকি কমবে।
খোরশেদ আলম আরও বলেন, মূলত কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ই-প্রেসক্রিপশন তার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। উন্নত অনেক দেশেই এ ধরনের ব্যবস্থা চালু আছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই ব্যবস্থায় উপজেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত রোগী স্থানান্তরের একটি ডিজিটাল রেফারেল চেইন তৈরি হবে। ফলে কোন রোগী কোথায় থেকে কোথায় গেলেন, কোন চিকিৎসক কী চিকিৎসা দিলেন, কোন কোন পরীক্ষা করানো হলো—সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।
আরও পড়ুন
তামাকে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি ৮৭ হাজার কোটি টাকা
স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি নয়, হাইকোর্টের রুল
শরীর আল্লাহর দেওয়া আমানত, যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব: শায়খ আহমাদুল্লাহ
স্বাস্থ্যখাতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও এআই ব্যবহারের বিষয়টি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও গুরুত্ব পেয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যখাতে অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন’ এবং ‘প্রেসক্রিপশন অডিট’ প্রবর্তন: দেশের স্বাস্থ্যখাতে ডিজিটাল হেলথ ম্যানেজমেন্ট (হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, ওষুধ সরবরাহ, প্রকিউরমেন্ট, লজিস্টিক ও আর্থিক প্রশাসন ইত্যাদি), এআই-নির্ভর রোগ শনাক্তকরণ ও রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। প্রেসক্রিপশন ও ওষুধ ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা চালু করা হবে। অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ওষুধের অপব্যবহার রোধে প্রেসক্রিপশন অডিট চালু করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রেসক্রিপশন অডিট চালু হলে চিকিৎসকদের দেওয়া প্রেসক্রিপশন বিশ্লেষণ করা যাবে। কোন চিকিৎসক অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক লিখছেন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিচ্ছেন বা আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসরণ করছেন কি না, তা মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রেসক্রিপশন অডিট মানে চিকিৎসকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়। বরং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী চিকিৎসা হচ্ছে কি না, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটা পর্যবেক্ষণ করা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে অসুস্থ শিশু ও অভিভাবকদের ভিড়, ফাইল ছবি
স্বাস্থ্যখাত বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাল জ্বর বা সাধারণ সংক্রমণেও শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। এতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন অডিট চালু হলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি ‘ডাটা-ড্রিভেন মনিটরিং’ সংস্কৃতি তৈরি হবে। এতে চিকিৎসা পদ্ধতি, ওষুধ ব্যবহার ও রোগ প্রবণতা বিশ্লেষণ করা সহজ হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ই-প্রেসক্রিপশন চালু হলে চিকিৎসকদের ফি, প্রেসক্রিপশন ও রোগী দেখার একটি ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে। এতে চিকিৎসাসেবায় জবাবদিহি যেমন বাড়বে, তেমনি কর ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক নগদে ফি নেন। রোগীদের বড় অংশ কোনো রশিদও পান না। ফলে প্রকৃত আয় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।’
সালেহউদ্দিন আহমেদ, ফাইল ছবি
এ বিষয়ে গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদও চিকিৎসক, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবীদের করের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘চিকিৎসকরা যে ফি নেন তার রিসিট তো কোনো মানুষ নেয় না। এই ফি যদি ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে তার একটি রেকর্ড থাকবে।’
অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, বিদেশে এসব লেনদেন রেকর্ডেড থাকে। বাংলাদেশেও চিকিৎসকদের সহকারীদের মাধ্যমে রশিদ দিয়ে ফি নেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্যখাতে ডিজিটাল লেনদেন চালু হলে কর ফাঁকি কমানো সহজ হবে। একজন চিকিৎসক দিনে কতজন রোগী দেখছেন, কত ফি নিচ্ছেন—সেসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, এখনো দেশের অধিকাংশ বেসরকারি চেম্বারে ক্যাশ লেনদেন হয়। এতে প্রকৃত আয় আড়াল করার সুযোগ থাকে।
কর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ডিজিটাল ফি ব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসকদের আয়-ব্যয়ের একটি স্বয়ংক্রিয় ডাটাবেইস তৈরি হবে। এতে কর প্রশাসন রিটার্ন যাচাই সহজে করতে পারবে। একই সঙ্গে রোগীরাও অনলাইন পেমেন্ট, ডিজিটাল রশিদ ও চিকিৎসা রেকর্ড সংরক্ষণের সুবিধা পাবেন।
আরও পড়ুন
করোনার মতো আরেক মহামারির ঝুঁকিতে বিশ্ব?
দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগী আড়াই কোটি, নিয়ন্ত্রণে একগুচ্ছ পরামর্শ
হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে দোষারোপ নয়, দ্রুত সমাধান প্রয়োজন
স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু ১০০ ডলার বরাদ্দ দাবি এনডিএফের
সরকারের পরিকল্পনায় শুধু প্রেসক্রিপশন নয়, হাসপাতালের বেড ম্যানেজমেন্ট, ওষুধ সরবরাহ, ল্যাব রিপোর্ট, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, রোগী ভর্তি, বিলিং ও ক্রয় প্রক্রিয়াও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার চিন্তা রয়েছে।
বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর দীর্ঘ লাইন, ফাইল হারিয়ে যাওয়া, একই রোগীর একাধিক রেজিস্ট্রেশন এবং রেফারেল জটিলতা বড় সমস্যা। ডিজিটাল অটোমেশন চালু হলে এসব অনিয়ম কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় ডাটাবেইসের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রিয়েল টাইমে জানতে পারবে কোন হাসপাতালে কত রোগী ভর্তি, কোথায় আইসিইউ খালি আছে, কোন ওষুধের ঘাটতি রয়েছে বা কোন এলাকায় কী ধরনের রোগ বেশি ছড়াচ্ছে।
ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি
তবে চিকিৎসকদের একটি অংশ মনে করছেন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নের আগে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভালো উদ্যোগ। তবে এটি যেন চিকিৎসকদের হয়রানির হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের অনেক হাসপাতালে এখনো কম্পিউটার অপারেটর সংকট রয়েছে। চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ তৈরি হলে চিকিৎসাসেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যখাত পুরোপুরি ডিজিটাল হলে রোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ স্বাস্থ্য তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ডাটাবেইস ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আরএমএম/এমএমএআর

