রবিউল ইসলাম জামালপুরের একজন মৌসুমি গরু ব্যবসায়ী। ঢাকার কচুক্ষেতে কোরবানির পশুর হাটে ২২টি গরু নিয়ে এসেছেন। কয়েকদিন ধরে সেখানেই আছেন। তিনি একা নন, সঙ্গে আছে আরও তিনজন, যারা তার ব্যবসায়িক অংশীদার।
প্রতি বছর ঈদুল আজহার আগে জামালপুরের বিভিন্ন গ্রাম, খামার ও স্থানীয় হাট থেকে গরু কিনে ঢাকার বাজারে নিয়ে আসেন তারা। অল্প সময়ে কিছু লাভ করাই লক্ষ্য। প্রতি বছরের মতো এবারও এসেছেন কিছু লাভের আশায়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন।
রবিউলের কপালে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ। কারণ গতকাল পর্যন্ত মাত্র সাতটি গরু বিক্রি হয়েছে, যেখানে প্রত্যাশিত দাম পাননি। এবার ক্রেতাদের সঙ্গে দামের বড় ধরনের অমিল তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

ঢাকার কচুক্ষেতে কোরবানির পশুর হাটে ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন ক্রেতারা, ছবি: জাগো নিউজ
রবিউল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘মানুষ আসেন, দাম জিজ্ঞেস করেন, তারপর চলে যান। ক্রেতারা যে দাম বলছেন, তাতে আমাদের খরচই উঠবে না।’
তার ভাষ্য, এ বছর গরুর খাদ্য, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ অনেক বেড়েছে। শুধু ট্রাকে করে গরু ঢাকায় আনতেই আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা গুনতে হয়েছে।
‘আমরা তো অস্বাভাবিক লাভ করতে চাই না। খরচ তুলে সামান্য লাভ হলেই চলবে। কিন্তু ক্রেতারা আগের বছরের দামে গরু কিনতে চাইছেন।’ বলছিলেন রবিউল ইসলাম।
আরও পড়ুন
পশুর হাটে ক্রেতা কম, দাম ছাড়ছেন না বিক্রেতারা
‘মনে হয় না সব গরু বিক্রি করে বাড়ি ফিরতে পারবো’
‘দাম শুনে ব্যাপারীরা মুচকি হাসেন’
তবে এ হতাশা শুধু বিক্রেতাদের নয়, ক্রেতারাও বলছেন ভিন্ন ধরনের সংকটের কথা।
রাজধানীর একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মমিনুল হক এক লাখ টাকা বাজেট নিয়ে কচুক্ষেত পশুর হাটে এসেছিলেন পরিবারের জন্য একটি গরু কিনতে। কয়েক ঘণ্টা ঘুরেও পছন্দ ও বাজেটের মধ্যে কোনো গরু পাননি।
‘আমি ভেবেছিলাম এক লাখ টাকায় ভালো একটি গরু পাওয়া যাবে। কিন্তু যেগুলো পছন্দ হচ্ছে, সেগুলোর দাম চাওয়া হচ্ছে এক লাখ ৩০ বা ৪০ হাজার টাকা’, বলে জানান মমিনুল হক।
ঢাকার কচুক্ষেতে কোরবানির পশুর হাটে থাকা গরুদের একাংশ, ছবি: জাগো নিউজ
মমিনুল হকের মতে, মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এবার কোরবানির বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে গেছে। বছরজুড়ে দ্রব্যমূল্যের চাপ তো আছেই। বেড়েছে অন্যান্য খরচও।
এই হিসাব-নিকাশই এখন বড় ব্যবধান তৈরি করেছে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে।
ফলে কোরবানির পশুর হাটে বিক্রি প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না। বিক্রেতাদের চাওয়া দাম ও ক্রেতাদের প্রস্তাবিত দামের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকায় লেনদেন কমে গেছে।
