হামের প্রাদুর্ভাবে সবার চোখ রাজধানীর শিশু হাসপাতালের দিকে। ঈদের ছুটিতে কেমন চলছে চিকিৎসা? হামে রোগী বাড়ছে না কমছে? ছুটিতে থাকলেও সবার কৌতূহল এ নিয়ে। বিশেষ করে, শিশু বাচ্চা আছে এমন বাবা-মায়ের আগ্রহ আরও বেশি।
আজ ৩১ মে। পবিত্র ঈদুল আজহার সরকারি ছুটির শেষ দিন। সকাল ১০টায় শ্যামলীর শিশু হাসপাতালের প্রধান ফটকে ঢুকতেই দেখা মেলে দুই পাশে মানুষের সমাগম। গাছের নিচে মাদুর বিছিয়ে ঘুমাচ্ছে কেউ কেউ। কেউবা আবার বসে বসে সময় কাটাচ্ছে। কাছে গিয়ে আব্দুল করিম নামের একজনের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজের এই প্রতিবেদক।
চেহারার বিবর্ণতা বলেই দিচ্ছে কয়েকদিন ঠিকমতো ঘুম ও নাওয়া-খাওয়া নেই তার। মনের অসহায়ত্ব দেহের মধ্যেও প্রভাব ফেলেছে।
আরও পড়ুন
দুই কোটিরও বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
গরম ও হামের প্রাদুর্ভাব, শিশুদের নিয়ে ঈদযাত্রায় সতর্কবার্তা
হাম সংক্রমণ কমলেও টিকাদান বন্ধ হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
নবগঠিত লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল করিম থাকেন ঢাকার আদাবরে। এব্রয়ডারির কাজ করেন। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার জন্য ২৬ মে রাত সাড়ে ১১টায় ইকোনো সার্ভিসের টিকিটও কেটেছেন। কিন্তু ভাগ্য তাকে রেখে দিয়েছে শিশু হাসপাতালে।
আব্দুল করিম বলেন, ‘আমার দুইটা মেয়ে, একটা ১০ বছর, আরেকটা ৭ বছরের। সকাল থেকে ছোট বাচ্চাটার জ্বর, বমি ও পাতলা পায়খানা হচ্ছিল। ভাবলাম, ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ নিয়ে যাই। সন্ধ্যার দিকে শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসছি। ডাক্তার বলল, ওর তো হাম হয়েছে বোধহয়। চিকিৎসার জন্য ভর্তি থাকতে হবে। বাচ্চার সুস্থতা তো আগে। সেই ২৬ তারিখ থেকে আজও এখানে। সারা দিনরাত কখনো রাস্তায়, কখনো ভেতরে বা করিডরে, এভাবে সময় কাটাচ্ছি। মাটি হয়ে গেছে ঈদ। বেতন ও বোনাস মিলে ৩০ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। সেগুলোও এই কয়দিনে শেষ প্রায়।’
তিনি বলেন, ‘বড় বাচ্চাটা কখনো বাবা-মা ছাড়া থাকেনি। তারে তার মামার সঙ্গে গ্রামে পাঠাই দিছি। এখানে আমি আর ও মা রয়ে গেছে ছোট বাচ্চার জন্য। বাচ্চাদের কোনো কিছুর অভাব থাকতে দেই নাই। মাঝেমধ্যে খুব মন খারাপ হয়ে যায়, প্রতিদিন বাচ্চা মারা যাচ্ছে। ঠিক মতো খাইতেও পারি না। খাবার ভেতরে যায় না। তারপরও আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আমার সন্তানসহ সবার সন্তানকে যেনো সুস্থ করে দেন।’
রাজধানীর শিশু হাসপাতাল, ছবি: জাগো নিউজ
শুধু আব্দুল করিম নন, শিশু সন্তানকে ভর্তি করে এভাবে মাদুর পেতে শুয়ে-বসে বা দাঁড়িয়ে দিনরাত কাটিয়ে দিচ্ছেন অন্তত অর্ধশত মানুষ। এর বাইরেও নানা ধরনের রোগী তো আছেই।
শিশু হাসপাতালের ভেতরে একটু এগুলেই চোখে পড়ে একজন মা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। সঙ্গে আনুমানিক ৮-১০ বছরের মেয়ে। কাছে গিয়ে জিগ্যেস করতেই জবাব দেন, ‘ওরে ডাক্তার দেখাইতে আনছি। ওর বাবা টিকেট কাটতে গেছে। একবছর আগে বাচ্চার গলা ফুলে গেছিল। পরে টেস্ট করে দেখছে, টিবি হইছে। সে থেকে গলায় ক্যানসার হয়ে গেছে। ডাক্তার বলছে, আজ আসতে ভর্তি করবে। তাই আসছি।’
গাড়িচালক বাবার দুই মেয়ে সন্তানের প্রথমটিই এই বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত। আদরের ফুটফুটে সন্তানকে বাঁচাতে তার ছুটে চলা।
এভাবে ঈদের আনন্দ মাটিচাপা দিয়ে শিশু হাসপাতালের এই কক্ষ থেকেই ওই কক্ষে দৌড়াচ্ছে মানুষ। রোদের তাপ, মানুষের চাপ আর চিকিৎসার হাহাকার। এক হৃদয়বিদারক চিত্র হাসপাতালে।
আরও পড়ুন
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু
ঈদে সন্তানের সুরক্ষায় আপনার যে সতর্কতা জরুরি
ঈদ যাত্রায় হামের সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়
শিশু হাসপাতালে ১১৮ শিশু হাম আক্রান্ত বা হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৯৪১ জন হাম নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছে। মারা গেছে ৩৫ জন।
শিশু হাসপাতালের করিডোরে ঘুরতে দেখা মিলে প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক ডা. আজহারুল ইসলামের। তিনি বিভিন্ন রুম ও ওয়ার্ড ঘুরে চিকিৎসার খোঁজ নিচ্ছেন। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘আজকে একটু চাপ বেশি। বিছানা খালি হচ্ছে, রোগী ভর্তি দিচ্ছে। আজকে ছুটির শেষ দিন। আজসহ প্রতিদিন অধ্যাপকরা রাউন্ড দিয়েছেন। পরিচালক মহোদয়সহ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরাও মনিটরিং করছি। সারাদেশ থেকে হামের রোগীরা বেশি আসছে। অন্য রোগীও আছে। তবে এখন হামের রোগী সারাদেশ থেকে এখানে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমরা সাধ্যমতো ম্যানেজ করছি।’
শনিবার (৩০ মে) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হামে ৯০ জন এবং একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে ৪৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৯৯৬ জনে। এছাড়া সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত হয়েছে ৬৯ হাজার ৬১২ জন।
এ সময়ের মধ্যে হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৫ হাজার ৭০৫ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৫২ হাজার ৫০ জন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে নিশ্চিত হামে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়— ৫৪ জন। এরপর বরিশালে ১৯ জন, চট্টগ্রামে ১০ জন, সিলেটে তিনজন এবং ময়মনসিংহ ও রাজশাহীতে দুইজন করে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
এসইউজে/এমএমএআর

