Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

‘ফাঁকা ঢাকায়’ ফেরা শুরু, সড়কে বেড়েছে গণপরিবহন

পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি শেষ হচ্ছে আজ। টানা সাতদিনের ছুটির শেষদিনে ঘরে ফেরা মানুষেরা অনেকেই কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন। ফলে ঢাকার সড়কে আজ গণপরিবহন...
Homeভাইরাল জীবনের ফাঁদ : মানুষ না কনটেন্ট?

ভাইরাল জীবনের ফাঁদ : মানুষ না কনটেন্ট?

রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। ঢাকার একটি ব্যস্ত সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় রক্তাক্ত হয়ে পড়ে ছিলেন এক তরুণ। আশপাশে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সবাই তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেনি; বরং কয়েকজন মোবাইল ফোন বের করে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ লাইভ করছে, কেউ ‘স্ট্যাটাস’ দিচ্ছে—“ঢাকায় ভয়াবহ অ্যাকসিডেন্ট!” আহত তরুণটির আর্তনাদের চেয়ে তখন হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ভিডিওর ভিউ, রিঅ্যাক্ট আর শেয়ার সংখ্যা।

এই দৃশ্যটি শুধু একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়; এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে মানুষের বেদনা, ব্যক্তিগত মুহূর্ত, এমনকি মৃত্যুও অনেকের কাছে “কনটেন্ট”। এখন অনেকের কাছে জীবন মানে আর শুধু বেঁচে থাকা নয়, বরং দৃশ্যমান থাকা। আর দৃশ্যমান থাকার সবচেয়ে দ্রুত উপায়—ভাইরাল হওয়া।

একসময় মানুষ স্বীকৃতি চাইত সমাজের কাছ থেকে; এখন চায় অ্যালগরিদমের কাছ থেকে। আগে একজন লেখক অপেক্ষা করতেন পাঠকের চিঠির জন্য, শিল্পী অপেক্ষা করতেন দর্শকের প্রশংসার জন্য। এখন একটি ভিডিও আপলোড হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মূল্য নির্ধারিত হয়—কত ভিউ, কত শেয়ার, কত ট্রেন্ডিং। এই দ্রুত স্বীকৃতির সংস্কৃতি মানুষের মনস্তত্ত্বেও বড় পরিবর্তন এনেছে।

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার গত এক দশকে অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম—সবখানেই এখন মানুষের এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে। কে বেশি আলোচিত, কে বেশি নাটকীয়, কে বেশি চমকপ্রদ! সমস্যা হলো, এই প্রতিযোগিতায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিকতা, সৌজন্য এবং মানবিকতা।

আজকাল আমরা প্রায়ই দেখি, কেউ বিপজ্জনক স্টান্ট করছে শুধু ভিডিও বানানোর জন্য। কেউ ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে রিল বানাচ্ছে, কেউ অসুস্থ মানুষকে নিয়ে ‘প্র্যাঙ্ক’ করছে, কেউ ধর্ম, রাজনীতি বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে ইচ্ছাকৃত উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে—শুধু আলোচনায় আসার জন্য। যেন সমাজে সবচেয়ে মূল্যবান গুণ এখন প্রতিভা নয়, দায়িত্ববোধ নয়, বরং “ভাইরাল হওয়ার ক্ষমতা”।

এই প্রবণতার পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কারণও আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মস্তিষ্কে তাৎক্ষণিক আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। একটি পোস্টে হাজার লাইক এলে মানুষ নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। গবেষকেরা একে বলেন “ডোপামিন লুপ”—এক ধরনের মানসিক আসক্তি। ফলে মানুষ বারবার এমন কিছু করতে চায়, যা তাকে আরও মনোযোগ এনে দেবে। আর এখানেই শুরু হয় বিপদ।

ভাইরালের নেশা শুধু ব্যক্তিকে নয়, সমাজকেও বদলে দিচ্ছে। আগে সংবাদমাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের একটি সংস্কৃতি ছিল। এখন অনেকেই যাচাইয়ের আগেই খবর ছড়িয়ে দেয়, কারণ আগে পোস্ট দিতে পারলেই বেশি লাভ। গুজব, অপপ্রচার, চরিত্রহনন—সবকিছুই এখন কয়েক মিনিটে লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেক ক্ষেত্রে একটি মিথ্যা তথ্যের ক্ষতি পরে আর সামাল দেওয়া যায় না।

আজকাল আমরা প্রায়ই দেখি, কেউ বিপজ্জনক স্টান্ট করছে শুধু ভিডিও বানানোর জন্য। কেউ ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে রিল বানাচ্ছে, কেউ অসুস্থ মানুষকে নিয়ে ‘প্র্যাঙ্ক’ করছে, কেউ ধর্ম, রাজনীতি বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে ইচ্ছাকৃত উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে—শুধু আলোচনায় আসার জন্য। যেন সমাজে সবচেয়ে মূল্যবান গুণ এখন প্রতিভা নয়, দায়িত্ববোধ নয়, বরং “ভাইরাল হওয়ার ক্ষমতা”।

