দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৩ মে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যেখানে স্টার্টআপের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই প্রণোদনা প্যাকেজকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখে স্বাগত জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা।
এই তহবিলের মূল লক্ষ্য হলো বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এই প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে মোট ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যার মধ্যে স্টার্টআপ খাত থেকেই ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এ উদ্দেশ্যেই স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং তা বিতরণ করা হবে।
আরও পড়ুন
নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে ‘নতুনত্ব’ চান ব্যবসায়ীরা
বন্ধ কারখানা চালু-অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল
দেশীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে না
বাড়ছে উৎসে কর, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ
দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সুফল পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজে স্টার্টআপের জন্য বরাদ্দকৃত ৫০০ কোটি টাকা কৃষি, অ্যাগ্রো-প্রসেসিং, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও শিক্ষা খাতের উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তারা মনে করেন, এসব খাতে স্টার্টআপে সহায়তা দিলে কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। প্রণোদনা প্যাকেজের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সরকারের আরও বাস্তবমুখী ও প্রজ্ঞাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা প্রয়োজন। তহবিল বিতরণের ক্ষেত্রে এমন খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেখানে অধিক সম্ভাবনা, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে ইতিবাচক ফল অর্জনের সুযোগ রয়েছে। অন্যথায়, এই প্যাকেজ থেকে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা।
তারা আরও বলেন, অতীতে যেমন অভিযোগ দেখা গেছে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা করে তহবিল বিতরণ করা উচিত হবে না। এ ধরনের চর্চা অব্যাহত থাকলে প্রণোদনা প্যাকেজটির কার্যকারিতা নষ্ট হবে এবং এর মাধ্যমে কোনো অর্থবহ সুফল অর্জন করা সম্ভব হবে না।
বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর, ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্টার্টআপ খাতের জন্য বরাদ্দ ৫০০ কোটি টাকার তহবিল প্রসঙ্গে মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, এই অর্থ যেন কেবল আগে থেকেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় না দেওয়া হয়। বরং নতুন, উদ্ভাবনী ও সম্ভাবনাময় স্টার্টআপগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সহায়তা করা প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, সরকারকে এমন খাতগুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে যেখানে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও বাজার চাহিদা বেশি। বিশেষ করে অ্যাগ্রিটেক, হেলথটেক, এডুটেক, ফিনটেক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ব্লকচেইন এবং ডেটা অ্যানালিটিক্সভিত্তিক উদ্যোগগুলো দেশে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন
৪৩ পণ্য ও সেবা রপ্তানিতে প্রণোদনার মেয়াদ জুন পর্যন্ত বাড়লো
নীতিসহায়তা ও প্রণোদনা পাবে পেপার প্যাকেজিং শিল্প
নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ কর থাকা উচিত নয়
প্যাকেজিং পণ্য রপ্তানিতে বৈষম্য: নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনার দাবি
সৈয়দ আলমাস কবীর আরও বলেন, দেশে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এখন বড় একটি চ্যালেঞ্জ। নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কাজের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তাই প্রণোদনা প্যাকেজের একটি অংশ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও আপস্কিলিং কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
তার মতে, শুধু অর্থায়ন করলেই স্টার্টআপ সফল হবে না। অর্থ সহায়তার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, পরামর্শ, মেন্টরশিপ এবং নিয়মিত গাইডলাইনের মাধ্যমে অন্তত এক থেকে দুই বছর ‘হ্যান্ডহোল্ডিং’ সহায়তা দিতে হবে। এতে স্টার্টআপগুলোর টিকে থাকা ও সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
তিনি বলেন, সরকার যদি সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পিতভাবে তহবিল বিতরণ, তদারকি ও সহায়তা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এই প্রণোদনা প্যাকেজ দেশের অর্থনীতিতে কার্যকর অবদান রাখবে এবং টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
অন্যদিকে, বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যাবহারের প্রতি নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অন্যরা।
বিডিজবসের সিইও এ কে এম ফাহিম মাসরুর, ছবি: সংগৃহীত
বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে এম ফাহিম মাসরুর বলেন, স্টার্টআপের জন্য বরাদ্দকৃত ফান্ডকে আমি মূলত তিনটি খাতে বেশি ফোকাস করতে দেখার পক্ষে— অ্যাগ্রিটেক, রিনিউয়েবল এনার্জি এবং এডুটেক। কারণ আগামী দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি।
অ্যাগ্রিটেক ও অ্যাগ্রো-প্রসেসিং স্টার্টআপগুলো কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, সাপ্লাই চেইন উন্নত করতে এবং খাদ্য অপচয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে সোলার, বায়োগ্যাস বা অন্যান্য রিনিউয়েবল এনার্জি নিয়ে কাজ করা স্টার্টআপগুলো ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হবে। অন্যদিকে এডুটেক খাত বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তুলতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, বলে মন্তব্য করেন ফাহিম, যিনি বেসিসের সভাপতি ছিলেন।
তিনি বলেন, শুধু ফান্ড ঘোষণা করলেই হবে না, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন। এই ফান্ড রাজনৈতিক প্রভাব বা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যবসার বাস্তব সম্ভাবনা, ক্যাশ ফ্লো, টিমের সক্ষমতা এবং মার্কেট ভ্যালিডেশনের ভিত্তিতে বিতরণ করা উচিত। আমার মতে, যেসব স্টার্টআপ ইতোমধ্যে কিছু গ্রাহক তৈরি করেছে, আয় শুরু করেছে এবং মূলত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা স্কেল-আপ ফান্ডিং প্রয়োজন—তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঋণ বিতরণ বেসরকারি ব্যাংক বা পেশাদার ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে হওয়া উচিত, যাতে কমার্শিয়াল ডিসিপ্লিন বজায় থাকে। সরকারি প্রভাবমুক্ত, ডেটা-ড্রিভেন এবং পারফরম্যান্স-ভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে পারলেই এই ৫০০ কোটি টাকার ফান্ড বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে, বলে মনে করেন ফাহিম মাসরুর।

বাংলাদেশের স্টার্টআপ প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত গত এক দশকে দ্রুত উত্থান, সম্প্রসারণ এবং পরে কিছুটা ধীরগতির মধ্য দিয়ে গেছে। ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল ছিল সবচেয়ে গতিশীল সময়, যখন ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে ই-কমার্স, ফিনটেক, লজিস্টিকস ও রাইড-শেয়ারিং খাতে নতুন স্টার্টআপ গড়ে ওঠে এবং এই সময়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করে।
গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখন পর্যন্ত কেবল একটি ইউনিকর্ন স্টার্টআপ তৈরি হয়েছে—বিকাশ, যা দেশের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস খাতে সবচেয়ে বড় সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশের শীর্ষ ডিজিটাল স্টার্টআপগুলোর মধ্যে অন্যতম, যারা যথাক্রমে রাইড-শেয়ারিং ও ডেলিভারি, এসএমই সাপোর্ট, অনলাইন গ্রোসারি এবং অন-ডিমান্ড লজিস্টিকস সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কোভিড-১৯ সময়ে অনলাইন সেবার চাহিদা দ্রুত বেড়ে খাতটি আরও প্রসারিত হয়। তবে ২০২২ সালের পর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও বিনিয়োগ সংকোচনের কারণে প্রবৃদ্ধি কমে আসে এবং অনেক স্টার্টআপ টিকে থাকার চ্যালেঞ্জে পড়ে।
আইএইচও/এমএমএআর

