রাজধানীর অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র হাতিরঝিল। ঈদুল আজহার ছুটিতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করছেন হাজারো দর্শনার্থী। তবে সেই হাতিরঝিলেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ময়লা-আবর্জনা, কোরবানির বর্জ্য ও দুর্গন্ধ।
শুক্রবার (২৯ মে) হাতিরঝিল পরিদর্শন করে এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পরদিন শনিবার (৩০ মে) সকাল থেকেই হাতিরঝিলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা হাতিরঝিলের পুরো এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চললেও এখনো পুরো এলাকাজুড়ে ময়লা-আবর্জনার উপস্থিতি স্পষ্ট। কোথাও কোথাও কোরবানির বর্জ্য, গরুর গোবর এবং পশুর চামড়ার অংশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কিছু স্থানে দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাতিরঝিলের হাঁটার পথের পাশে ছড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কাগজ ও অন্যান্য বর্জ্য। বেশ কয়েকটি স্থানে কোরবানির পশুর গোবর জমে আছে। একটি স্থানে গরুর মাথার চামড়া পড়ে থাকতে দেখা যায়। তীব্র গরমে এসব বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল আশপাশে।

তবে একই সময়ে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদেরও ব্যস্ততা দেখা যায়। হাতিরঝিলের দুই পাশ থেকে দুটি দল পরিচ্ছন্নতার কাজ করছিল। কেউ ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করছেন, কেউ আগাছা কেটে ট্রাকে তুলছেন।
আজ ভোর ৬টা থেকেই আমরা কাজ শুরু করেছি। অনেক জায়গায় আগাছা বেড়ে গিয়েছিল। সেগুলো কেটে পরিষ্কার করা হচ্ছে। নির্দেশনা এসেছে যেন পুরো এলাকা পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখা হয়। – নূর নাম
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মীরা জানান, একটি দলে সাতজন এবং অন্য দলে ছয়জন কাজ করছেন। দুইপাশ থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য পরিবহনের জন্য দুটি ট্রাক রাখা হয়েছে।
রামপুরা অংশে পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমের তদারকির দায়িত্ব পালন করা নূর নামের একজন বলেন, আজ ভোর ৬টা থেকেই আমরা কাজ শুরু করেছি। অনেক জায়গায় আগাছা বেড়ে গিয়েছিল। সেগুলো কেটে পরিষ্কার করা হচ্ছে। নির্দেশনা এসেছে যেন পুরো এলাকা পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখা হয়।
হাতিরঝিলের হাঁটার রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া এক নারী বলেন, ঈদের ছুটিতে মানুষের ভিড় বেশি হওয়ায় ময়লাও বেশি জমেছে। আমরা চেষ্টা করছি সব ময়লা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে। সকাল থেকে কাজ করছি, বিকেল পর্যন্ত চলবে।
চোখে পড়ার মতো অনেক ময়লা। এত ময়লা অল্প সময়ের মধ্যে পরিষ্কার করা সম্ভব না। আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব হাতিরঝিলের ময়লা পরিষ্কার করার। – মো. মোহন
পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম তদারকি করা মো. মোহন জানান, শুধু রাস্তা ঝাড়ু দিলেই হবে না। ডাস্টবিনের আশপাশ, লেকের পাড় এবং বসার জায়গাগুলোও পরিষ্কার করা হচ্ছে। আমরা চাই মানুষ পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ঘুরতে আসুক।
তিনি বলেন, আমরা ভোর ৬টা থেকে পরিষ্কারের কার্যক্রম শুরু করেছি। চোখে পড়ার মতো অনেক ময়লা। এত ময়লা অল্প সময়ের মধ্যে পরিষ্কার করা সম্ভব না। আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব হাতিরঝিলের ময়লা পরিষ্কার করার।

ময়লা বহনকারী ট্রাকের চালক মো. হানিফ বলেন, আমরা ভোর ৬টার আগেই হাতিরঝিলে এসেছি। এরই মধ্যে এক ট্রাক ময়লা ফেলে এসেছি। আরও এক ট্রাক ময়লা প্রায় হয়ে গেছে।
রাস্তার ময়লা পরিষ্কার করার কাজ চললেও হাতিরঝিলের পানির অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কারণ রয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে পানিতে ভাসতে দেখা যায় প্লাস্টিক, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য। কিন্তু পানির ময়লা-আবর্জনা অপসারণে কোনো কর্মী বা নৌযানকে কাজ করতে দেখা যায়নি।
