হজের ফরজ তিনটি আর ওয়াজিব ছয়টি। এই আমলগুলো প্রতিটি আমলের নির্দিষ্ট সময়ে করতে হয়। আসুন হজের ফরজ ও ওয়াজিব আমলগুলোর বিবরণ বিস্তারিত জেনে নেই।
হজের ৩ ফরজ
হজের ফরজ ৩টি:
- ১. ইহরাম বাঁধা
- ২. আরাফার ময়দানে অবস্থান
- ৩. তওয়াফে জিয়ারত
১. ইহরাম বাঁধা
হজ ও ওমরাহর গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ইহরাম। নির্দিষ্ট স্থান থেকে হজ ও ওমরার নিয়তে নির্ধারিত নিয়মে ইহরাম বাঁধতে হয়। ইহরাম পরিধানের পর বৈধ অনেক কিছু হারাম হয়ে যায়।
সফর যদি সরাসরি মক্কায় হয়, তাহলে ঢাকা থেকে ইহরাম বেঁধে যেতে হবে। আর যদি প্রথমে মদিনা বা অন্য কোথাও যেতে হয়, তাহলে মক্কায় প্রবেশের সময় ইহরাম বাঁধতে হবে।
ইহরাম বাঁধার ফরজ দুইটি: এক. নিয়ত করা: হজের নিয়তে ইহরাম বাঁধা। নিয়ত হলো মূলত অন্তরের সিদ্ধান্ত। হজের নিয়ত মুখে এভাবে করতে পারেন, হে আল্লাহ, আমি হজের নিয়ত করলাম, আমার জন্য হজের সব কাজ সহজ করে দিন, আমার হজ কবুল করে নিন।
দুই. তালবিয়া পাঠ করা: তালবিয়া হলো—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।’ তালবিয়া উচ্চস্বরে পড়া। পরপর তিনবার তালবিয়া পাঠ করা মুস্তাহাব।
২. আরাফার ময়দানে অবস্থান করা
জিলহজের ৯ তারিখ মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। আরাফায় অবস্থান হজের ফরজ আমল। আরাফায় অবস্থানের আগে গোসল করা সুন্নত। মিনার ৬ কিলোমিটার পরে আরাফার ময়দান। বাংলাদেশিদের তাবু সাধারণত ময়দানের শেষ দিকে থাকে, ওই পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ১২/১৩ কিলোমিটার।
৯ জিলহজ দুপুরে সূর্য পশ্চিমে ঢলে যাওয়ার পর আরাফায় অবস্থান শুরু হয়, এই সময় কিছুক্ষণ অবস্থান করতে পারলেই ফরজ আদায় হয়ে যাবে। এখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত থাকা ওয়াজিব। নয় তারিখ সুবহে সাদিকের আগেও যদি কেউ আরাফায় অবস্থান করেন, তার ফরজ আদায় হয়ে যাবে।
আরাফার ময়দানে যদি মসজিদে নামিরায় ইমামুল হজের পেছনে নামাজ পড়লে দুই রাকাত জোহর ও দুই রাকাত আসর একসাথে পড়তে হবে। সেখানে নামাজ না পড়লে জোহর ও আসর আলাদা আলাদা পড়তে হবে।
এরপর মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। ওখানে গিয়েই মাগরিব ও এশা পড়ার নিয়ম। কিন্তু যদি প্রবল ধারণা হয় মুজদালিফায় যাওয়ার আগেই ফজরের ওয়াক্ত চলে আসবে, তাহলে রাস্তায় মাগরিব ও এশা পড়ে নেবেন।
৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা
হজের সর্বশেষ ফরজ আমল তাওয়াফে জিয়ারাত। ১২ জিলহজ সুর্যাস্তের আগেই এ তাওয়াফ সম্পন্ন করতে হয়। ১২ তারিখের পর তাওয়াফে জিয়ারত আদায় করলে দম বা কোরবানি দিতে হয়।
তাওয়াফ শব্দের অর্থ ঘোরা বা প্রদক্ষিণ করা। পরিভাষায় তাওয়াফের নিয়ত করে পবিত্র কাবা ঘরের হাজরে আসওয়াদের কোনা থেকে শুরু করে চারপাশে সাত বার ঘোরাকে তাওয়াফ বলা হয়।
হজে গিয়েই প্রথমে তওয়াফ করবেন। একে তওয়াফে কুদুম বলে। এটা সুন্নত। কিন্তু যে হাজি তামাত্তু করবেন, তিনি যেহেতু ৭ তারিখ দিবাগত রাতে ইহরাম বাঁধবেন, তার তওয়াফে কুদুম নাই।
সাত তারিখ রাতেই হাজিরা মিনায় চলে যাবেন। আট তারিখ রাতে মিনায় অবস্থান করতে হবে। মিনায় দোয়া কবুল হয়, তাই বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
