কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় ২০২২ সালে বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশি হামলার ঘটনায় করা একটি মামলায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের’ সক্রিয় যোদ্ধা ও ছাত্রদল কর্মী শামীম আহম্মেদকে আসামি করার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা ছাত্রদলের খোদ আহ্বায়কের করা মামলায় ২৯ নম্বর আসামি হিসেবে শামীমের নাম আসার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন তোলপাড় ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পাকুন্দিয়ায় বিএনপির একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গুলি বর্ষণ ও হামলা চালান। ওই ঘটনার বিচার চেয়ে গত ২৪ মে কিশোরগঞ্জ আদালতে একটি মামলা করেন পাকুন্দিয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাজহারুল হক উজ্জল। আদালত মামলাটি পাকুন্দিয়া থানাকে এফআইআর (মামলা হিসেবে রেকর্ড) করার নির্দেশ দেন।
মামলায় পাকুন্দিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সারোয়ার জাহান, পরিদর্শক নাহিদ হাসান সুমনসহ ১৪ পুলিশ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১৮ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭০-৮০ জনকে আসামি করা হয়। তবে এই মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করতেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘটনার দিন বিএনপির হয়ে ওই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ছাত্রদল কর্মী জুলাই যোদ্ধা শামীম আহম্মেদকে (২৯) করা হয়েছে ২৯ নম্বর আসামি।
মামলার নথিতে শামীম আহম্মেদের বয়স ৩৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শামীমের জন্ম নিবন্ধন সনদ অনুযায়ী, তার জন্ম ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর। সে হিসেবে বর্তমানে তার বয়স মাত্র ১৭ বছর ৭ মাস ২৩ দিন (আজকের দিন পর্যন্ত)। তিনি পাকুন্দিয়া সরকারি কলেজ থেকে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।

শামীম পাকুন্দিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বীরপাকুন্দিয়া এলাকার বায়েছ উদ্দিনের ছেলে।
স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক নেতাকর্মী জানান, ২০২২ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের ওই কর্মসূচিতে শামীম বিএনপির পক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনেও সম্মুখসারির হিসেবে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন শামীম। এই স্বীকৃতি হিসেবে তার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘জুলাই যোদ্ধা’ স্বাস্থ্য কার্ড রয়েছে।
নিজেদের দলীয় ও রাজপথের সক্রিয় কর্মীকে আসামি করার ক্ষুব্ধ পাকুন্দিয়ার সাধারণ ছাত্রদল ও যুবদলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তারা অবিলম্বে শামীমের নাম মামলা থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
ছাত্রদল কর্মী ও শামীমের বন্ধু সৌমিক আহামেদ বলেন, “শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে করা মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ২০২২ সালে যে ঘটনার অভিযোগ আনা হয়েছে, সেসময় তার (শামীম) পা ভাঙা ছিল এবং সে আমার সঙ্গেই বিএনপির কর্মসূচিতে অবস্থান করছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনেও সে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। সে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।”
স্থানীয় বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ধারণা, পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই শামীম আহমেদকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে সে সামনের সারিতে থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে, যা সবারই জানা। তাই তাকে আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে দেখিয়ে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২২ সালের ঘটনার সময় আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম এবং কিছু ভিডিও ধারণ করেছিলাম। তখন পুলিশ আমার মোবাইল ফোন থেকে ভিডিওগুলো মুছে দেয়।’
ভুক্তভোগী শামীম আহম্মেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২২ সালের বিএনপির আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে আমিও আহত হয়েছিলাম। অথচ সেই ঘটনার একটি মামলায় আমাকে অন্যায়ভাবে আসামি করা হয়েছে। বিএনপি নেতা পৌর সদরের টাঙ্গিবাড়ির মাসুদের সঙ্গে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে প্রতিশোধমূলকভাবে আমাকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে আমার ধারণা।’
তিনি বলেন, ‘আমি ছাত্রদলের একজন কর্মী এবং জুলাই আন্দোলনের গেজেটভুক্ত যোদ্ধা। আন্দোলনে আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলাম। এরপরও বিএনপি ও ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলাম। আমার কাছে এসবের ভিডিও, ছবি ও অন্যান্য প্রমাণ রয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকুন্দিয়া উপজেলা বিএনপির এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শামীম আমাদের দলেরই ছেলে। ২০২২ সালের কর্মসূচিতে ও আমাদের হয়ে রাজপথে লড়াই করেছে। অথচ তাকেই আওয়ামী লীগ-পুলিশের সঙ্গে আসামি করা হলো! এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে।’
মামলার ৮ নম্বর সাক্ষী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমান মাসুদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ওই ছেলে বয়সে আমাদের অনেক জুনিয়র। তাকে আমি চিনিই না। তাকে কেন আমি ফাঁসাতে যাবো? সে মামলার আসামি কি-না এটাও আমি জানি না। আমার সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই। যদি বিরোধের কথা বলে থাকে সেটা মিথ্যা অভিযোগ।’
মামলার ৭ নম্বর সাক্ষী কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন বলেন, ‘এটাই পরীক্ষা করে দেখবো কেন এমন হলো। যদি এমনই হয় তাহলে তার জন্য যতটুকু করার আমি করবো।’
এ বিষয়ে কথা বলতে মামলার বাদী ও পাকুন্দিয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাজহারুল হক উজ্জ্বলের মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি।
এসকে রাসেল/এসআর/জেআইএম