এদিকে হাতিরঝিলের তেজগাঁও অংশে ময়লার একটি ট্রাক এবং একজন পরিচ্ছন্নকর্মীকে দেখা যায়। নজরুল নামের এই কর্মী বলেন, হাতিরঝিল পরিষ্কার করার কাজ আমরা দুটি টিম করে করছি। আমাদের এই পাশে সাতজন এবং রামপুরা অংশে ছয়জন আছেন। আমাদের এখানে যারা কাজ করছেন তারা এখন খেতে গেছেন। খেয়ে এসে আবার পরিষ্কার করার কাজ করবেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত আমরা কাজ করবো।
আরও পড়ুন
প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষ, পরিষ্কার হচ্ছে হাতিরঝিল
সৈয়দপুর পৌরসভায় কোরবানির বর্জ্য শতভাগ অপসারণ
এই লোকবল দিয়ে আজ হাতিরঝিল পরিষ্কার করা সম্ভব হবে? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি। যতটুকু সম্ভব আমরা পরিষ্কার করবো। দেখতেই তো পারছেন হাতিরঝিলে অনেক ময়লা। এরই মধ্যে আমরা এক ট্রাক ময়লা ফেলে এসেছি।
হাতিরঝিলের মধুবাগ এলাকায় দায়িত্ব পালন করা আনসার সদস্য তোফাজ্জল বলেন, শুনছি আজ হাতিরঝিলে পরিষ্কার কার্যক্রম চলছে। তবে আমাদের এই অংশে এখনো কাউকে দেখিনি। হয়ত অন্যদিকে পরিষ্কার করার কাজ চলছে।
হাতিরঝিলের সর্বত্র ময়লা আবর্জনায় ভরা। পানির ভেতরে অসংখ্য ময়লা। এই ময়লা একদিনে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। হাতিরঝিলে এত ময়লা বিভিন্ন জায়গায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। – আনসার সদস্য
আরও এক আনসার সদস্য বলেন, হাতিরঝিলের পরিষ্কার কার্যক্রম চলছে শুনলাম। কিন্তু আমি কাউকে পরিষ্কার কার্যক্রম চালাতে দেখিনি। হাতিরঝিলের দায়িত্বে থাকা এক বড় কর্মকর্তা সকালে, আমার কাছে শুনেছিলেন কোন দিকে পরিষ্কার কার্যক্রম চলছে। আমি কিছু বলতে পারিনি।
এই আনসার সদস্য বলেন, হাতিরঝিলের সর্বত্র ময়লা আবর্জনায় ভরা। পানির ভেতরে অসংখ্য ময়লা। এই ময়লা একদিনে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। হাতিরঝিলে এত ময়লা বিভিন্ন জায়গায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
মগবাজার থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী মো. শাহীন বলেন, হাতিরঝিলে পরিষ্কার করা হচ্ছে এমন সংবাদ শুনে হাতিরঝিলে এসেছি। এখানে এসে দেখছি সব জায়গায় ময়লা আর ময়লা। কোথায় পরিষ্কার করার কাজ চলছে বুঝলাম না। গরুর গোবর, মাথার চামড়া পড়ে রয়েছে, হাতিরঝিলের মধ্যে। এতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
এ সময় তাকে বলা হয় দুই দিকে দুটি দলে ১৩ জন পরিষ্কার করার কাজ করছে। এরপর তিনি বলেন, এত জায়গা মাত্র ১৩ জন দিয়ে পরিষ্কার করা সম্ভব না। এটা আসলেই পরিষ্কার করার কাজ চলছে, নাকি লোক দেখানো, সেটা খতিয়ে দেখা উচিত।

হাতিরঝিলে ঘুরতে আসা আর একজন নুসরাত জাহান বলেন, দেখেন সব জায়গায় ময়লা আবর্জনা। ময়লা আবর্জনায় তো পানি একদম নষ্ট হয়ে গেছে। হাঁটার রাস্তা খবর, গরুর মাথার চামড়া পড়ে রয়েছে। মানুষ কত খারাপ চিন্তা করে দেখেছেন। গরুর গোবর, মাথার চামড়া ফেলার জায়গা এটা? দুর্গন্ধে দাঁড়ানো যাচ্ছে না।
হাতিরঝিল ঢাকার অন্যতম সুন্দর জায়গা। কিন্তু কিছুদিন ধরে অনেক জায়গায় ময়লা চোখে পড়ছিল। আজ এসে দেখলাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। – মেহেদী হাসান
দর্শনার্থীদের অনেকেই বলছেন, হাতিরঝিল শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, এটি রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত জনপরিসর। তাই এখানে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো জরুরি। বিশেষ করে ঈদসহ বড় ছুটির সময় বাড়তি জনসমাগমের কারণে অতিরিক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
রামপুরার বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, হাতিরঝিল ঢাকার অন্যতম সুন্দর জায়গা। কিন্তু কিছুদিন ধরে অনেক জায়গায় ময়লা চোখে পড়ছিল। আজ এসে দেখলাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ।
আরও পড়ুন
নির্ধারিত সময়ে বর্জ্য অপসারণ, স্বস্তিতে ময়মনসিংহ নগরবাসী
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ২ দিনে ২২ হাজার টন বর্জ্য অপসারণ
তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নকর্মীরা দেখছি রাস্তার ময়লা পরিষ্কার করছেন। কিন্তু শুধু রাস্তা নয়, হাতিরঝিলের পানিতেও প্রচুর ময়লা। পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতলসহ নানা রকম ময়লা আবর্জনা পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। পানির এসব ময়লাও পরিষ্কার করা উচিত।
মগবাজারের বাসিন্দা মো. কাশেম বলেন, এখানে ঘুরতে এসে সবাই যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে। সবাই যদি ময়লা যেখানে-সেখানে ফেলে, তাহলে পরিবেশ নষ্ট হবেই। শুধু পরিষ্কার করলেই হবে না, দর্শনার্থীদেরও সচেতন হতে হবে। আজ কর্মীদের কাজ করতে দেখে ভালো লাগছে।
তিনি বলেন, হাতিরঝিলের সর্বত্র জুড়েই ময়লা। পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম চলছে তারপরও দেখেন হাতিরঝিলের সর্বত্রজুড়ে ময়লা আর ময়লা। যেভাবে পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম চলছে তাতে আজ হাতিরঝিল পুরোপুরি পরিষ্কার হবে বলে মনে হয় না।
স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন নামের আর একজন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষের পর আজ হাতিরঝিল পরিষ্কার হচ্ছে বলে শুনতে পাচ্ছি। যদি নিয়মিত হাতিরঝিল পরিষ্কার করা হতো তাহলে এভাবে ময়লা জমে থাকতো না এবং প্রধানমন্ত্রীরও অসন্তোষ প্রকাশ করতে হতো না। আমরা চাই হাতিরঝিল যেন নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করার পর হাতিরঝিল পরিষ্কার কাজে শতাধিক লোক নামানো উচিত ছিল। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজনকে দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এতে হাতিরঝিল পরিষ্কার হবে না। আমার কাছে তো মনে হচ্ছে এটা লোক দেখানো। – স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন
তিনি বলেন, হাতিরঝিল পরিষ্কার হচ্ছে শুনে আমি মোটরসাইকেল নিয়ে হাতিরঝিলের মধ্যে পাক দিলাম। তাতে যা দেখলাম হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণে অল্প কয়েকজন কর্মী পরিষ্কারের কাজ করছেন। এই কর্মী দিয়ে হাতিরঝিলের এত ময়লা পরিষ্কার করা সম্ভব না।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করার পর হাতিরঝিল পরিষ্কার কাজে শতাধিক লোক নামানো উচিত ছিল। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজনকে দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এতে হাতিরঝিল পরিষ্কার হবে না। আমার কাছে তো মনে হচ্ছে এটা লোক দেখানো, বাস্তবে হাতিরঝিল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কার্যক্রম না।

এই বাসিন্দা বলেন, প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, তাই হয় তো দেখানোর জন্য এটা করা হচ্ছে। চিন্তা করে দেখেন প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করার পরও হাতিরঝিলের দেখভালের দায়িত্ব থাকা এভাবে কাজ করছেন, তাহলে স্বাভাবিক সময়ে হাতিরঝিল পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ কেমন চলে?
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর বর্জ্য এবং আগে থেকে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা ঠিকমতো পরিষ্কার না হওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কোরবানির ঈদের সময় লেকের আশপাশে সাধারণত বেশি পরিমাণ আবর্জনা জমে থাকে। এ কারণে প্রতি বছরই বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। – রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম
সরকার প্রধানের এই কঠোর অবস্থানের পরপরই শনিবার (৩০ মে) সকাল থেকে হাতিরঝিলের দৃষ্টিনন্দন লেক এলাকায় বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
হাতিরঝিলে চলমান পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সম্পর্কে রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, কোরবানির ঈদের সময় লেকের আশপাশে সাধারণত বেশি পরিমাণ আবর্জনা জমে থাকে। এ কারণে প্রতি বছরই বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এমএএস/এমআরএম

