Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাবিতে পুনরায় বসেছে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড

২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) পুনরায় শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড বসিয়ে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (৭ মে)...
Homeমানবতার আলোয় রবীন্দ্রনাথ: আজও কেন প্রাসঙ্গিক

মানবতার আলোয় রবীন্দ্রনাথ: আজও কেন প্রাসঙ্গিক

মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা কেবল একটি জাতির নয়, সমগ্র মানবজাতির আত্মার ভাষ্যকার হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তেমনই এক নাম। তাঁর সাহিত্য, দর্শন, সংগীত ও চিন্তায় মানবতা কেবল একটি ধারণা নয়—এটি এক গভীর নৈতিক অবস্থান, এক চিরন্তন আহ্বান। প্রশ্ন হলো, আজকের বিভক্ত, যুদ্ধ-সংঘাতময়, স্বার্থকেন্দ্রিক বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রাসঙ্গিক?

মানবতা, সাহিত্য ও বিশ্বদৃষ্টির আলোচনায় যাওয়ার আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে সংক্ষেপে ধারণা নেওয়া জরুরি। তিনি (১৮৬১–১৯৪১) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ স্রষ্টাদের একজন—কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ—যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক রূপ নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তাঁর রচিত ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, যা তাঁকে প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেলজয়ী হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের অগ্রভাগে নিয়ে আসে।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের বিস্তার ও বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক—প্রতিটি ধারায়ই তিনি নতুন ভাষা, নতুন ভাবনা ও নতুন শৈলী নির্মাণ করেছেন। তাঁর গান ‘আমার সোনার বাংলা’ ও ‘জন গণ মন’ যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত, যা তাঁর প্রভাবের পরিধি কতটা বিস্তৃত, তারই প্রমাণ। শুধু সাহিত্য নয়, শিক্ষা ও সমাজভাবনায়ও তাঁর অবদান অনন্য; শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি এক বিকল্প মানবিক শিক্ষাদর্শের পথ দেখান।

তিনি গুরুত্বপূর্ণ কেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন সাহিত্যিক নন; তিনি এক চিন্তাবিদ, যিনি মানুষের স্বাধীনতা, মানবতা, ন্যায়বোধ ও বিশ্বমানবিকতার ধারণাকে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর লেখায় ব্যক্তি ও সমাজ, দেশ ও বিশ্ব—সবকিছুর মধ্যে এক সেতুবন্ধন তৈরি হয়। তিনি সংকীর্ণতা, অন্ধ জাতীয়তাবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষের সর্বজনীন পরিচয়কে তুলে ধরেছেন।

এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর সাহিত্য শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়; এটি মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং সবচেয়ে বড় কথা—মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সময়ের সীমা ছাড়িয়ে এক চিরন্তন কণ্ঠে পরিণত করেছে।

রবীন্দ্রনাথের লেখায় মানবতা মানে কেবল মানুষের প্রতি সহানুভূতি নয়; বরং মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক সর্বজনীন চেতনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাষ্ট্রের সীমা অতিক্রম করে এক বৃহত্তর মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—‘সকল দেশের সকল মানুষের রক্তে আমার রক্তের টান’—এই সর্বজনীন মানবতাবোধেরই প্রতিধ্বনি।

আজকের পৃথিবী ঠিক এই জায়গায়ই সংকটে। জাতিগত সংঘাত, ধর্মীয় উগ্রবাদ, শরণার্থী সংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্য—সব মিলিয়ে মানবতা যেন বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই বাস্তবতায় রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠস্বর আবারও আমাদের কানে ফিরে আসে। তাঁর ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার যে সভ্যতার লজ্জা, সে কথা আজও আমরা ভুলিনি।’ এই কথাটি আজকের বিশ্বেও ভয়াবহভাবে সত্য।

বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও রবীন্দ্রনাথের মানবতা ভাবনা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের সমাজে যখন রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক বৈষম্য কিংবা মতপ্রকাশের সংকট দেখা দেয়, তখন রবীন্দ্রনাথের মানবিকতা আমাদের এক ভিন্ন দিশা দেখায়। তিনি সতর্ক করেছিলেন—‘অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা মানেই নিজের মানবতাকে অস্বীকার করা।’ এই কথাটি শুধু নৈতিক শিক্ষা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ববোধের ডাক।

বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও রবীন্দ্রনাথের মানবতা ভাবনা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের সমাজে যখন রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক বৈষম্য কিংবা মতপ্রকাশের সংকট দেখা দেয়, তখন রবীন্দ্রনাথের মানবিকতা আমাদের এক ভিন্ন দিশা দেখায়। তিনি সতর্ক করেছিলেন—‘অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা মানেই নিজের মানবতাকে অস্বীকার করা।’ এই কথাটি শুধু নৈতিক শিক্ষা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ববোধের ডাক।

