Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

অটোমেশন হচ্ছে স্বাস্থ্যখাত, আসছে জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন

দেশের স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, নগদ লেনদেনের অস্বচ্ছতা, রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস সংরক্ষণে দুর্বলতা এবং চিকিৎসকদের আয়ের প্রকৃত তথ্য গোপনের অভিযোগ মোকাবিলায় পুরো খাতকে অটোমেশনের আওতায়...
Homeব্যঙ্গ করে ডাকতো ‘চাষা’, বিলেতফেরত সেই তরুণের খামারে এখন শতাধিক গরু

ব্যঙ্গ করে ডাকতো ‘চাষা’, বিলেতফেরত সেই তরুণের খামারে এখন শতাধিক গরু

বগুড়ার অনেক তরুণ যখন চাকরির বাজারে ভবিষ্যৎ খুঁজছেন, তখন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ডিগ্রি নেওয়া এক তরুণ দিন কাটাচ্ছেন গরুর খামারে। সকাল শুরু হয় গরুর খাবার, পরিচর্যা আর খামারের ব্যবস্থাপনা দিয়ে। সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি এখন নিজেকে পরিচয় দেন একজন উদ্যোক্তা ও খামারি হিসেবে।

তার নাম রাহাতুল খান রাহাত। বাড়ি বগুড়া সদর উপজেলার ধাওয়াকোলা গ্রামে। রাজধানীর স্কলাস্টিকা স্কুলে পড়াশোনা শেষে ব্রিটিশ স্কুল অব ল’ থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে যুক্তরাজ্যের নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টেও আরেকটি মাস্টার্স ডিগ্রি নেন। উচ্চশিক্ষার এমন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দেশে ফিরে করপোরেট চাকরি নয়, বেছে নিয়েছেন কৃষি ও খামারভিত্তিক উদ্যোগ।

বগুড়া সদরের চণ্ডীহারা এলাকায় প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন ‘আর কে অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেড’। এর মধ্যে দেড় বিঘা জায়গাজুড়ে রয়েছে আধুনিক গরুর শেড। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে ১০৫টি গরু। শাহিওয়াল, ফ্রিজিয়ান, সিন্ধি, ব্রাহমা, গির ও ভুট্টি জাতের গরুর পাশাপাশি ছাগল ও ভেড়াও রয়েছে সেখানে। কিছু গরুর দাম তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা হলেও কয়েকটির মূল্য ১০ থেকে ২২ লাখ টাকা পর্যন্ত।

রাহাত জানান, খামারের শুরুটা হয়েছিল একেবারে শখ থেকে। প্রথমে মাত্র ৯টি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়তে থাকে। এখন শুধু কোরবানির পশু বিক্রি নয়; বাচ্চা উৎপাদন, বীজ সংরক্ষণ ও বিভিন্ন জাতের গরুর উন্নয়ন নিয়েও কাজ করছেন তিনি।

তার ভাষ্য, ‘দেশে এখনো অনেকে কৃষিকে ছোট পেশা মনে করেন। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশের কাছে চাকরিই নিরাপদ ভবিষ্যৎ। কিন্তু আমি মনে করি, মন দিয়ে করলে কৃষিও বড় শিল্প হতে পারে।’

ব্যঙ্গ করে ডাকতো ‘চাষা’, বিলেতফেরত সেই তরুণের খামারে এখন শতাধিক গরু

তবে শুরুতে রাহাতের বিষয়টি পরিবারের সবাই ভালোভাবে নেননি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, এত পড়াশোনা করে খামারে কেন? বন্ধুদের কাছ থেকেও শুনতে হয়েছে নানা মন্তব্য। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে ‘চাষা’ বলেও ডাকতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে।

রাহাতুল খান রাহাত বলেন, ‘শুরুতে অনেকেই অবাক হতেন। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে বিদেশ থেকে ডিগ্রি এনে গরুর খামার করছি, এটা তারা মেনে নিতে পারতেন না। কিন্তু এখন সফলতা দেখার পর মানুষ উৎসাহ দেয়।’

তিনি জানান, বিদেশে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা খামার পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে সেই শিক্ষা কাজে লাগছে। লন্ডনের ব্যবসায়িক পরিবেশ ও বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নয়, তবে সেখান থেকে শেখা অনেক বিষয় উদ্যোক্তা হিসেবে তাকে এগিয়ে দিয়েছে।

