যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার আটলান্টায় অবস্থিত মার্সিডিজ-বেন্জ স্টেডিয়াম এখন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও ব্যতিক্রমধর্মী ক্রীড়া ভেন্যু। অত্যাধুনিক ভাঁজযোগ্য ছাদ, বিশাল বৃত্তাকার ভিডিও বোর্ড, দর্শকবান্ধব সুযোগ-সুবিধা এবং বিলিয়ন ডলারের নির্মাণব্যয়ে গড়া এই স্টেডিয়াম ইতোমধ্যেই আমেরিকান ফুটবল, সকার ও বিশ্বের বড় বড় ক্রীড়া আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
২০১৭ সালে উদ্বোধনের পর থেকেই এটি আয়োজন করেছে সুপার বোল, কলেজ ফুটবলের বড় ফাইনাল এবং মেজর লিগ সকারের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপেও একাধিক ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে বৈশ্বিক মঞ্চে আরও বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে এই অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম।
এটি তৈরি করা হয়েছিল পুরোনো জর্জিয়া ডোমের পরিবর্তে। বর্তমানে এটি মার্কিন জাতীয় ফুটবল লিগের আটলান্টা ফ্যালকন্স, মেজর লিগ সকারের আটলান্টা ইউনাইটেড এবং জাতীয় নারী ফুটবল লিগের একটি সম্প্রসারণ দলের হোম ভেন্যু।
মার্সিডিজ বেনজ স্টেডিয়ামের মালিক জর্জিয়া অঙ্গরাজ্য। পরিচালনা করে এএমবি গ্রুপ, যারা ফ্যালকন্স ও আটলান্টা ইউনাইটেডের মূল সংগঠন। ২০১৬ সালে এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার।
২০১৭ সালের ২৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া স্টেডিয়ামটিতে পরে স্থানান্তরিত হয় জর্জিয়া ডোমে অনুষ্ঠিত হওয়া অনেক বড় আয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব সম্মেলনের ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ, পিচ বোল এবং কলেজ ফুটবল প্লে-অফ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের মতো আসর।

২০১৮ সালে এখানে অনুষ্ঠিত হয় মেজর লিগ সকার কাপ এবং ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হয় সুপার বোল এলআইআইআই। ২০২৮ সালে এখানে হবে সুপার বোল এলএক্সআইআই। এছাড়া ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের একাধিক ম্যাচও আয়োজন করবে এই স্টেডিয়াম।
ছাদেই সবচেয়ে বড় বিস্ময়
স্টেডিয়ামটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর প্রত্যাহারযোগ্য ছাদ। আটটি স্বচ্ছ ত্রিভুজাকার প্যানেল নিয়ে তৈরি এই ছাদ দেখতে অনেকটা পাখার মতো। প্রতিটি প্যানেল দুটি সমান্তরাল রেলের ওপর চলে। একটি রেল প্যানেল সরায়, অন্যটি স্থিতিশীল রাখে।
ছাদ বন্ধ করতে যতটা সময় লাগে, খুলতে তার চেয়ে কিছুটা বেশি সময় লাগে। কারণ খোলার শুরুতে সিল আলাদা করতে হয় এবং শেষে ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে প্যানেলকে রেলচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে হয়। পুরো ছাদ খুলে গেলে তা পাখির ডানা মেলার মতো দৃশ্য তৈরি করে।

স্থপতি বিল জনসন জানান, ছাদের মাঝখানের গোলাকার অংশের ধারণা এসেছে রোমের বিখ্যাত প্যানথিয়ন থেকে। শুরুতে এই নকশার নামও ছিল ‘প্যানথিয়ন’। ছাদে ব্যবহৃত হয়েছে হালকা স্বচ্ছ পলিমার পদার্থ, যা আলোর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। স্টেডিয়ামের বাইরের বড় অংশ কাঁচ ও স্বচ্ছ পলিমারে তৈরি, যাতে আটলান্টা শহরের দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়।
বিশাল ভিডিও বোর্ড
