Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

চুয়াডাঙ্গায় ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি চক্রের দুই সদস্য গ্রেফতার

চুয়াডাঙ্গা দর্শনার বেগমপুর ইউনিয়নে পরিষদে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরির ঘটনায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও উদ্যোক্তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার (৯ মে) সকালের দিকে ইউনিয়নে পরিষদে অভিযান...
Homeযুক্তরাষ্ট্রের ওয়াবাশ নদীর তীরে শান্তির ঠিকানা

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াবাশ নদীর তীরে শান্তির ঠিকানা

২ মে দীর্ঘ বিমানযাত্রার ক্লান্তি পেরিয়ে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের ওয়েস্ট লাফায়েট শহরে পৌঁছালাম; তখন স্থানীয় সময়ের আকাশে সন্ধ্যার মৃদু আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। হাজার মাইল দূরের এক নতুন ভূখণ্ডে পা রেখেও অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, যেন পরিচিত কোনো শান্ত শহরে এসে দাঁড়িয়েছি। শহরটির বুক চিরে বয়ে চলেছে ঐতিহাসিক ওয়াবাশ নদী। এই নদী কেবল একটি জলধারা নয় বরং ইন্ডিয়ানার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রার জীবন্ত সাক্ষী। ওয়াবাশ নামটির উৎপত্তি আদিবাসী মিয়ামি জনগোষ্ঠীর ভাষা থেকে। তাদের ভাষায় ‘ওয়াহ বাহ শিকি’ শব্দের অর্থ সাদা পাথরের ওপর ঝলমলে বিশুদ্ধ জল। শত শত বছর আগে এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল আদিবাসীদের বসতি, পরে ফরাসি অভিযাত্রী ও বণিকদের আনাগোনা শুরু হয়। ধীরে ধীরে নদীকেন্দ্রিক জনপদ বিস্তৃত হতে থাকে। আজও ওয়াবাশ নদী ইন্ডিয়ানার সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। নদীর তীরে দাঁড়ালে মনে হয়, ইতিহাস যেন আপন গতিতে বয়ে চলেছে জলের সঙ্গে সঙ্গে।

এ শহরেই আমার মেয়ে, জামাই ও ছোট্ট নাতনি বাঁশরীর স্নিগ্ধ সংসার। ওয়েস্ট লাফায়েটের শান্ত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে অবস্থিত মেফেয়ার ভিলেজ হাউজিং কমপ্লেক্সের একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট যেন তাদের ভালোবাসা আর স্বপ্নে গড়া শান্তির নীড়। বাইরে পরিচ্ছন্ন সবুজ লন, ছাঁটা গাছপালা আর নীরব পথঘাট পুরো পরিবেশটিকে আরও মায়াময় করে তুলেছে। ভেতরে আধুনিক সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন পরিপাটি সাজানো বাসাটি ছোট হলেও তার ভেতরে রয়েছে উষ্ণতা, আন্তরিকতা ও পারিবারিক আবেগের অপূর্ব স্পর্শ। জানালার পাশে নরম আলো এসে পড়ে, ছোট্ট বাঁশরীর খেলনা ছড়িয়ে থাকে ঘরের এক কোণে, আর সন্ধ্যায় পরিবারের হাসি ও গল্পে পুরো ঘরটি যেন প্রাণ ফিরে পায়। আমার জামাই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বর্তমানে পারডু ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত। তাদের ছোট্ট সংসারে প্রবেশ করার মুহূর্তেই অনুভব করলাম, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে পরিবারই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