খামারের শুরুটা সহজ ছিল না। ২০১৫-১৬ সালের দিকে গরুর বাজার, খাদ্যের খরচ, রোগব্যাধি ও ক্রেতা নিয়ে নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। কখন গরু কিনবেন, কখন বিক্রি করবেন, কোন জাত লাভজনক হবে—এসব সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে লোকসানও হয়েছে। তবে সেই অভিজ্ঞতাকেই তিনি শিক্ষা হিসেবে নিয়েছেন।

আরও পড়ুন:
৫টি দিয়ে খামার শুরু, কোরবানিতে ৪০০ গরু বিক্রির আশা

রাহাতের স্ত্রী রুমাইয়া তাসনিম একজন ব্যারিস্টার। তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে কর্মব্যস্ত থাকেন। স্বামীর এই উদ্যোগে তিনিও এখন অনুপ্রেরণা জোগান। রাহাত বলেন, আগে আত্মীয়-স্বজনের অনেকে বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখতেন। এখন তারা গর্ব করেন।

ব্যঙ্গ করে ডাকতো ‘চাষা’, বিলেতফেরত সেই তরুণের খামারে এখন শতাধিক গরু

খামারে ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি গরুর জন্য নির্দিষ্ট রুটিন রয়েছে। সকালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, এরপর খাবার দেওয়া, দুপুরে গোসল করানো এবং বিকেলে আবার খাবার পরিবেশন করা হয়। প্রতিদিন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় পশুগুলোর।

খামারের কর্মী সাইফুল ইসলাম জানান, পাঁচ বছর ধরে তিনি সেখানে কাজ করছেন। প্রতিদিন সকাল থেকেই কাজ শুরু হয়। গরুর খাবার তৈরি, ঘাস কাটা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, গোসল করানো সবকিছু নিয়ম মেনে করতে হয়। তিনি বলেন, ‘একটা গরুর শরীরে সামান্য সমস্যা হলেও দ্রুত বুঝতে হয়। সারাক্ষণ খেয়াল রাখতে হয়।’

খামারের ম্যানেজার আব্দুল বারী গত ১১ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, ‘২৪ ঘণ্টাই এখানে দায়িত্ব পালন করতে হয়। অনেক সময় মোবাইল ফোনেই গরু বিক্রির চুক্তি হয়ে যায়। পরে আমরা ক্রেতার কাছে গরু পৌঁছে দিই।’

মূলত কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করেই বেশি বিক্রি হয়। তবে এখন অনলাইনেও গরুর বড় বাজার তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিক্রয় ডটকমসহ ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গরুর ছবি ও তথ্য প্রকাশ করা হয়। ক্রেতারা আগে অনলাইনে পছন্দ করেন, পরে খামারে এসে দেখে কিনে নিয়ে যান।

রাহাত জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকেও এখন নিয়মিত ক্রেতা আসছেন। পরিচিতি বাড়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণাও বাজার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে।

ব্যঙ্গ করে ডাকতো ‘চাষা’, বিলেতফেরত সেই তরুণের খামারে এখন শতাধিক গরু

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সামাজিক সংকোচের কারণে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ এখনো এই খাতে আসতে চান না। তার মতে, কৃষিকে আধুনিক শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ কোনো কাজই ছোট নয়। চাকরি করলেই সম্মান, আর কৃষি করলে ছোট—এই চিন্তা বদলানো দরকার। শিক্ষিত তরুণ এই খাতে এগিয়ে আসতে পারে।

ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে খামার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে উচ্চশিক্ষিত এই যুবকের। উন্নত জাতের গরু উৎপাদন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও অনলাইন মার্কেটিংকে কেন্দ্র করে নতুন পরিকল্পনাও করছেন তিনি। সমাজের প্রচলিত ধারণা ভেঙে তার এই পথচলা এখন অনেক তরুণের কাছেই অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠছে।

রাহাতের এই উদ্যোগকে ‘অনুসরণীয়’ আখ্যায়িত করে বগুড়া জেলা খামার মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আবু সাইদ খান বলেন, দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা এখনো খুবই কম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের বিভিন্ন তথ্যেও দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের বড় অংশ চাকরিমুখী হওয়ায় উদ্যোক্তা তৈরির হার আশানুরূপ নয়। অথচ বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক পশু বিক্রি, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাতের গবাদিপশু উৎপাদন ও ডেইরি শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ছে। পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে এই খাত থেকে বছরে লাখ লাখ টাকা আয় সম্ভব।

এলবি/এসআর/এমএস