খামারি ও ব্যবসায়ীরা গো-খাদ্যের মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন, অন্যদিকে ক্রেতাদের দাবি—পশুর দাম এখনো তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। ফলে দরকষাকষি বাড়লেও বাজারে বিক্রি জমে উঠছে না।
আরও পড়ুন
বৃষ্টির বাগড়া কাটিয়ে জমে উঠছে কোরবানির পশুর হাট
কোরবানির হাটে ভিড় বাড়লেও জমেনি বেচাকেনা, চাহিদা বেশি মাঝারি গরুর
কোরবানির হাটে দেশি গরু চেনার উপায়
হাট ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে দর কষাকষি চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ কাউকে মানতে পারছেন না। এক ক্রেতা একটি মাঝারি আকারের গরুর দাম শুনে প্রায় ২০ মিনিট দর কষাকষি করেন। গরুর ব্যাপারী মাত্র পাঁচ হাজার টাকা কমাতে রাজি হলে ক্ষুব্ধ হয়ে চলে যান ক্রেতা। অনেকের ক্ষেত্রেই এ ধরনের দর কষাকষি দেখা গেছে।
কাজীপাড়ার বাসিন্দা আশরাফুল আলাম বলেন, ‘দাম কিছুটা বাড়তে পারে। কারণ গো-খাদ্যের দাম ও অন্যান্য খরচ বেড়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা দাম অতিরিক্ত বেশি চাচ্ছেন। এভাবে তো বেচাকেনা হবে না।’
ঢাকার কচুক্ষেতে কোরবানির পশুর হাটে বেচাকেনা তুলনামূলক কম, ছবি: জাগো নিউজ
তবে অনেকে দর কষাকষির পর কিনেছেন কিন্তু আক্ষেপ রয়েছে।
‘যদিও দাম কিছুটা বেশি ছিল, তবু গরু কিনতে হয়েছে। দীর্ঘ দর কষাকষির পর শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছি। এটি এককালীন খরচ হওয়ায় অযৌক্তিক দাম হলেও কিনতে হয়েছে’, বলেন শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম।
অন্যদিকে গরুর খামারি ও ব্যাপারীরা বলছেন, তাদেরও দামের নিচে নামার সুযোগ নেই।
কুষ্টিয়া থেকে আসা জব্বার হোসেন নামের এক খামারি বলেন, ‘গরুর খাবারের দাম, ওষুধের দাম, পরিবহন—সবকিছু বেড়েছে। মানুষ ভাবে আমরা অনেক লাভ করি, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ক্রেতাদের দামে বিক্রি করি তাহলে অনেক ক্ষতি হবে আমাদের এবং সামনের দিনে আর গরু পালন করবো না।’

ঢাকার কচুক্ষেতে কোরবানির পশুর হাটে বাজেট অনুযায়ী গরু পাচ্ছেন না ক্রেতারা, ছবি: জাগো নিউজ
চলমান মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপের প্রভাবই এখন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে পশুর বাজারে। একদিকে বাড়তি খরচের কারণে ব্যবসায়ীরা বেশি দাম চাইছেন, অন্যদিকে সীমিত বাজেটের কারণে ক্রেতারা কম দামে গরু খুঁজছেন, বলে জানান হাট ইজারাদারের একজন সহকারী মোহাম্মাদ তালেব মাতবর, যিনি হাসিলের টাকা সংগ্রহের কাজে সহযোগিতা করছেন।
তালেব মাতবর জানান, কচুক্ষেত হাটে মানুষের ভিড় থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বেচাকেনা হচ্ছে না।
হাটের আরেক পাশে সিরাজগঞ্জ থেকে আসা লাব্লু মিয়া নামের এক ব্যবসায়ী একই ধরনের হতাশার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘অনেক ব্যবসায়ী ধার-দেনা করে গরু কিনে এনেছেন। আজ-কালের মধ্যে গরু বিক্রি না হলে বিপদে পড়ব। ঢাকায় প্রতিদিন গরু রাখা মানেই বাড়তি খরচ।’
তবে, বিক্রেতারা আশা করছেন আজ ও কাল বিক্রি জমে উঠবে এবং কাঙ্ক্ষিত দামে বেচতে পারবেন।
আইএইচও/এমএমএআর

