জিভের ওপর ছোট ছোট চেরা দাগ, খাওয়ার সময় জ্বালাপোড়া, ঝাল বা টক খাবার খেলেই অস্বস্তি-এ ধরনের সমস্যায় অনেকেই ভোগেন। কেউ কেউ বিষয়টিকে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। তবে দীর্ঘদিন জিভে ফাটল, ব্যথা বা জ্বালা থাকলে সেটি শরীরের ভেতরের নানা সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে। পুষ্টির ঘাটতি থেকে শুরু করে হরমোনের পরিবর্তন, সংক্রমণ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কিছু রোগের কারণেও এমনটা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিভ আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এটি শুধু স্বাদ নেওয়ার কাজই করে না, বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ নানা পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেয়। তাই জিভে দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সচেতন হওয়া জরুরি।
কেন ফেটে যায় জিভ?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে জিভে ফাটল বা খাঁজ থাকা জন্মগত বৈশিষ্ট্য। পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও এমন সমস্যা দেখা যেতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিভের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে গেলে এ সমস্যা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যাদের মুখ দ্রুত শুকিয়ে যায় বা লালাগ্রন্থির কার্যকারিতায় সমস্যা আছে, তাদের মধ্যে জিভ ফাটার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
এ ছাড়া কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও মুখের ভেতর শুকনো ভাব তৈরি হয়। দীর্ঘদিন অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ সেবনের কারণে জিভে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
আরও পড়ুন:
- এক পরীক্ষা বদলে দিতে পারে ভবিষ্যৎ জীবন
- ব্যথাহীন মাসিকের রহস্য লুকিয়ে আছে পুষ্টিকর খাবারে
- আম খেলে কি সত্যিই ওজন বাড়ে?
পুষ্টির ঘাটতিও হতে পারে কারণ
শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থাকলে জিভের স্বাভাবিক গঠন বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, ভিটামিন বি-১২, আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ও জিংকের ঘাটতি থাকলে জিভ লাল, মসৃণ, পাতলা বা ফাটা হয়ে যেতে পারে।

যারা নিয়মিত সুষম খাবার খান না, অতিরিক্ত ডায়েট করেন বা অপুষ্টিতে ভোগেন, পান-সুপারিও তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণ করেন তাদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়। অনেক সময় রক্তশূন্যতার রোগীদের জিভে জ্বালা বা ব্যথাও অনুভূত হয়।
নারীদের ক্ষেত্রে কেন বাড়ে সমস্যা?
নারীদের শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় মুখ ও জিভে নানা ধরনের অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। মাসিকের সময়, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পর কিংবা মেনোপজের সময় শরীরের হরমোন ওঠানামা করে। এর ফলে মুখ শুকিয়ে যাওয়া, স্বাদের পরিবর্তন, জিভে জ্বালাপোড়া বা অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা দেখা দিতে পারে। অনেক নারী মাসিকের আগে বা চলাকালে মুখে ঘা, জিভে ব্যথা কিংবা ঝাল খাবারে বেশি অস্বস্তি অনুভব করেন।
কোন রোগের লক্ষণ হতে পারে?
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন জিভে ফাটল বা জ্বালাপোড়া থাকলে সেটি কিছু রোগের উপসর্গও হতে পারে। যেমন-
- ডায়াবেটিস
- থাইরয়েডের সমস্যা
- রক্তশূন্যতা
- অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিক রিফ্লাক্স
- কিডনি ও লিভারের কিছু জটিলতা
- অটোইমিউন রোগ
- সোরিয়াসিস
- জোগ্রেন সিনড্রোম
এসব সমস্যায় মুখের ভেতর আর্দ্রতা কমে গিয়ে জিভ শুষ্ক ও ফাটা হয়ে যেতে পারে।
মানসিক চাপেও বাড়তে পারে জ্বালা
অনেকেই জানেন না, মানসিক চাপ ও উদ্বেগও জিভের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা বা দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে মুখে জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি বাড়তে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ‘বার্নিং মাউথ সিনড্রোম’ নামে একটি সমস্যা দেখা যায়। এতে জিভে আগুন লাগার মতো অনুভূতি হয়, কিন্তু বাইরে থেকে বড় কোনো ক্ষত চোখে পড়ে না। অনেক সময় এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে।
আরও যেসব কারণে জিভে সমস্যা হয়
- মুখে ছত্রাক সংক্রমণ
- ভাইরাসজনিত সংক্রমণ
- ভাঙা বা ধারালো দাঁত
- ঠিকমতো ফিট না হওয়া কৃত্রিম দাঁত
- ধাতব ফিলিংয়ের প্রতিক্রিয়া
- অতিরিক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার
- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য
- পান-জর্দা
- অ্যালকোহল পান
- অতিরিক্ত ঝাল বা মসলাযুক্ত খাবার
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট টুথপেস্ট, লিপস্টিক বা কসমেটিক পণ্যের অ্যালার্জির কারণেও জিভে জ্বালা হতে পারে।
কী করবেন?
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন
- অতিরিক্ত ঝাল, টক ও গরম খাবার কম খান
- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য এড়িয়ে চলুন
- নিয়মিত দাঁত ও জিভ পরিষ্কার রাখুন
- খুব শক্ত ব্রাশ ব্যবহার না করাই ভালো
- ভিটামিন ও পুষ্টিকর খাবার বেশি খান। খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ, দুধ, শাকসবজি, ফলমূল, ডাল ও বাদাম রাখলে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণে সাহায্য করে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
- দুই সপ্তাহের বেশি সমস্যা থাকা
- খেতে বা গিলতে কষ্ট হওয়া
- জিভ থেকে রক্ত পড়া
- মুখে সাদা বা লাল দাগ তৈরি হওয়া
- ওজন কমে যাওয়া
- জ্বালাপোড়া ক্রমেই বাড়তে থাকা
সর্বোপরি জিভের পরিবর্তনকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ অনেক সময় ছোট একটি লক্ষণই শরীরের বড় কোনো সমস্যার আগাম সংকেত হতে পারে।
লেখক
ডা. মো. শাহারুল কবীর
ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল সার্জন
দেবিদ্বার ইবনে সিনা হসপিটাল, কুমিল্লা
জেএস/




