Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে প্রথম দিনে ভোট পড়েছে রেকর্ড সর্বনিম্ন

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দুদিনব্যাপী নির্বাচনের প্রথম দিনে তুলনামূলকভাবে খুবই কম ভোট পড়েছে।নির্বাচনি সাব-কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১৩ মে) প্রথম দিন ১ হাজার ৭৭১টি...
Homeসামরিক নেতৃত্বে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় নয়, প্রযুক্তিতেও দক্ষ হতে হবে

সামরিক নেতৃত্বে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় নয়, প্রযুক্তিতেও দক্ষ হতে হবে

বর্তমান যুগে সামরিক নেতৃত্বকে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হলেই চলবে না; প্রযুক্তি, তথ্য, মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত যোগাযোগেও সমান দক্ষ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম।

বুধবার (১৩ মে) বাংলাদেশ মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) অধ্যয়নরত সশস্ত্র বাহিনীর তরুণ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি এ কথা বলেন।

বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের পরিবর্তিত চরিত্র তুলে ধরে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, আধুনিক যুদ্ধ আর শুধু ট্যাংক, কামান, বিমান বা প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান সময়ে সাইবার যুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, তথ্যযুদ্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, এখন কোনো রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই তার আর্থিক ব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সামরিক যোগাযোগ, জনমত ও তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে আঘাত করা সম্ভব। তাই বর্তমান যুগে সামরিক নেতৃত্বকে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হলেই চলবে না; প্রযুক্তি, তথ্য, মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত যোগাযোগেও সমান দক্ষ হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক নিরাপত্তা আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নিরাপত্তা সংস্কৃতি ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। পারমাণবিক নিরাপত্তা শুধু কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত নিরাপত্তা চিন্তার অংশ। তরুণ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সচেতন, দায়িত্বশীল ও পেশাগতভাবে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে।

এমআইএসটির ভূয়সী প্রশংসা করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, এই প্রতিষ্ঠান শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি সশস্ত্র বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্র। এমআইএসটির গবেষণাগার, শ্রেণিকক্ষ, প্রকল্প ও একাডেমিক কার্যক্রমকে জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

তিনি দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন, স্বল্প ব্যয়ের ড্রোন, সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সিদ্ধান্ত সহায়তা ব্যবস্থা, নিরাপদ টেকটিক্যাল কমিউনিকেশন, কমান্ড কন্ট্রোল ও সার্ভেইলেন্স সিস্টেম এবং তথ্য বিভ্রান্তি প্রতিরোধে গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও দেশীয় গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যকর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। সবকিছু বিদেশ থেকে ক্রয় করে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কোন প্রযুক্তি বাংলাদেশ নিজস্ব সক্ষমতায় নকশা, পরীক্ষা, উন্নয়ন, উৎপাদন ও সুরক্ষা করতে পারে, তা চিহ্নিত করতে হবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। এই লক্ষ্যে সরকার দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন ও গবেষণা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি প্রধানমন্ত্রীর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে সামনে রেখে আত্মনির্ভরশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, দেশের তরুণ সামরিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের জন্য উপযোগী, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব।

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তার বক্তব্যের শুরুতেই মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, বাংলাদেশের জন্ম কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনার ফল নয়; বরং এটি লাখো মানুষের রক্ত, ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার ফসল। ১৯৭১ সালে জাতির ক্রান্তিলগ্নে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেশের মুক্তিকামী মানুষকে দিকনির্দেশনা ও সাহস জুগিয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক আহ্বান তরুণদের সংগঠিত করেছিল এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের মনোবলকে শক্তিশালী করেছিল।

তিনি উল্লেখ করেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে সামরিক সদস্য ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি রচনা করেছে। তাই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করা তরুণ কর্মকর্তাদের জাতীয় দায়িত্ব।

তিনি তরুণ কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব কেবল একটি পেশাগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি পবিত্র জাতীয় অঙ্গীকার। দেশপ্রেম কোনো আবেগমাত্র নয়; বরং এটি শৃঙ্খলা, সততা, আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রমাণ করার বিষয়।

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জাতীয় সংকটময় সময়গুলোতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সবসময় জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিরুদ্ধে যে কোনো ষড়যন্ত্র, বিশৃঙ্খলা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতেও সশস্ত্র বাহিনী দৃঢ় অবস্থানে থাকবে। জনগণের আস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উগ্রবাদ, বিভাজনমূলক প্রচারণা, গুজব, ধর্মের অপব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বাস, সহনশীলতা, সহাবস্থান ও মধ্যপন্থার দেশ। ধর্ম মানুষের চরিত্র, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও সাহসকে শক্তিশালী করে; কিন্তু ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা জাতীয় ঐক্য নষ্ট করতে পারে। তাই তরুণ কর্মকর্তাদের চরমপন্থা, সাম্প্রদায়িকতা, মব মানসিকতা এবং বিভ্রান্তিকর বয়ানের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় চেতনা সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বআরোপ করে বলেন, ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও প্রশ্ন করা জ্ঞানের অংশ; কিন্তু ইতিহাস বিকৃতি কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি। জুলাইয়ের জাতীয় চেতনা রাষ্ট্রের জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও নবায়নের আহ্বানকে সামনে এনেছে। ১৯৭১ এবং জুলাইকে একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করানো যাবে না। একটি আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি, অন্যটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার পুনর্জাগরণের আহ্বান।

বক্তব্যে তিনি এমআইএসটির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, অর্জিত জ্ঞানকে কেবল সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা বাস্তব প্রয়োগে রূপান্তর করতে হবে। ইউনিট ও ফরমেশনে ফিরে গিয়ে এমআইএসটি থেকে অর্জিত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে বাহিনীর কাজে লাগাতে হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন, সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং জাতীয় স্বার্থে জ্ঞান প্রয়োগের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

তিনি তরুণ কর্মকর্তাদের পাঠাভ্যাস, গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিতর্ক, সামরিক ইতিহাস অধ্যয়ন এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধসমূহ থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিল্পখাত, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বড় দায়িত্ব ও প্রকল্পে নিয়োজিত হলে সততা, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত পেশাগত জীবন বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। দুর্নীতি ও অনিয়ম শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অনুষ্ঠানের শেষে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এটি গড়ে উঠবে শৃঙ্খলাবদ্ধ চিন্তা, দেশপ্রেম, জ্ঞান, সাহস, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে।

তিনি তরুণ কর্মকর্তাদের ‘বাংলাদেশ প্রথম’ আদর্শ ধারণ করে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান। বলেন, তরুণ কর্মকর্তাদের শিক্ষা যেন শুধু যোগ্যতার সনদে সীমাবদ্ধ না থাকে; তা যেন পেশাগত উৎকর্ষ, সৎ নেতৃত্ব, জাতীয় দায়িত্ববোধ, উদ্ভাবন, শৃঙ্খলা এবং সাহসের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। আল্লাহ যেন সবাইকে প্রিয় বাংলাদেশকে সেবা করার শক্তি, প্রজ্ঞা ও যোগ্যতা দান করেন, এই প্রার্থনার মাধ্যমে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।

অনুষ্ঠানে এমআইএসটির কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামানসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশিক্ষণরত তরুণ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

টিটি/এমকেআর