আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির ৩ হাজার ২৯৯ জন নেতাকর্মীকে গুম ও হত্যা করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আগেই অভিযোগ দিয়েছে বিএনপি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অভিযোগ দাখিল করেছেন। সম্প্রতি চিফ প্রসিকিউটর বরাবর আবারও একই অভিযোগ জমা দিয়েছে বিএনপি।
এর মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও ঢাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর (তৎকালীন কমিশনার) চৌধুরী আলমসহ ১৫৩ জনকে গুমের ঘটনাও রয়েছে। এছাড়া মায়ের ডাকের শতাধিক ও ‘বাংলাদেশ গুম পরিবার’র ৩৯ অভিযোগসহ ব্যক্তিগতভাবে আরও বেশকিছু অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।
জানা গেছে, বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও চৌধুরী আলমের গুমের ঘটনাসহ অন্তত ৮১টি অভিযোগ, মায়ের ডাকের শতাধিক ও ‘বাংলাদেশ গুম পরিবার’র করা অভিযোগের তদন্ত দ্রুত গতিতে চলছে। এর মধ্যে গুমের পৃথক তিনটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণও চলছে।
গুম, খুন নিয়ে বিএনপির অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন ও ধ্বংস করা। এসব অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান ও অন্যান্য কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে।
বিএনপির ৩২৯৯ নেতাকর্মী গুম-খুন, অভিযোগ মির্জা ফখরুলের
২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সারাদেশে বিএনপির ৩ হাজার ২৯৯ নেকাকর্মী গুম-খুনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনটি পৃথক আবেদন করেছে বিএনপি। এসব ঘটনায় ন্যায়বিচার চেয়ে ২০২৫ সালে ট্রাইব্যুনালে প্রথম অভিযোগ করেন দলটির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এরপর গত ১১ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের কাছে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সালাহউদ্দিন খান নতুন এই আবেদনগুলো জমা দেন। তিনি দলটির মামলা, গুম, খুন ও তথ্য সংরক্ষক সমন্বয়কের দায়িত্বও পালন করছেন। আবেদনের পাশাপাশি ঘটনার প্রয়োজনীয় নথিপত্রও পুনরায় দাখিল করা হয়েছে বিএনপির পক্ষে। সেখানে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এসব বিষয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর বরাবর এসব অভিযোগ করা হয়েছিল। যদিও একবার অভিযোগ জমা হলে আবার দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তারপরও যিনি অভিযোগ দাখিল করেছেন তিনি বলেছেন, আপনি নতুন চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে আবারও অভিযোগ জমা দিয়েছি।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি। যাচাই-বাছাই করে এ সংক্রান্ত বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। যদিও এ সংক্রান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় তদন্ত চলমান।’
আরও পড়ুন
মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া গেছে ইলিয়াস আলীকে গুমের যোগসূত্র
ট্রাইব্যুনালে গুমের ১০০ অভিযোগের তদন্ত চলছে: চিফ প্রসিকিউটর
পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে যা জানালো গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন
বিএনপির একটি আবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ২৭৬ জনকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৭৬ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য গত বছরের ৮ জানুয়ারি চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল।
দ্বিতীয় আবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৭৫ জনকে গুম করার ঘটনায় বিচার চেয়ে গত বছরের ২৪ আগস্ট আবেদন করা হয়েছিল। সেখানে ভুক্তভোগীদের নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় আবেদনে বিএনপি বলেছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে ৮৪৮ জন শহীদ হয়েছেন। এর মধ্যে ছাত্রদলের ১৫৩ জন এবং বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ৩৭৩ জন নেতাকর্মী ও সমর্থক রয়েছেন।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত ন্যায়বিচার ও অপরাধীদের গ্রেফতারের দাবিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভিড় করছে। বিএনপির চেয়ারম্যানও বিচার নিশ্চিতের নির্দেশনা দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের নথিপত্র ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে।’
ইলিয়াস আলী, সালাহউদ্দিন ও চৌধুরী আলম গুমের মামলা