ছাদের নিচে রয়েছে ‘হ্যালো’ নামের রিং আকৃতির বিশাল ভিডিও বোর্ড। এর আকার ৫৮ ফুট ×১১০০ ফুট বা প্রায় ১৮ ×৩৩৫ মিটার। মোট আয়তন ৬২ হাজার ৩৫০ বর্গফুট। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডাকট্রনিকস একে এনএফএলের তৎকালীন সবচেয়ে বড় ভিডিও বোর্ডের চেয়েও তিন গুণ বড় বলে উল্লেখ করেছিল।
এছাড়া স্টেডিয়ামে আরও ২০ হাজার বর্গফুটের বেশি এলইডি বোর্ড রয়েছে, যেগুলো ফুটবল ম্যাচের বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করা হয়।
হালকা বৃষ্টিতেও খোলা থাকে ছাদ
স্টেডিয়ামের সব ভিডিও বোর্ড বাইরের আবহাওয়া সহনশীল হওয়ায় এবং মাঠে বিশেষ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকায় হালকা বৃষ্টির মধ্যেও ছাদ খোলা রাখা যায়। এএমবি গ্রুপের কর্মকর্তা মাইক এগান একে ‘ছাদযুক্ত উন্মুক্ত স্টেডিয়াম’ বলেও বর্ণনা করেছেন।
কলেজ ফুটবলের জন্য বিশেষ সুবিধা
স্টেডিয়ামে কলেজ ফুটবলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে দুটি বড় ড্রেসিংরুম আছে, যেখানে একসঙ্গে ১০০ জন খেলোয়াড় থাকতে পারেন। তবে শুরুতে মাঠে ওঠার জন্য গ্যালারি থেকে সরাসরি সিঁড়ি না থাকায় ব্যান্ড দলের মাঠে প্রবেশে সমস্যা হতো।

ফুটবলের জন্যও রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। নিচের আসন সরিয়ে মাঠ বড় করা যায় এবং যান্ত্রিক পর্দা ব্যবহার করে ধারণক্ষমতা কমিয়ে প্রায় ৪২ হাজার ৫০০ করা সম্ভব।
শিল্পকর্মেও অনন্য
স্টেডিয়ামের ভেতর ও বাইরে রয়েছে ১৮০টির বেশি শিল্পকর্ম। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত গাবর মিকলোস সোকের তৈরি স্টেইনলেস স্টিলের ‘দ্য আটলান্টা ফ্যালকন’ ভাস্কর্য। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বাধীনভাবে দাঁড়ানো পাখির ভাস্কর্য হিসেবে পরিচিত।
১৩ ফুট উঁচু ব্রোঞ্জের ফুটবলের ওপর বসানো এই বাজপাখির উচ্চতা ৪১ ফুট এবং ডানার বিস্তার ৭০ ফুট। ভাস্কর্যটির ওজন ৭৩ হাজার পাউন্ডের বেশি এবং এটি চারতলা ভবনের সমান উঁচু।
দর্শকদের জন্য আলাদা আকর্ষণ
উপরের কনকোর্সে রয়েছে ‘১০০ ইয়ার্ড ক্লাব’, যা পুরো মাঠজুড়ে বিস্তৃত খাবার ও আড্ডার জায়গা। এছাড়া আছে ‘এটি অ্যান্ড টি পার্চ’, যেখানে টেলিভিশন ও ভিডিও দেয়ালে অন্য ম্যাচও দেখা যায়। এটি বিশেষ করে কল্পিত ফুটবল প্রতিযোগিতার দর্শকদের জন্য জনপ্রিয়।
স্টেডিয়ামের পাশে পুরোনো জর্জিয়া ডোমের জায়গায় তৈরি হয়েছে ‘দ্য হোম ডিপো ব্যাকইয়ার্ড’ নামে ১১ একরের সবুজ এলাকা, যা টেলগেটিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।
খাবারের দামে বিপ্লব
মার্সিডিজ-বেন্জ স্টেডিয়াম দর্শকবান্ধব খাবারের মূল্যের জন্যও বিখ্যাত। এখানে অন্তত ৬৭০টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। ‘ভক্ত সবার আগে’ নীতির আওতায় অন্যান্য স্টেডিয়ামের তুলনায় অনেক কম দামে খাবার বিক্রি করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে, মাত্র ২ ডলারে পানীয় কাপ এবং বিনামূল্যে পুনরায় ভর্তি সুবিধা রয়েছে। ৫ ডলারে বিয়ারও পাওয়া যায়। সব পণ্যের দাম পূর্ণ ডলারে নির্ধারণ করা হয় এবং ট্যাক্স আগেই যুক্ত থাকে। এই কম দামের নীতি স্টেডিয়ামের আয়ও বাড়িয়েছে, কারণ দর্শকরা বেশি কেনাকাটা করেছেন।
স্থানীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া
স্টেডিয়ামে আটলান্টার বিখ্যাত রেস্তোরাঁ ও খাবারের ব্র্যান্ডের উপস্থিতি রয়েছে। ‘বেস্ট অব আটলান্টা’ কর্মসূচির অধীনে চিক-ফিল-এ, দ্য ভার্সিটি ও কেভিন গিলেসপির মতো প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। চিক-ফিল-এ সাধারণত রোববার বন্ধ থাকে। তাই রোববারের ম্যাচে তাদের জায়গায় ‘ফ্রাইজ আপ’ নামে অন্য স্টল চালু হয়।