ওয়েস্ট লাফায়েট শহরের প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো এর অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা। রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ, ছিমছাম বাড়ি, নিখুঁতভাবে কাটা সবুজ লন আর নিরবচ্ছিন্ন ফুটপাত শহরটিকে যেন জীবন্ত চিত্রপটে পরিণত করেছে। এখানে হর্নের শব্দ একেবারে নেই বললেই চলে। ব্যস্ত সড়কেও নেই বিশৃঙ্খলা বা ধাক্কাধাক্কি। ট্রাফিক আইন মেনে চলা এখানে শুধু বাধ্যবাধকতা নয়, নাগরিক সংস্কৃতির অংশ। গাড়িচালকরা পথচারী দেখলেই থেমে যান। লালবাতি অমান্য করা বা উল্টো পথে গাড়ি চালানোর কথা এখানে কল্পনাও করা যায় না। সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছি শহরের পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা দেখে। কোথাও ময়লার স্তূপ নেই, নেই দুর্গন্ধ বা অপরিচ্ছন্নতার চিহ্ন। প্রতিটি বাড়ির সামনে নির্দিষ্ট রঙের ডাস্টবিন। কোথাও রিসাইকেলযোগ্য বর্জ্য, কোথাও সাধারণ আবর্জনা। নির্ধারিত দিনে সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। নাগরিকরা নিয়ম মেনে চলেন বলেই পুরো শহরটিই যেন ঝকঝকে ও পরিপাটি।

river

ওয়েস্ট লাফায়েট মূলত একটি শিক্ষানগরী। এই শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম খ্যাতিমান শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পারডু ইউনিভার্সিটি। বিশাল ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে আছে গবেষণাগার, লাইব্রেরি, আধুনিক ভবন, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং প্রায় চল্লিশ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আগত মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা এখানে জড়ো হয়েছেন জ্ঞানচর্চার বৈশ্বিক মিলনমেলায়। পরদিন সকালে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পারডু ক্যাম্পাস ঘুরতে বের হলাম। ক্যাম্পাসের প্রবেশমুখেই চোখে পড়লো নীল আর্মস্ট্রং হল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সামনে। মানব ইতিহাসে প্রথম চাঁদে পদচিহ্ন আঁকা এই কিংবদন্তি মহাকাশচারী ছিলেন পারডু ইউনিভার্সিটিরই গর্বিত শিক্ষার্থী। চাঁদে পা রাখা মানুষটির স্মৃতি যেন ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে আছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি মানুষের অদম্য কৌতূহল এখানে প্রতিটি দেওয়ালে অনুভব করা যায়। ক্যাম্পাসের আরেকটি আকর্ষণীয় স্থান হলো পারডুর বিখ্যাত বেল টাওয়ার। সন্ধ্যার সময় এর চারপাশে শিক্ষার্থীদের আড্ডা, হাঁটাহাঁটি আর নির্মল পরিবেশ মনকে অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। বিশাল সবুজ মাঠ, সুপরিকল্পিত রাস্তা এবং ছায়াঘেরা পথগুলোতে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, শিক্ষা এখানে কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয় বরং পুরো জীবনব্যবস্থার সঙ্গে মিশে আছে।

এক বিকেলে ওয়াবাশ নদীর তীরে হাঁটতে গিয়েছিলাম। নদীর পাড়জুড়ে নির্মিত রিভার ট্রেইল যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য স্বর্গীয় পথের মতো বিস্তৃত হয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেই প্রকৃতির স্নিগ্ধ স্পর্শ অনুভব করা যায়। নদীর শান্ত জলে আকাশের রং মিশে যাচ্ছিল অপূর্ব ক্যানভাসের মতো, যেন প্রকৃতি নিজেই রংতুলিতে আঁকছে তার নিজের প্রতিচ্ছবি। দূরে ছোট ছোট নৌকা ভেসে চলছিল ধীর গতিতে, তাদের নীরব গতি যেন সময়কেও থমকে দিচ্ছিল অনন্ত প্রশান্তির ভেতর। নদীর ওপারে দেখা যাচ্ছিল সবুজে ঘেরা লাফায়েট শহর, যেখানে গাছপালা আর ছিমছাম ঘরবাড়ি মিলেমিশে শান্ত চিত্রপট রচনা করেছে। চারপাশের নীরবতা আর স্নিগ্ধ বাতাস মনে অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তখন মনে হচ্ছিল, মানুষ প্রকৃতির এত কাছে থাকলে হয়তো তার মনও অনেক বেশি কোমল, সংবেদনশীল ও প্রশান্ত হয়ে ওঠে।

শহরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকাও অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। ছোট ছোট কাঠের বাড়ি, রঙিন ফুলে সাজানো সামনের উঠান, শিশুদের খেলাধুলার পার্ক এবং নিরিবিলি পরিবেশ পুরো এলাকাকে শান্তির আবাসে পরিণত করেছে। এখানে রাত গভীরেও মানুষ নিশ্চিন্তে হাঁটাচলা করতে পারে। চুরি, ছিনতাই বা অপরাধের ভয় তুলনামূলকভাবে খুবই কম। আইনশৃঙ্খলার কঠোর প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ শহরটিকে নিরাপদ আবাসে পরিণত করেছে।

river

এ শহরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও অত্যন্ত গর্বের বিষয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে বুয়েট থেকে পাস করা অসংখ্য মেধাবী তরুণ-তরুণী এখানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা করছেন, কেউ কৃষি প্রযুক্তি ও পরিবেশ প্রকৌশল, কেউ আবার উন্নত প্রযুক্তি বা মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছেন। তাদের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বাংলাদেশের সম্ভাবনারও প্রতিচ্ছবি। বিদেশের মাটিতে থেকেও শিক্ষার্থীরা নিজেদের শেকড়কে ভুলে যাননি। সুযোগ পেলেই তারা একত্রিত হন, বাংলা ভাষায় কথা বলেন, বৈশাখ উদযাপন করেন, দেশের খাবার রান্না করেন। দূরদেশে থেকেও তাদের ভেতরে বাংলাদেশের প্রতি গভীর আবেগ কাজ করে। এ দৃশ্যগুলো মনকে এক ধরনের প্রশান্তি দেয়।

এখানকার জীবনযাত্রা অত্যন্ত সময়নিষ্ঠ ও পরিকল্পিত। মানুষ সময়কে মূল্য দিতে জানে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সবকিছু একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চলে, যেন প্রতিটি মুহূর্তই একটি অদৃশ্য শৃঙ্খলার সুতোয় বাঁধা। কারো ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় অযথা হস্তক্ষেপ নেই, আবার সামাজিক দায়িত্ববোধেরও ঘাটতি নেই; উভয়ের মধ্যেই সুসমন্বিত ভারসাম্য বিদ্যমান। এক ধরনের নীরব শৃঙ্খলা পুরো শহরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, যা চোখে না পড়লেও অনুভবে স্পষ্ট। তবে প্রযুক্তি ও আধুনিকতার এ শহরে দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যে বাংলাদেশের কথাও খুব মনে পড়ে। গ্রামের কাঁচা রাস্তা, বর্ষার বৃষ্টি, চায়ের দোকানের আড্ডা কিংবা পরিচিত মুখগুলো স্মৃতিতে ভেসে ওঠে অনির্বচনীয় টানে। মানুষ যত দূরেই যাক, নিজের মাটির টান কখনো ফুরিয়ে যায় না বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও গভীর ও নিবিড় হয়ে ওঠে।

ওয়াবাশ নদীর তীরে এক সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে মনে হলো, পৃথিবী আসলে কত বিচিত্র অথচ কত কাছাকাছি। একদিকে আমেরিকার আধুনিক জীবন, অন্যদিকে হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা বাংলাদেশের স্মৃতি—দুটি ভুবন যেন এসে মিলেছে এই ওয়েস্ট লাফায়েট শহরে। এ সফর শুধু একটি বিদেশ ভ্রমণ নয়, এটি ছিল নতুন সভ্যতা, নতুন জীবনধারা এবং মানুষের অর্জিত শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অনন্য অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার মাঝেও সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো—জ্ঞান, পরিশ্রম ও স্বপ্ন মানুষকে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে সম্মানের আসনে পৌঁছে দিতে পারে এবং বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীরা আজ সেই সত্যকেই নীরবে প্রমাণ করে চলেছেন।

এসইউ