Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img
Homeহামের উপসর্গে অবহেলা নয়, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি

হামের উপসর্গে অবহেলা নয়, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি

বর্তমানে বাংলাদেশে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিয়মিত টিকাদান থেকে পিছিয়ে থাকা বা টিকা না নেওয়া। প্রতিরোধযোগ্য এই রোগটি এখন আবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সচেতনতার অভাব, ভুল ধারণা এবং টিকা গ্রহণে অনীহা-সব মিলিয়ে ঝুঁকিতে পড়েছে শিশুদের জীবন।

এসব বিষয় নিয়ে রাজধানীর আদ-দ্বীন মহিলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নুসরাত জাহানের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জান্নাত শ্রাবণী

জাগো নিউজ: বর্তমানে বাংলাদেশে হামের প্রকোপ যেভাবে বাড়ছে, এর প্রধান কারণগুলো কী বলে আপনি মনে করছেন?

ডা. নুসরাত জাহান: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রকোপ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো শিশুদের নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি। অনেক অভিভাবক নানা ভুল ধারণা, অবহেলা কিংবা সচেতনতার অভাবে সময়মতো শিশুদের এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা দিচ্ছেন না। এছাড়া শহর ও গ্রামে জনসংখ্যার ঘনত্ব, আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত আলাদা না রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানাও সংক্রমণ বাড়াচ্ছে। করোনাকালের সময় অনেক শিশুর নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হয়েছিল। তারও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন দেখা যাচ্ছে। ফলে যেসব শিশু আগে সুরক্ষার আওতায় আসার কথা ছিল, তাদের অনেকেই এখন ঝুঁকিতে রয়েছে।

বর্তমানে ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, একটি জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ রাখতে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। যেহেতু এটার ঘাটতি আছে, সেহেতু এটি মহামারির আকার নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জাগো নিউজ: হাম কী ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ এবং এটি কীভাবে একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ে?

ডা. নুসরাত জাহান: হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটা আরএন এ ভাইরাস দ্বারা হয়ে থাকে। এটি মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসে ভাইরাস ছড়িয়ে যায় এবং অন্য কেউ সেই বাতাসের সংস্পর্শে এলে খুব সহজেই আক্রান্ত হতে পারে। এই ভাইরাস দুই ঘণ্টা পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে।

বিশেষ করে একই ঘরে থাকা, আক্রান্ত শিশুর ব্যবহৃত জিনিস স্পর্শ করা কিংবা ভিড়ের মধ্যে থাকা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। হামের ভাইরাস এতটাই সংক্রামক যে একজন আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে টিকা না নেওয়া প্রায় সবাই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

জাগো নিউজ: হামে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় করণীয় কী?

ডা. নুসরাত জাহান: হাম বা মিজেলস একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত হাম শুরু হওয়ার ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। খুব কম ক্ষেত্রেই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন পড়ে। তাই হামে আক্রান্ত সব শিশুকে হাসপাতালে নেওয়ার দরকার নেই। আক্রান্ত শিশুর মধ্যে যেসব লক্ষণ দেখা দিলে হাসপাতালে নেওয়া উচিত- রোগীর শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হলে, বুকের খাঁচা দেবে গেলে, তরল খাবার বা বুকের দুধ খেতে না পারলে, বার বার বমি হলে, খিঁচুনি, নিস্তেজ, তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ডাকে সাড়া না দিলে, মুখে ঘা, চোখে সমস্যা, চোখ খুলতে না পারা, তীব্র পানিশূন্যতা দেখা দিলে, দিনে অন্তত সাত-আটবার প্রস্রাব না হলে।

জাগো নিউজ: নবজাতক ও ছোট শিশুদের জন্য হাম কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা কি বেশি দেখা যায়?

ডা. নুসরাত জাহান: নবজাতক ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য হাম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ এ বয়সে তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠে না। ফলে ভাইরাস শরীরে দ্রুত প্রভাব ফেলে এবং নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, মারাত্মক পানিশূন্যতা, খিঁচুনি এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণ পর্যন্ত হতে পারে। অনেক সময় শ্বাসকষ্ট এতটাই বেড়ে যায় যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ঝুঁকি আরও বেশি।

জাগো নিউজ: অনেক অভিভাবক হামের প্রাথমিক লক্ষণ বুঝতে পারেন না। কোন উপসর্গগুলো দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

ডা. নুসরাত জাহান: হামের শুরুতে সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো মনে হতে পারে। তবে কয়েকটি লক্ষণ খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। যেমন- উচ্চমাত্রার জ্বর, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া, শুকনো কাশি, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, শিশু অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়া। সাধারণত মুখমণ্ডল থেকে ফুসকুড়ি শুরু হয়ে ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়, খেতে না পারে, বারবার বমি করে, খিঁচুনি হয় বা অস্বাভাবিক ঝিমিয়ে পড়ে তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।

জাগো নিউজ: বর্তমানে যেসব শিশু হাম আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের মধ্যে টিকা না নেওয়ার প্রবণতা কতটা দায়ী?

