Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img
Homeআইনের জায়গায় বেআইনি ধোঁয়া, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

আইনের জায়গায় বেআইনি ধোঁয়া, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আইন ভাঙার শাস্তি যেখানে নির্ধারিত হয়, সেই আদালত প্রাঙ্গণেই প্রতিদিন প্রকাশ্যে ভঙ্গ করা হচ্ছে দেশের প্রচলিত আইন। পুরান ঢাকার ব্যস্ততম আদালত চত্বরে প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে তামাক পণ্যের প্রকাশ্য কেনাবেচা ও ধূমপান।

আজ রোববার (৩১ মে) ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’। দিবসটি ঘিরে ঢাকার আদালত চত্বরের এই উদ্বেগজনক চিত্র জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, আদালত চত্বরের ভেতরেই অন্তত ১০টি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিত তামাকজাত পণ্য বিক্রি হচ্ছে এবং শত শত মানুষ সেখানে প্রকাশ্যে ধূমপান করছেন। প্রতিবেদনটি প্রস্তুতের সময়, নয় মাস ধরে একই স্থানগুলোতে নিয়মিত অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের বেচাকেনা করতে দেখা গেছে।

আদালত-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, বছরের পর বছর ধরেই এসব বিক্রেতা একইভাবে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে তামাক পণ্য বিক্রি করে আসছেন।

তামাক আইনে যা আছে

বাংলাদেশের ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ অনুযায়ী পাবলিক প্লেস ও কর্মক্ষেত্রে ধূমপান এবং তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার ও বিক্রির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সংশোধিত আইনটি ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের মাধ্যমে কার্যকর হয়।

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী, যেকোনো পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আদালত প্রাঙ্গণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, গ্রন্থাগারসহ সব ধরনের কর্মক্ষেত্র এখন ‘পাবলিক প্লেস’-এর আওতাভুক্ত। ফলে আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে ধূমপান করা সরাসরি আইনের লঙ্ঘন।

আইনের জায়গায় বেআইনি ধোঁয়া, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্যঢাকার আদালত চত্বর, ছবি: জাগো নিউজ

সংশোধিত আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি পাবলিক প্লেস বা পাবলিক পরিবহনে ধূমপান করলে তাকে অনধিক দুই হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। একই ব্যক্তি পুনরায় একই অপরাধ করলে জরিমানার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে দ্বিগুণ হবে। আগের আইনে জরিমানার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিল।

নতুন আইনের ধারা ১০ক অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান ও শিশুদের বিনোদন কেন্দ্রের সীমানার ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বা ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম; যেমন ই-সিগারেট বিক্রি করা নিষিদ্ধ। আগে এই দূরত্ব ১০০ গজ হিসেবে উল্লেখ থাকলেও সংশোধিত আইনে তা ১০০ মিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

আইনের ধারা ১০গ অনুযায়ী, লাইসেন্স বা নিবন্ধন ছাড়া তামাকজাত পণ্য বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনো ব্যক্তি এই ধারা লঙ্ঘন করলে তাকে অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। একই অপরাধ পুনরায় করলে জরিমানার পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। ফলে আদালত চত্বরে ভ্রাম্যমাণ বা অনুমোদনহীন তামাক বিক্রিও আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

নতুন সংশোধিত আইনে ই-সিগারেট, ভেপিং ডিভাইস, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টসহ আধুনিক তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, বিজ্ঞাপন, প্রচার ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে এসব পণ্য ব্যবহার করলেও ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

আদালত চত্বরে ধূমপানপ্রকাশ্য স্থানে ধূমপান নিষিদ্ধ হলেও ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে তা মানা হচ্ছে না, ছবি: জাগো নিউজ

আদালত চত্বরে তামাক পণ্যের ‘ওপেন মার্কেট’

পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় তামাক আইন লঙ্ঘনের করুণ চিত্র দেখা গেছে। ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম), ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত চত্বরে অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের প্রকাশ্যে তামাকপণ্য বেচাকেনা করতে দেখা গেছে। যতক্ষণ আদালতের কার্যক্রম চলে, তাদের দোকানও খোলা থাকে।

ঢাকা সিএমএম আদালতের চতুর্থ ও পঞ্চম তলার সংযোগ সেতুতে নিয়মিত দুজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাকে সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে। এছাড়া এই আদালতের হাজতখানার আশপাশে আরও দুজন বিক্রেতা মাটিতে বসেই প্রকাশ্যে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভ্রাম্যমাণভাবে আদালত ভবন এবং নিচে আদালতে বিভিন্ন কাজে আসা মানুষদের কাছেও তামাকপণ্য বিক্রি করছিলেন বেশ কয়েকজন।

ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে অন্তত তিনটি স্থানে তামাক পণ্য বিক্রি হচ্ছে। প্রধান ফটকের পাশে জায়গা দখল করে বসেছেন দুজন চা-সিগারেট বিক্রেতা। অন্য একজন বিক্রেতাকে ভবনের সিঁড়ির সামনে বসে ব্যবসা করতে দেখা গেছে।

ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পেছনের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে স্থায়ীভাবে একজন বিক্রেতা সিগারেট বিক্রি করছেন।

আরও পড়ুন
নারী-পুরুষ সবার জন্যই প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ
ধূমপান কি সত্যিই পুরুষের বন্ধ্যাত্ব ডেকে আনে?
ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে সিগারেটের মূল্যস্তর কমানোর দাবি
ধূমপানের কারণে হার্ট হয়ে যায় মোটা ও দুর্বল, বলছে গবেষণা

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনে থাকা ক্যান্টিনের পাশেও দুজন বিক্রেতাকে তামাকজাত পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে। যাদের অধিকাংশ ব্যক্তিই দীর্ঘদিন এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

‘আইনের জায়গায় এসেও ধোঁয়ার যন্ত্রণা’

আদালত প্রাঙ্গণে আসা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইনজীবীরা এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

জমিসংক্রান্ত মামলার কাজে নিয়মিত আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী মোসাম্মৎ ফরিদা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই ভিড়ের মধ্যে চারপাশ থেকে যখন সিগারেটের ধোঁয়া আসে, তখন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আমি নিজে অ্যাজমার রোগী। আইনের জায়গায় এসে যদি এভাবে বেআইনি ধোঁয়ায় আমাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে হয়, তবে আমরা সাধারণ মানুষ যাবো কোথায়?’

