কারাগার ও ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নিয়মতান্ত্রিক যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করেছে জাতিসংঘ। শুক্রবার (২৯ মে) প্রকাশিত জাতিসংঘের ‘সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা’ সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে জাতিসংঘ তাদের এই অবস্থানে অনড় রয়েছে এবং ইসরায়েলের তোলা সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
যৌন নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্র
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অন্তত ১৪ জন পুরুষ, সাতজন নারী, নয়জন ছেলে এবং একজন মেয়ের ওপর সরাসরি যৌন সহিংসতার প্রমাণ মিলেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীরাও রয়েছেন।
আরও পড়ুন>>
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফ্লোটিলার কর্মীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
শিশুদের যৌন নির্যাতন করায় নেতানিয়াহুর সাবেক নিরাপত্তা প্রধান আটক
নেতানিয়াহুর দিন কি ফুরিয়ে আসছে?
নির্যাতনের ধরণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্দিদের ওপর ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং বিভিন্ন বস্তু ব্যবহার করে বিকৃত উপায়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। পুরুষ ও শিশুদের যৌনাঙ্গে আঘাত এবং গুরুতর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, যার ফলে অন্তত পাঁচজন পুরুষ দীর্ঘ মেয়াদে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে ভুগেছেন।
কোনো নিরাপত্তামূলক কারণ ছাড়াই ফিলিস্তিনি নারীদের জোরপূর্বক নগ্ন করা, আপত্তিকরভাবে শরীর তল্লাশি এবং ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা ভিডিও বা ছবি তুলে রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নয়জন ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তাদের বেশিরভাগই গাজার ফিলিস্তিনি। অভিযুক্তদের মধ্যে ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নাম রয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, এসব যৌন নির্যাতনের ঘটনা মূলত আটক, জিজ্ঞাসাবাদ, সামরিক শিবির, তল্লাশি চৌকি এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সামরিক অভিযানের সময় সংঘটিত হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি প্রমিলা প্যাটেন এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। তবে আমাদের প্রতিবেদনে যা এসেছে, তা প্রকৃত অপরাধের মাত্র হিমশৈলের চূড়ামাত্র। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলেই এই অপরাধ করতে তারা আরও সাহসী হচ্ছে।’
তদন্তে বাধা ও ইসরায়েলের অস্বীকৃতি
গত বছরের আগস্টেই জাতিসংঘ ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে ফিলিস্তিনিদের ওপর যৌন নির্যাতনের ‘অকাট্য তথ্য’ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল। তবে ইসরায়েল জাতিসংঘের পরিদর্শকদের সেসব কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়নি।
ইসরায়েলের জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দাবি করেন, ‘আমরা জাতিসংঘকে তদন্তের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, তারা আসেনি।’
তবে এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করে প্রমিলা প্যাটেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ইসরায়েল সরকারের কাছে জবাবদিহিতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বিশদ জানতে চেয়ে একাধিকবার লিখিত অনুরোধ করেছি, কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি।’ তিনি আরও জানান, ইসরায়েলের আমন্ত্রণের পর পরিদর্শনের পরিধি ও সহযোগিতা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিমত তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরু হলে সফরটি পুরোপুরি স্থগিত হয়ে যায়।
তালিকায় রাশিয়াসহ ৭৭ পক্ষ
জাতিসংঘের এই কালো তালিকায় ইসরায়েলের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর যৌন সহিংসতার দায়ে রাশিয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া কঙ্গোর তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠীসহ মোট ৭৭টি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রবহির্ভূত পক্ষ রয়েছে এই তালিকায়।
এই তালিকায় নাম ওঠার ফলে সরাসরি কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা না আসলেও, সংশ্লিষ্ট দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। এছাড়া তালিকায় থাকা দেশগুলো জাতিসংঘের কোনো শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য পাঠানোর যোগ্যতা হারায়।
সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/