পরিকল্পনা থেকে বাস্তবতা
২০১০ সালে প্রথম নতুন স্টেডিয়ামের পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসে। আটলান্টা ফ্যালকন্স খোলা মাঠে খেলার ইচ্ছা এবং আরেকটি সুপার বোল আয়োজনের লক্ষ্য থেকে নতুন স্টেডিয়াম চেয়েছিল। শুরুতে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭০ কোটি ডলার। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪ কোটি ৭৭ লাখ ডলারে। শেষ পর্যন্ত ব্যয় গিয়ে পৌঁছায় ১২০ কোটি ডলারে।
২০১৩ সালের মার্চে আটলান্টা শহর ও ফ্যালকন্স নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে। প্রকল্পে সরকারি সহায়তা ছিল ২০ কোটি ডলার।
নির্মাণে বিলম্ব
আট প্যানেলের জটিল ছাদের কারণে উদ্বোধনের সময় তিনবার পেছানো হয়। শুরুতে ২০১৭ সালের ১ মার্চ উদ্বোধনের কথা থাকলেও পরে তা জুন, জুলাই হয়ে শেষ পর্যন্ত ২৬ আগস্টে গিয়ে দাঁড়ায়।
ছাদ নিয়ে সমস্যা
স্টেডিয়ামের প্রথম মৌসুমেই ছাদে পানি পড়ার অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সালের কলেজ ফুটবল জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে মাঠের কাছে পানি পড়তে দেখা যায়। তবে কর্মকর্তারা বলেন, এটি বড় ধরনের চুইয়ে পড়া নয়, বরং কয়েক ফোঁটা পানি।
ছাদ পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু না হওয়ায় প্রথম বছরে মাত্র দুবার এটি খোলা হয়েছিল। পরে ২০১৮ সালে সমস্যাগুলো সমাধান করা হয়। এখন আট মিনিটেই ছাদ খোলা বা বন্ধ করা যায়।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে স্টেডিয়াম
২০১৮ সালে ‘বিল্ডিং জায়ান্টস’ অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে স্টেডিয়ামটির নির্মাণ নিয়ে বিস্তারিত দেখানো হয়। প্রতিবার ফ্যালকন্স বা আটলান্টা ইউনাইটেড গোল করলে কিংবা জিতলে ট্রেনের হুইসেল বাজানো হয়, যা আটলান্টার রেলপথ ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা।
২০২১ সালে কানিয়ে ওয়েস্ট তার ‘ডোন্ডা’ অ্যালবামের দুটি শ্রবণ অনুষ্ঠান এখানে করেন। অ্যালবামের কাজ করতে তিনি দুই সপ্তাহ স্টেডিয়ামের ভেতরেই ছিলেন এবং প্রতিদিন ১০ লাখ ডলার করে পরিশোধ করেন। ২০২৩ সালে মেজর লিগ উইফল বল বিশ্ব সিরিজও এখানে অনুষ্ঠিত হয়।
ক্যারোলাইনা প্যান্থার্সের কোয়ার্টারব্যাক ব্রাইস ইয়ংও এই স্টেডিয়ামে আটলান্টা ফ্যালকন্সের বিপক্ষে সাফল্যের জন্য পরিচিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফ্যালকন্সের বিপক্ষে ৫ ম্যাচে তার পাসার রেটিং ৯৫ দশমিক ৩, মোট ১১৩৩ গজ, ৭টি টাচডাউন এবং ২টি ইন্টারসেপশন রয়েছে। এছাড়া ২০২১ সালের দক্ষিণ-পূর্ব সম্মেলন চ্যাম্পিয়নশিপেও তিনি আলাবামাকে জয় এনে দিয়েছিলেন এই স্টেডিয়ামেই।
মার্সিডিজ-বেনজ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের সূচি
গ্রুপ পর্ব
১৫ জুন, স্পেন-কেপ ভার্দে, রাত ১০টা (১৫ জুন)
১৮ জুন, চেক প্রজাতন্ত্র-দক্ষিণ আফ্রিকা, রাত ১০টা (১৮ জুন)
২১ জুন, স্পেন-সৌদি আরব, রাত ১০টা (২১ জুন)
২৪ জুন, মরক্কো-হাইতি, রাত ৪টা (২৫ জুন)
২৭ জুন, কঙ্গো ডিআর-উজবেকিস্তান, ভোর ৫টা ৩০ মিনিট (২৮ জুন)
নকআউট পর্ব (শেষ ৩২)
১ জুলাই, শেষ ৩২ ম্যাচ-৮, রাত ১০টা (১ জুলাই)
নকআউট পর্ব (শেষ ১৬)
৭ জুলাই, শেষ ১৬ ম্যাচ ৭, রাত ১০টা
সেমিফাইনাল
১৫ জুলাই, সেমিফাইনাল-২, রাত ১টা (১৬ জুলাই)
* সূচি বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী।
আইএইচএস/