ডা. নুসরাত জাহান: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমানে হাম আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশই পূর্ণ টিকাদান পায়নি। কেউ এক ডোজ নিয়েছে, কেউ আবার কোনো টিকাই নেয়নি। অনেক অভিভাবক মনে করেন, শিশুকে ঘরে রাখলেই সে নিরাপদ থাকবে। কিন্তু হাম এতটাই সংক্রামক যে আশপাশে সংক্রমণ থাকলে ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই টিকা না নেওয়ার প্রবণতা বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্যতম বড় কারণ।

জাগো নিউজ: হাম প্রতিরোধে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার কার্যকারিতা কতটা? টিকা নেওয়ার পরও কি হাম হওয়ার ঝুঁকি থাকে?

ডা. নুসরাত জাহান: এমআর টিকা হামের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দুই ডোজ টিকা নিলে অধিকাংশ শিশুই ভালো সুরক্ষা পায়। তবে খুব অল্প সংখ্যক ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও হাম হতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা সাধারণত অনেক কম থাকে এবং জটিলতার ঝুঁকিও কমে যায়। তাই টিকা নেওয়া মানে শুধু সংক্রমণ প্রতিরোধ নয়, বরং গুরুতর অবস্থা থেকে শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া।

জাগো নিউজ: নবজাতক বা খুব ছোট শিশু যারা এখনো টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছেনি, তাদের সুরক্ষায় পরিবার কী ধরনের সতর্কতা নিতে পারে?

ডা. নুসরাত জাহান: যেসব শিশু এখনো টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছেনি, তাদের সুরক্ষায় পরিবারের সবাইকে সচেতন হতে হবে। যেমন- শিশুকে ভিড় ও কোলাহলপূর্ণ জায়গায় না নেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তি থেকে দূরে রাখা, পরিবারের সদস্যদের হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা, কারও জ্বর বা ফুসকুড়ি থাকলে শিশুর কাছাকাছি না আসা, বাসার পরিবেশ পরিষ্কার রাখা। এছাড়া পরিবারের অন্য শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া খুব জরুরি। কারণ পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে নবজাতকের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন
হাম শুধু শরীর নয়, শিশুর মনেও ফেলছে প্রভাব
কিশোরীদের মাসিকের ব্যথা বেশি হয় কেন? যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি ঘাটতিতে বাড়ছে মায়েদের হাড়ের ঝুঁকি

জাগো নিউজ: হাম আক্রান্ত শিশুকে বাসায় কীভাবে যত্ন নিতে হবে এবং কোন ভুলগুলো অভিভাবকদের এড়িয়ে চলা উচিত?

ডা. নুসরাত জাহান: হাম আক্রান্ত শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রামে রাখতে হবে এবং বেশি বেশি তরল খাবার দিতে হবে। জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দিতে হবে। শিশুর চোখ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করতে হবে। অনেক অভিভাবক নিজেরা ওষুধ কিনে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করেন, যা ঠিক নয়। কারণ হাম ভাইরাসজনিত রোগ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। এছাড়া শিশুকে গরম কাপড়ে অতিরিক্ত ঢেকে রাখা বা গোসল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার মতো ভুল ধারণাও এড়িয়ে চলতে হবে।

জাগো নিউজ: অপুষ্টি বা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে হাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে?

ডা. নুসরাত জাহান: অপুষ্ট শিশুদের জন্য হাম খুবই ভয়াবহ হতে পারে। কারণ তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা কম থাকে। ফলে সংক্রমণ দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। এ ধরনের শিশুদের নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, ওজন দ্রুত কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতায় ভোগার ঝুঁকি বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। তাই অপুষ্টি প্রতিরোধ এবং শিশুর সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

জাগো নিউজ: বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী থাকবে, যাতে শিশুদের হাম থেকে নিরাপদ রাখা যায়?

ডা. নুসরাত জাহান: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-শিশুর টিকা যেন কোনোভাবেই বাদ না যায়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এমআর টিকা অবশ্যই দিতে হবে। পাশাপাশি শিশুর জ্বর, কাশি বা ফুসকুড়িকে অবহেলা করা যাবে না। অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, সচেতনতা ও সময়মতো টিকাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

জাগো নিউজ: অনেক ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য।

ডা. নুসরাত জাহান: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

জেএস/এমএমএআর