হাজার হাজার নেতাকর্মী গুম-খুনের শিকার হয়েছেন বলে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দিয়েছে বিএনপি। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে। এর মধ্যে বিএনপির আলোচিত নেতা ইলিয়াস আলী, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও চৌধুরী আলমকে গুমের মামলাও রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, সেটা বিএনপির পক্ষ থেকে তালিকা করেছে। ওই তালিকাটি আগেও ওনারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছেন। সেটি চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে আমাকে আবার জানানো হয়েছে। ২ হাজার ২৭৬ জন গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। ‘ক’ শ্রেণি, ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। আর ৮৪৮ জন হচ্ছেন যারা জুলাই আন্দোলনে শহীদ, আহত হয়েছেন সেটা। এছাড়াও আরও গুম-ক্রসফায়ারের ঘটনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অনেকগুলোর মধ্যে গুমের ৮১টি মামলা বাছাই করে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। আরও বেশকিছু গুমের মামলা হাতে নিয়েছি, যেগুলো পর্যায়ক্রমে তদন্ত করা হবে। ক্রসফায়ারের তদন্ত করা হচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের তদন্ত তো করেই যাচ্ছি। ট্রাইব্যুনালে এখন মোট ২২টি মামলা চলছে, এর মধ্যে গুম ও ক্রসফায়ারও আছে। আরও প্রায় ৩১টি মামলায় তদন্ত প্রায় শেষ। এগুলো পর্যায়ক্রমে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। ব্যাপক পর্যায়ে কাজ চলছে।’ তবে গুমের কতটি মামলা সেটি নিশ্চিত করেননি তিনি।
বিএনপির আলোচিত নেতাদের গুমের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘গুমের শিকার বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও সালাহউদ্দিন আহমদ (বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী), চৌধুরী আলমের গুমের বিষয়েও তদন্ত চলছে। এছাড়া মায়ের ডাকের ব্যানারে জমা দেওয়া ১০০টি ঘটনার সবগুলোর তদন্ত চলছে।’
কবে নাগাদ প্রতিবেদন আসতে পারে- জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত চলছে এটা বলতে পারি, তবে কবে নাগাদ তদন্ত শেষ করা হবে বা প্রতিবেদন দাখিল করা হবে সেটি তদন্ত সংস্থার সঙ্গে কথা না বলে জানানো ঠিক হবে না।’
তিন মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে
গুম-খুনের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) কেন্দ্রে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম করে নির্যাতনের মামলায় শেখ হাসিনা ও ১০ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।
সালাহউদ্দিন আহমদের গুমের মামলা
২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়া হয় বলে তখন অভিযোগ করেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। সেসময় সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপির মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই বছরের ১১ মে ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে স্থানীয় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
ভারতের পুলিশের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, সালাহউদ্দিন আহমদ শিলংয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করার সময় লোকজনের ফোন পেয়ে তাকে আটক করা হয়। আটকের পর বৈধ নথিপত্র ছাড়া ভারতে প্রবেশের অভিযোগে দেশটির ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মামলা করে মেঘালয় পুলিশ।
২০১৫ সালের ২২ জুলাই ভারতের নিম্ন আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের অভিযোগ গঠন করা হয়। এ মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে ২০১৮ সালে সালাহউদ্দিন আহমদ খালাস পান। ভারত সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে তাকে সেখানেই থাকতে হয়।
২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিলেও খালাস পান সালাহউদ্দিন আহমদ। আদালত তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই বছরের ৮ মে তিনি ভ্রমণ অনুমোদনের জন্য আসাম রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করেন। ভ্রমণের অনুমোদন দেওয়া হলে তিনি দেশে ফিরতে চান। দেশবাসী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হতে চান।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ৬ আগস্ট সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে ফেরার জন্য ভ্রমণ অনুমোদন বা ট্রাভেল পাস পান। ১১ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন।
এরপর ২০২৫ সালের ৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে গুমের অভিযোগ দেন তিনি। অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়।
ইলিয়াস আলী গুম
ইলিয়াস আলী ছিলেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। ছাত্রদলের সাবেক এ সাধারণ সম্পাদক সিলেট-২ আসনে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১২ সালের এপ্রিলে ঢাকার বনানীতে বাসার কাছ থেকে ইলিয়াস আলীকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ ১৫৩ জনকে গুম ও ২ হাজার ২৭৬ জন নেতাকর্মীকে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে সই করেন মির্জা ফখরুল।
অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার কথা জানিয়েছেন তারা। ভুক্তভোগীরা যেন ন্যায়বিচার পান সেজন্য ওই অভিযোগ দাখিল করার কথা জানিয়েছেন বিএনপির গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে গঠিত কমিটির একজন সদস্য।
চৌধুরী আলম গুম