বাংলাদেশে কয়েক বছরে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা হয়েছে। কখনো ধর্মীয় উসকানি, কখনো ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস, কখনো মিথ্যা অভিযোগ—এসবের পেছনে এক ধরনের ‘ডিজিটাল উন্মাদনা’ কাজ করে। মানুষ তখন আর সত্য খোঁজে না; বরং ভাইরাল হওয়া বিষয়টির অংশ হতে চায়।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও একই চিত্র দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপ—সব জায়গাতেই এখন “ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি” সমাজে বড় প্রভাব ফেলছে। অবশ্য সব ইনফ্লুয়েন্সার নেতিবাচক নন। অনেকেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবিক সহায়তা বা সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, অ্যালগরিদম সাধারণত শান্ত, গভীর ও চিন্তাশীল বিষয়কে কম গুরুত্ব দেয়; বরং চমক, সংঘাত, আবেগ এবং বিতর্ককে বেশি সামনে আনে। ফলে মানুষও বাধ্য হয় আরও নাটকীয় হতে।

এখানে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোরও দায় আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেলই তৈরি হয়েছে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ওপর। যত বেশি মানুষ স্ক্রিনে থাকবে, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখা হবে। তাই অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টই বেশি ছড়ায়, যা মানুষকে উত্তেজিত করে, ক্ষুব্ধ করে বা আবেগপ্রবণ করে তোলে। অর্থাৎ ভাইরালের সংস্কৃতি কেবল মানুষের ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি একটি পরিকল্পিত ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তারা অনেক সময় নিজের অনুভূতির চেয়ে অনলাইনে কেমন দেখাচ্ছে, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কোথাও ঘুরতে গেলে প্রকৃতি দেখার আগে ছবি তুলতে হয়, খাবার খাওয়ার আগে পোস্ট দিতে হয়, এমনকি ব্যক্তিগত কষ্টও কখনো কখনো ‘কনটেন্ট’ হয়ে যায়। যেন বাস্তব অনুভূতির চেয়ে তার অনলাইন উপস্থাপনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই সংস্কৃতি মানুষের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। মানুষ এখন অনেক সময় অন্যকে বন্ধু হিসেবে নয়, বরং “অডিয়েন্স” হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ফলে আন্তরিকতা কমছে, বাড়ছে অভিনয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুখী দেখানোর চাপ অনেককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের বাস্তব জীবনকে ব্যর্থ মনে হচ্ছে অনেকের কাছে। বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও আত্মহীনতার অনুভূতি বাড়ছে তরুণদের মধ্যে।

তবে প্রযুক্তিকে এককভাবে দোষ দিলেও ভুল হবে। কারণ প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি, সেটিই মূল বিষয়। একই ফেসবুক ব্যবহার করে কেউ বইয়ের প্রচার করছে, রক্তদাতার খোঁজ দিচ্ছে, দুর্যোগে সহায়তা সংগঠিত করছে; আবার কেউ মিথ্যা, বিদ্বেষ বা অশ্লীলতা ছড়াচ্ছে। অর্থাৎ মাধ্যম নয়, মানসিকতাই এখানে মূল প্রশ্ন।

এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ডিজিটাল সচেতনতা। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে—ভাইরাল হওয়া জীবনের লক্ষ্য নয়। জনপ্রিয়তা সবসময় সাফল্যের সমান নয়। মানুষকে বুঝতে হবে, প্রতিটি ট্রেন্ড অনুসরণ করা জরুরি নয়; সব আলোচনায় অংশ নেওয়াও প্রয়োজন নেই।

শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল নৈতিকতা ও মিডিয়া লিটারেসি অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। কোন তথ্য সত্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর, কোন আচরণ অনৈতিক—এসব বিষয়ে তরুণদের সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের নিজেদের কাছেই ফিরে যেতে হবে। আমরা কি সত্যিই মানুষ হিসেবে বাঁচতে চাই, নাকি কেবল পর্দার ভেতর একটি আলোচিত মুখ হতে চাই? কারণ ভাইরাল হওয়ার নেশা মানুষকে সাময়িক পরিচিতি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কেড়ে নিতে পারে তার স্বাভাবিক বোধ, সংবেদনশীলতা এবং আত্মপরিচয়।

সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এটিই—আমরা পৃথিবীর সঙ্গে আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, কিন্তু মানুষের সঙ্গে আগের চেয়ে কম যুক্ত। তাই এখন প্রশ্ন শুধু প্রযুক্তির নয়; প্রশ্ন আমাদের মানবিক ভবিষ্যতের।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
drharun.press@gmail.com

এইচআর/জেআইএম