ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ শ্রমিক করিম আলী পুরোনো জুট মিলের গেটের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একসময় এই গেট দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিক ঢুকত, মেশিনের শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা। আজ গেট বন্ধ, ভেতরে নীরবতা। কিন্তু করিম আলীর চোখে হতাশা নয়—ছিল আশার এক অদ্ভুত ঝিলিক।
এই দৃশ্য যেন আমাকে ফিরিয়ে নেয় শৈশবের সেই গ্রামে, যখন ঢাকা শহর থেকে গ্রামে বেড়াতে যেতাম। বর্ষাকালে চারদিকে ছড়িয়ে থাকত সবুজ পাটক্ষেত। ভেজা মাটির গন্ধ আর কোথাও কোথাও পচানো পাটের তীব্র অথচ পরিচিত গন্ধ—সব মিলিয়ে তৈরি হতো এক অনন্য গ্রামীণ আবহ। তখন হয়তো সেই গন্ধের অর্থ বুঝিনি; আজ মনে হয়, সেটিই ছিল বাংলার অর্থনীতির প্রাণের গন্ধ।
আজ আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। পাটক্ষেত কমেছে, হারিয়ে গেছে সেই পরিচিত গন্ধও। বিস্ময়ের বিষয়, আজ সেই প্রাকৃতিক গন্ধের আভাস মেলে আরব বিশ্বের দামী সুগন্ধিতে, যেখানে প্রকৃতির নির্যাসকে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। অথচ যে মাটিতে সেই সম্ভাবনার জন্ম, সেখানে তা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
করিম আলী শুনেছেন, আবার চালু হবে এই মিল। নতুন প্রযুক্তি আসবে, বিদেশে রপ্তানি হবে পাটের তৈরি পরিবেশবান্ধব ব্যাগ, জিওটেক্সটাইল ও বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং। তিনি মনে মনে বললেন—“পাট শুধু একটি ফসল নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ।”
এই দৃশ্য ও স্মৃতির মেলবন্ধন কেবল একজন শ্রমিক বা একটি গ্রামের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের লক্ষ কৃষক, শ্রমিক ও উদ্যোক্তার জীবনের প্রতিচ্ছবি। হারানো সম্ভাবনাকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নেই আজ পাটশিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ গ্রিন জুট মিল পুনরুজ্জীবন ও কর্মসংস্থান কর্মসূচি ২০২৬–২০৩১
বাংলাদেশের পাটশিল্প একসময় দেশের প্রধান রপ্তানি খাত ছিল এবং “Golden Fiber” হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, ব্যবস্থাপনা সংকট ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে এই শিল্পের সক্ষমতা কমেছে। তবু পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা দ্রুত বাড়ায় পাট আবার নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পাটসহ ঐতিহ্যবাহী শিল্প খাতকে আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় পাটশিল্পকে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে পুনর্গঠনের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকারি ও বেসরকারি উৎস অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট জুট মিলের সংখ্যা আনুমানিক ২৫০–২৬০টির মধ্যে। ২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি জুট মিলের উৎপাদন বন্ধ হয়, যা হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকায় বড় আঘাত আনে। বর্তমানে এর মধ্যে ১৪টি মিল লিজ দেওয়া হয়েছে এবং আরও ৬টি মিল বেসরকারি উদ্যোগে চালুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
অন্যদিকে, পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি আয় কমেছে। FY 2022–23 অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৯১১ মিলিয়ন ডলার, যা FY 2024–25 সালে কমে প্রায় ৮২০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবণতা পাটশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা পুনর্গঠনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
বিশ্ব এখন প্লাস্টিক দূষণ কমাতে পরিবেশবান্ধব বিকল্প খুঁজছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ। সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ কেবল পাট উৎপাদনকারী দেশ নয়, বৈশ্বিক বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং হাব হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে। পাটশিল্পের পুনরুজ্জীবন কেবল অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি সামাজিক ও পরিবেশগত রূপান্তরের উদ্যোগ। সোনালি আঁশের পুরোনো গৌরব আবার ফিরে আসতে পারে—যদি আমরা এখনই পরিকল্পিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করি।