রবীন্দ্রনাথের মানবতা ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যক্তিস্বাধীনতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের প্রকৃত বিকাশ সম্ভব তখনই, যখন সে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ও নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। তাঁর ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—
‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত…’

এই কয়েকটি পঙক্তি কেবল কবিতা নয়; এটি একটি আদর্শ সমাজের রূপরেখা। আজকের বাস্তবতায়, যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে, তখন এই কবিতাটি নতুন করে গুরুত্ব পায়। তবে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা বোঝার জন্য শুধু তাঁর মানবতাবাদী বক্তব্য উদ্ধৃত করলেই যথেষ্ট নয়; তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতাও অনুধাবন করতে হবে। তিনি কখনো অন্ধ জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করেননি। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদ মানবতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাঁর ভাষায়—‘জাতীয়তাবাদ মানুষের চেয়ে বড় হয়ে উঠলে, মানুষ হারিয়ে যায়।’ আজকের বিশ্বে, যেখানে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ অনেক সময় মানবিক মূল্যবোধকে ছাপিয়ে যায়, সেখানে রবীন্দ্রনাথের এই সতর্কতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহনশীলতার অভাব। মতের ভিন্নতা মানেই শত্রুতা—এমন একটি প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। রবীন্দ্রনাথ এখানে আমাদের শিখিয়েছেন সহমর্মিতা ও সংলাপের গুরুত্ব। তিনি বলেছেন, ‘মানুষকে ভালোবাসা মানে তার ভিন্নতাকেও সম্মান করা।’ এই শিক্ষা আজকের সমাজে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

রবীন্দ্রনাথের মানবতা ভাবনার আরেকটি দিক হলো প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। তিনি প্রকৃতিকে কেবল উপভোগের বস্তু হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের অস্তিত্বের অংশ হিসেবে দেখেছেন। বর্তমান জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রকৃতির সঙ্গে বিরোধ করে মানুষ নিজেরই ক্ষতি ডেকে আনে।’ আজকের পরিবেশ বিপর্যয়ের যুগে এই সতর্কতা যেন ভবিষ্যদ্বাণীর মতো শোনায়।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রসঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের চিন্তা গভীর। তিনি মনে করতেন, একটি সমাজ তখনই সুস্থ থাকে, যখন সেখানে ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর ভাষায়—‘অন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত সমৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।’ আজকের বিশ্বে ধনী-গরিবের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে; এই প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে একটি প্রশ্ন এখানে উঠতেই পারে—রবীন্দ্রনাথ কি কেবল আদর্শের কথা বলেছেন, নাকি বাস্তবতার সঙ্গেও তাঁর সংযোগ ছিল? সত্য হলো, তিনি বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর লেখায় আমরা যেমন মানবতার স্বপ্ন দেখি, তেমনি দেখি সেই স্বপ্ন ভাঙার বেদনাও। তাই তাঁর মানবতা কোনো কল্পলোকের ধারণা নয়; এটি বাস্তব জীবনের সংগ্রামের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত।

আজকের প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়—তাঁর ভাষা কি পুরোনো, তাঁর ভাবনা কি অতীতমুখী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, তাঁর ভাষা হয়তো সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়নি, কিন্তু তাঁর ভাবনা সময়কে অতিক্রম করেছে। মানবতা, স্বাধীনতা, সহনশীলতা—এই মূল্যবোধগুলো কখনো পুরোনো হয় না।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ এই একটি বাক্যই আজকের পৃথিবীর জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী বার্তা। যখন আমরা একে অপরের প্রতি সন্দেহ, ঘৃণা ও বিভাজনের দেয়াল তৈরি করি, তখন এই বাক্যটি আমাদের থামিয়ে দেয়।

রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন কবি নন; তিনি এক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির নির্মাতা। তাঁর লেখায় যে মানবতার কথা বলা হয়েছে, তা আজও আমাদের পথ দেখাতে পারে—যদি আমরা তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকি।

বর্তমান বাস্তবতায়, যেখানে মানবতা বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, সেখানে রবীন্দ্রনাথ আমাদের এক নৈতিক আশ্রয়। তাঁর চিন্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়ন, ক্ষমতা বা আধুনিকতা—কোনোটিই মানবতার বিকল্প নয়। বরং মানবতাই সবকিছুর ভিত্তি।

এই কারণেই, শত বছর পরও, রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক—এবং সম্ভবত ভবিষ্যতেও থাকবেন। কারণ, যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন মানবতার প্রয়োজন থাকবে; আর যতদিন মানবতার প্রয়োজন থাকবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথ আমাদের সঙ্গেই থাকবেন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম