Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img
Homeথুসিডাইডিস ট্র্যাপ: মার্কিন-চীন দ্বন্দ্ব বিশ্বকে যুদ্ধের মুখে ফেলবে?

থুসিডাইডিস ট্র্যাপ: মার্কিন-চীন দ্বন্দ্ব বিশ্বকে যুদ্ধের মুখে ফেলবে?

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ এই শব্দটি মূলত ক্ষমতার একটি দ্বান্দ্বিক গতিশীলতা নির্দেশ করে। এই তত্ত্বের মাধ্যমে এমন অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে একটি উদীয়মান শক্তি কোনো প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে প্রতিস্থাপনের দ্বারপ্রান্তে থাকে এবং এই প্রতিস্থাপনের হুমকি থেকে তাদের মধ্যকার সংঘাত প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ কী?

থুসিডাইডিস ফাঁদ হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা বা পরিভাষা। যখন কোনো বিদ্যমান বা প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তির বিপরীতে একটি নতুন বা উদীয়মান পরাশক্তির দ্রুত উত্থান ঘটে, তখন এই দুই শক্তির মধ্যে যুদ্ধ বা সংঘাতের যে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়, তাকেই সহজ কথায় থুসিডাইডিস ট্র্যাপ বলা হয়।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, উদীয়মান শক্তির অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রবৃদ্ধি দেখে প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তিটি নিজের আধিপত্য হারানোর ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের একটি চক্র তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।

এ ধারণার উৎপত্তি খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে। এথেনীয় জেনারেল এবং ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস লিখিত ‘হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপনেশিয়ান ওয়ার’ গ্রন্থে এর বর্ণনা করা হয়েছে। তার বিশ্লেষণে থুসিডাইডিস যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এথেন্স এবং স্পার্টার মধ্যকার যুদ্ধ কোনো অগভীর বা সাময়িক কারণে ঘটেনি। এই যুদ্ধকে যে বিষয়টি অনিবার্য করে তুলেছিল তা হলো এথেনীয় শক্তির উত্থান এবং এর ফলে স্পার্টার মনে তৈরি হওয়া ভয়।

তখন প্রভাবশালী বা আধিপত্যশীল শক্তিটি নতুন করে সামরিক সজ্জা বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, অন্যদিকে উদীয়মান শক্তিটি নিজেকে রক্ষা করতে বা প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুতি নেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর চূড়ান্ত পরিণতি হয় যুদ্ধ। যদিও শুরুতে কোনো পক্ষই হয়তো যুদ্ধ চায় না তবুও যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন ২০১৭ সালে প্রকাশিত তার ‘ডেস্টানড ফর ওয়ার’ গ্রন্থে এই শব্দটি জনপ্রিয় করে তোলেন। এই গ্রন্থে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। অ্যালিসন গত ৫০০ বছরের ইতিহাসে প্রভাবশালী বনাম উদীয়মান শক্তির এমন ১৬টি ঐতিহাসিক ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন যার মধ্যে ১২টি ঘটনাই যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল।

তবে, এই উভয় সংকট কোনো অলঙ্ঘনীয় নিয়তি বা অবধারিত শাস্তি নয়; বিচক্ষণ নেতৃত্ব, উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সহযোগিতার ব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন তার গ্রন্থে যুদ্ধ এড়ানোর এই বিষয়ের ওপরও জোর দিয়েছেন।

শি জিনপিংয়ের সতর্কবার্তা এবং মার্কিন-চীন সম্পর্ক

সম্প্রতি মে মাসে চীন সফর করে ফিরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই সফরে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে একাধিক চুক্তির রব উঠলেও তা শেষ পর্যন্ত তাইওয়ান ইস্যুতে হুমকি আর সতর্কবার্তা দিয়ে শেষ হয়। এই সফরের পর এক শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের থুসিডাইডিস ট্র্যাপে পড়া নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়। ট্রাম্পকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দেওয়া সতর্কবার্তাটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শক্তির গতিশীলতা বিশেষ করে উদীয়মান ও প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যকার বৃহত্তর কৌশলগত উদ্বেগকে প্রতিফলিত করেছে।

এই সফরের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তবে, বিচক্ষণ শি জিনপিং এই ঐতিহাসিক সূত্রটি (থুসিডাইডিস) ব্যবহার করে জোর দিয়ে বলেন যে, সংঘাত অনিবার্য নয় এবং দুই দেশেরই উচিত একসাথে কাজ করা, যাতে এমন একটি সংঘাত এড়ানো যায়, যা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হবে।

কিউবা ইস্যুতে বিপরীতমুখী চালচিত্র

এদিকে, কিউবার ক্ষেত্রে এই উভয় সংকটের চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে শক্তির কোনো সমান্তরাল বা ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক নেই বরং রয়েছে এক চরম অসমতা। কিউবা ওয়াশিংটনের জন্য নিরাপত্তা হুমকি বলে যে দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র তা মূলত দ্বীপরাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য তৈরি একটি সাজানো দৃশ্যপট মাত্র। এই ফাঁদে পড়া এড়াতে হলে কিউবার বিরুদ্ধে মার্কিন হুমকি এবং ভয় দেখানোর সব চেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই আলোচনা এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে হবে, যেখানে জবরদস্তির চেয়ে যুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এটি কেবল এই অঞ্চলেই নয় বরং সামগ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আরও বৃহত্তর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অবদান রাখবে।

সূত্র: গ্রানমা/পলিটিকো/দ্য গার্ডিয়ান

কেএম