তবে আশার দিক হলো, পাট উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে সরাসরি প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। এর বাইরে পরিবহন, বাণিজ্য, গুদামজাতকরণ ও প্যাকেজিং খাতেও বড় কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ফলে এই শিল্প পুনরুজ্জীবিত হলে অর্থনীতিতে বহুগুণ প্রভাব পড়তে পারে।
পাটশিল্প পুনরুজ্জীবনের জন্য কার্যকর মডেল হতে পারে Public Asset–Private Operation–Public Oversight কাঠামো। এতে সম্পদের মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের অধীনে, উৎপাদন পরিচালনা করবে দক্ষ বেসরকারি উদ্যোক্তা, আর সরকার মান, পরিবেশ ও শ্রমনীতি তদারকি করবে।
বন্ধ মিলগুলোকে তিন ভাগে শ্রেণিবিন্যাস করা যেতে পারে: দ্রুত চালুযোগ্য মিল, আধুনিকায়নের পর চালুযোগ্য মিল এবং জুটভিত্তিক নতুন শিল্পে রূপান্তরযোগ্য মিল। পুরোনো যন্ত্রপাতির পরিবর্তে অটোমেটেড লুম, জুট জিওটেক্সটাইল, বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং ও জুট কম্পোজিট উৎপাদনে বিনিয়োগ জরুরি। কারণ বৈশ্বিক বাজারে এখন উচ্চমূল্য সংযোজিত পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।
কাঁচা পাট সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে জাতীয় ডিজিটাল কাঁচা পাট বাজার, আঞ্চলিক গুদাম, মানভিত্তিক গ্রেডিং এবং কৃষকের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য চালু করা প্রয়োজন। উন্নত বীজ ও আধুনিক রেটিং প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করলে উৎপাদন ও মান—দুই-ই বাড়বে।
দেশীয় বাজার তৈরির জন্য Mandatory Jute Packaging Act কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ধান, চাল, গম, সার, চিনি ও পশুখাদ্যের মতো পণ্যে পাটের প্যাকেজিং বাধ্যতামূলক হলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমবে।
অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বল্পসুদ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, শ্রমিক পুনঃপ্রশিক্ষণ তহবিল এবং রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের পাশাপাশি UNIDO, FAO, World Bank ও Green Climate Fund-এর সহায়তায় একটি Green Jute Innovation Fund গঠন করা যেতে পারে। এই তহবিল প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, গবেষণা ও পরিবেশবান্ধব পণ্য উন্নয়নে চালিকাশক্তি হতে পারে।
যদি ২৫টি সরকারি জুট মিল ধাপে ধাপে পুনরুজ্জীবিত হয়, তাহলে সরাসরি ৫০,০০০-এর বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। কৃষি, পরিবহন, গুদাম ও রপ্তানি খাতে আরও ১.৫ থেকে ২ লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পণ্য বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে আগামী ৩–৫ বছরে রপ্তানি আয় ৮২০ মিলিয়ন ডলার থেকে ১.০–১.৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
বিশ্ব এখন প্লাস্টিক দূষণ কমাতে পরিবেশবান্ধব বিকল্প খুঁজছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ। সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ কেবল পাট উৎপাদনকারী দেশ নয়, বৈশ্বিক বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং হাব হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
পাটশিল্পের পুনরুজ্জীবন কেবল অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি সামাজিক ও পরিবেশগত রূপান্তরের উদ্যোগ। সোনালি আঁশের পুরোনো গৌরব আবার ফিরে আসতে পারে—যদি আমরা এখনই পরিকল্পিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করি।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সহ অর্থনৈতিক সম্পাদক, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, বিএনপি।
এইচআর/এমএস