২০১০ সালে বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম গুমের ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি জিয়াউল আহসানসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে চৌধুরী আলমের ছেলে আবু সাঈদ চৌধুরী এই অভিযোগ দায়ের করেন।
২০১০ সালের ২৫ জুন সন্ধ্যায় ফার্মগেট সংলগ্ন ইন্দিরা রোডের কালিন্দি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে থেকে সাবেক সিটি কাউন্সিলর চৌধুরী আলমকে অপহরণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অভিযোগে করা মামলায় তদন্তের অগ্রগতি হচ্ছে বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন
আ’ লীগের সময়ে ৩২৯৯ গুম-খুনের বিচার চেয়ে ফের ট্রাইব্যুনালে বিএনপি
ইলিয়াস আলীসহ অন্য গুম ব্যক্তিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সংসদে ব্যাখ্যা দাবি
গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল: চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন
গুমের অভিযোগ ও মামলার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনজীবী প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম করে নির্যাতনের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১০ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।’
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের শাসনামলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুমের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে। সেই সঙ্গে গোপন আটককেন্দ্র বা আয়নাঘরের অন্যতম হোতা হিসেবে পরিচিত সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১০৪ জনকে হত্যার মামলায় গত ১৪ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। এসব মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলমান।
গুমের মামলা তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের গুমের ঘটনার তদন্ত জোরালোভাবে চলছে। তদন্ত শেষ হলে শিগগির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় ১০১টি গুমের অভিযোগেরও তদন্ত চলছে।
হাসিনা-মামুন-বেনজীরের বিরুদ্ধে গুম-নির্যাতনের অভিযোগ
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদসহ অনেকের বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ দিয়েছেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মো. মশিউর রহমান (মামুন)। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে চলতি বছরের ২০২৬ সালের ০৬ এপ্রিল এই অভিযোগ জমা দেন মশিউর রহমান। গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ করার জন্য দেশে এসেছেন বলে জানান মশিউর রহমান। তিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন বলে জানান।
মশিউর রহমান জানান, ২০১৩ সালে তাকে প্রথমবার গুম করা হয়। এরপর ২০১৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আবারও তাকে গুম করে। গুম করে রেখে দীর্ঘ ছয় মাস তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট তাকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গারদে রাখা হয়। পরে তাকে আদালতে তুলে রিমান্ডে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। কারাবাসের পর মুক্তি পেলে একপর্যায়ে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান।
তিনি আরও জানান, তিনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। গুম, নির্যাতনের কারণে তিনি এখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন না।
গুমের ঘটনায় মায়ের ডাকের শতাধিক অভিযোগ
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০১টি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছে। ১০১ জনকে গুমের ঘটনায় এই অভিযোগগুলো করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯৫ জন এখনো ফিরে আসেননি।
২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মায়ের ডাকের নেতারা এই অভিযোগ দাখিল করেন। পরে সংগঠনের পক্ষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায়।
বিজ্ঞপ্তিতে মায়ের ডাকের সমন্বয়কারী সানজিদা ইসলাম জানান, মায়ের ডাকের নেতারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেওয়ার পর ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাজুল ইসলাম তাদের বলেন, অপরাধী যত শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
‘বাংলাদেশ গুম পরিবার’র ৩৯ অভিযোগ
পৃথক গুমের ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর ‘বাংলাদেশ গুম পরিবার’ নামক সংগঠনের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে ৩৯টি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের বিভিন্ন সময়ে এসব ব্যক্তি গুমের শিকার হন। এদের অধিকাংশই আর ফিরে আসেননি বলে অভিযোগ করা হয়।
জমা দেওয়া ৩৯ অভিযোগে গুমের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ৭০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এরও আগে ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর একই সংগঠনের (বাংলাদেশ গুম পরিবার) পক্ষ থেকে গুমের ঘটনার আরও ১১টি অভিযোগ দাখিল করা হয়। তারও আগে একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর চিকিৎসক ইসরাত রফিক ঈশিতা ও ব্যবসায়ী এনামুল কবির ২৩ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর গুমের অভিযোগ দাখিল করেন।