হজের ৬ ওয়াজিব
হজের ওয়াজিব ৬টি:
- ১. মুজদালিফায় অবস্থান
- ২. কংকর নিক্ষেপ করা
- ৩. কোরবানি করা (তামাত্তু ও কেরান হজ পালনকারীর জন্য)
- ৪. মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা
- ৫. সাঈ করা
- ৬. বিদায়ী তওয়াফ
১. মুজদালিফায় অবস্থান
হজের প্রথম ওয়াজিব হলো মুজদালিফায় অবস্থান। আরাফায় সূর্যাস্ত পর্যন্ত থেকে সূর্যাস্তের পর মুজদালিয়ার দিকে রওয়ানা হতে হয়। মুজদালিফায় গিয়ে ইশার সময় মাগরিব ও ইশা এক আজানে ও একই ইকামতে একসঙ্গে আদায় করতে হয়। মুজদালিফায় সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করতে হয়।
২. কংকর নিক্ষেপ করা
১০ জিলহজ সূর্যাস্তের পর আল্লাহর রসুল (সা.) কংকর নিক্ষেপের জন্য মিনার উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে ১১ জিলহজ সুবহে সাদিক পর্যন্ত প্রথম দিনের কংকর নিক্ষেপের সুযোগ আছে। এ সময়ের মধ্যে ভাগ আছে:
- সূর্যোদয় থেকে জোহর পর্যন্ত মুস্তাহাব সময়।
- জোহর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মুবাহ সময়।
- সূর্যাস্ত থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত মাকরুহ সময়, যদি কেউ বিনা ওজরে বিলম্ব করে।
১১ ও ১২ তারিখও কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। নিক্ষেপের সময় জোহরের পর থেকে শুরু হবে, এর আগে নিক্ষেপ করলে হবে না। শুরুটা হবে মিনার দিক থেকে, তিন শয়তানকেই কংকর নিক্ষেপ করতে হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় শয়তানকে কংকর নিক্ষেপের পর মধ্যবর্তী সময়ে দোয়া কবুল হয়।
১৩ তারিখ কংকর নিক্ষেপ করা ঐচ্ছিক। তবে কেউ যদি সুবহে সাদিকের পর মিনায় অবস্থান করেন, তার জন্য কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।
৩. কোরবানি করা (তামাত্তু ও কেরান হজ পালনকারীর জন্য)
তামাত্তু ও কিরান হজ পালনকারীদের ১০ জিলহজ কোরবানি করতে হয়। এটাও হজের ওয়াজিব আমল। ইফরাদ হজ পালনকারীদের কোরবানি করতে হয় না।
৪. মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা
কোরবানির দিনগুলোতে হারামের সীমার ভেতরে মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা ওয়াজিব। এর মধ্য দিয়ে হজ পালনকারীরা হজের ইহরাম থেকে বের হয়ে যায়। স্ত্রী সঙ্গম ছাড়া যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।
৫. সাঈ করা
তাওয়াজের জিয়ারতের পর সাফা-মারওয়া গিয়ে সাঈ করা ওয়জিব। সাফা পাহাড়ের ওপরে আরোহন করে সেখান থেকে কিবলামুখী হয়ে সাঈর নিয়ত করে সাঈ শুরু করবেন। সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী নির্ধারিত চিহ্নিত স্থান দ্রুতবেগে অতিক্রম করবেন। মারাওয়া পাহাড়ে আরোহন করে দোয়া করে আবার সাফায় ফিরে আসবেন। এভাবে সাতটি চক্কর দিলে একটি সাঈ পূর্ণ হয়।
৬. বিদায়ী তওয়াফ
হজের সব আমল শেষ করার পর বিদায়ী তাওয়াফ করা ওয়াজিব। হজ শেষে যে কোনো নফল তাওয়াফই বিদায়ী তাওয়াফ পরিণত হয়ে যায়। বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমে হজের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
ওএফএফ