অভিযোগ দাখিলের পর বাংলাদেশ গুম পরিবারের আহ্বায়ক বেল্লাল হোসেন বলেন, ‘গত ১৫ বছরে যারা গুমের শিকার হয়েছেন তাদের অধিকাংশই আর ফিরে আসেননি। আমরা জানি না তারা আয়নাঘরে নাকি অন্য কোথাও বন্দি আছেন। বিষয়টি তদন্ত করে গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।’
তিনি বলেন, ‘এসব গুমের সঙ্গে বিগত সরকারের ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ অপরাধী জড়িত। তবে অভিযোগে আমরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭০ জনের নাম উল্লেখ করেছি। আমরা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি।’
১২ জন গুমের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে ১১ অভিযোগ
২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত গুম হওয়া ১২ জনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১১টি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে অপহৃত ১০ ব্যক্তির পক্ষে ৯টি এবং বাংলাদেশ গুম পরিবার নামের সংগঠনের আহ্বায়ক বেলাল হোসেন একটি এবং আইনজীবী সোহেল রানা অপর একটি অভিযোগ দাখিল করেন।
তবে ১২ জনের মধ্যে ১০ জন এখনো ফিরে আসেননি। ভুক্তভোগী ও নিখোঁজদের পক্ষে পরিবারের সদস্যরা এসব অভিযোগ দাখিল করেন। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার মন্ত্রিসভার সদস্য এবং র্যাব কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে। পরে ট্রাইব্যুনালে এ বিষয়ে ব্রিফ করেন তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এসময় গুম থেকে ফেরত আসা দুই ব্যক্তিসহ বাকি ১০ জনের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন
গুম-খুন নিয়ে ডকুমেন্টারির শুটিংয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ
গুম-খুনের বিচার চেয়ে হাইকোর্টের সামনে স্বজনদের কান্না
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ ও তার পরিবারের দুঃসহ অভিজ্ঞতা
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম ও আনিসুর রহমানকে ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর র্যাব অপহরণ করে। মুন্সীগঞ্জ থেকে সোহেল মিয়াজীকে ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করা হয়। ২০১১ সালের ১০ জুলাই বনানী থেকে আব্দুল্লাহ নিখোঁজ হন। একই বছরের ৩ ডিসেম্বর ইকবাল হোসেনকে আগারগাঁও থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘আইনুল ইসলামকে মদনপুর চৌরাস্তা থেকে ২০২০ সালের ৪ জুলাই উঠিয়ে নেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ২৭ আগস্ট মোহাম্মদ সাজুকে মোহাম্মদপুর থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কুদ্দুসর রহমান চৌধুরীকে ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর মিরপুর-১ থেকে তুলে নেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল মো. কাইয়ুমকে গাবতলী থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। ভাসানটেক থেকে মো. মোস্তফাকে ২০২০ সালের ৬ জুন উঠিয়ে নেওয়া হয়। আজ পর্যন্ত তাদের স্বজনেরা জানেন না এরা কোথায় আছেন। জীবিত নাকি মৃত।’
তাজুল ইসলাম সেসময় বলেন, ‘বাংলাদেশ গুম পরিবারের পক্ষ থেকে ৬৪টি ঘটনার তালিকা দেওয়া হয়েছে। এগুলো গ্রহণ করেছি। যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করব। বেশিরভাগ অভিযোগে তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অভিযুক্ত করা হয়েছে।’
ওই সংগঠনের আহ্বায়ক বেলাল হোসেনকে ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর উঠিয়ে নেওয়া হয়। পরে একই সালের ২ নভেম্বর তাকে একটা জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়। তিনিও ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেছেন। এছাড়া ৬ মাস ৩ দিন গুম করে রাখার অভিযোগে আইনজীবী সোহেল রানাও ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেছেন।
আইনজীবী সোহেল রানা জানান, ৬ মাস গুম করে রাখার ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আমাকে উত্তরা থেকে র্যাব সদস্যরা তুলে নিয়ে ৬ মাস গুম করে রাখেন। গুম থাকা দিনগুলোতে আমাকে অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কমপক্ষে ৪৫০ জনের বেশি আসামি, গ্রেফতার ১৬৭ জনের মতো। এসব মামলায় পলাতক ৩ শতাধিক আসামি।
প্রসিকিউটর কার্যালয় জানায়, পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে বিবিধ মামলা বা মিস কেসের সংখ্যা ৪১টির মতো। আর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে ২৪টি মামলায়। বিচার চলছে ২২টির বেশি মামলায়। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা মামলাগুলোর মধ্যে ৪টির রায় ঘোষণা করা হয়েছে। সেই ৪ মামলার রায়ে ৫৫ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং ১ জনকে ক্ষমা করা হয়েছে।
এফএইচ/ইএ/এমএমএআর