ঢাকা আইনজীবী সমিতির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ কে এম মাহফুজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আদালত একটি অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান। বারান্দা, সিঁড়ি কিংবা লিংক রোডে যেভাবে প্রকাশ্যে ধূমপান হচ্ছে, তাতে আদালতের ভাবগাম্ভীর্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের এখনই কঠোর হওয়া উচিত।’

আইনের জায়গায় বেআইনি ধোঁয়া, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্যএক হকার আরেক হকারের কাছ থেকে সিগারেট কিনে সেখানেই ধূমপান করছেন। ঢাকা সিএমএম কোর্টের চতুর্থ তলার লিংক ব্রিজে, ছবি: জাগো নিউজ

সাক্ষী হিসেবে আদালতে আসা একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সিএমএম কোর্টের পঞ্চম তলার লিংক ব্রিজে গিয়ে অবাক হয়েছি। সেখানে প্রকাশ্যে সিগারেট বিক্রি হচ্ছে এবং মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ধূমপান করছে। পুলিশ পাশ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। এটা ওপেন ভায়োলেশন।’

মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট নুসরাত জাহান রিমি জাগো নিউজকে বলেন, ‘নারীদের জন্য এই পরিবেশ আরও বেশি দমবন্ধকর। কোর্ট চত্বরে নারীদের বসার জায়গা এমনিতেই কম, তার ওপর যেখানেই দাঁড়ানো হয় সেখানেই সিগারেটের ধোঁয়া। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে এখানে আসা নারী ও শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। এটা মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন।’

আদালতের পেশকার মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘সারাদিন কাজের চাপের মধ্যে যদি বারান্দায় বের হয়েও সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করতে হয়, তাহলে কাজ করার মানসিকতা থাকে না। যারা আদালতের ভেতরে এসব দোকান বসাতে দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

আরও পড়ুন
ধূমপানের পর নামাজ আদায় করলে কি তা কবুল হবে?
সিগারেট খেলে নারীর শরীরের যে অংশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়
তামাকে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি ৮৭ হাজার কোটি টাকা
সিগারেট খাওয়া কি হারাম?

‘উচ্ছেদ করলেও আবার বসে পড়ে’

আদালতে নিরাপত্তায় নিয়োজিত এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাজতখানার আশপাশে বা কোর্টের ভেতরে এত মানুষের ভিড় থাকে যে, কে কখন সিগারেট খাচ্ছে তা সবসময় খেয়াল করা সম্ভব হয় না। তবে ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো উচ্ছেদ করা দরকার। উচ্ছেদের কিছুদিন পর তারা আবার বসে পড়ে।’

পরোক্ষ ধূমপানে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

চিকিৎসকদের মতে, প্রকাশ্য ধূমপানের কারণে বাতাসে নিকোটিনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ে। আদালতপাড়ার মতো ঘিঞ্জি এলাকায় বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এই ধোঁয়া দীর্ঘসময় আটকে থাকে। ফলে সেখানে আসা হাজারো মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন, যা ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ফেলে দেওয়া সিগারেটের ফিল্টার ও অবশিষ্টাংশ আদালত প্রাঙ্গণের পরিবেশও দূষিত করছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, আদালত চত্বরের সামনেই অবস্থিত ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। প্রতিদিন সেখানে চিকিৎসা নিতে আসেন শত শত রোগী ও স্বজন। পাশাপাশি নিয়মিত যাতায়াত করেন মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে ধূমপানের কারণে হাসপাতালমুখী রোগী, শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনের জায়গায় বেআইনি ধোঁয়া, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্যপুরান ঢাকার আদালত চত্বরে সিগারেটের দোকান। প্রকাশ্যে চলছে ধূমপান, ছবি: জাগো নিউজ

এছাড়া আদালত চত্বরের পেছনেই রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ। আশপাশে আরও অন্তত ১০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে আদালতপাড়ায় অনিয়ন্ত্রিত তামাক বিক্রি ও ধূমপানের প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ওপরও।

ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মো. রাশেদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরোক্ষ ধূমপানও সরাসরি ধূমপানের মতোই ক্ষতিকর। আদালতপাড়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ধোঁয়া দীর্ঘসময় বাতাসে থেকে যায়। এতে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টের রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। বিশেষ করে হাসপাতালের সামনে এমন পরিবেশ জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সায়মা রহমান বলেন, ‘আদালতপাড়ার আশপাশে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় তরুণদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিক্ষার্থীদের সামনে প্রকাশ্যে ধূমপান ও তামাক বিক্রি একটি খারাপ সামাজিক বার্তা দেয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হয়ে পুরো এলাকাকে কার্যকরভাবে ধূমপানমুক্ত করতে হবে।’

আরও পড়ুন
ধূমপান যেভাবে নষ্ট করে আপনার হার্ট
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণসহ সংসদে ৮ বিল পাস
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে সিগারেট বিক্রি করলে ৫০০০ টাকা জরিমানা
ঢাবির হলে ধূমপানে জরিমানা, মাদক সেবনে বহিষ্কার

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসে প্রত্যাশা

আজ ৩১ মে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য হলো  ‘আকর্ষণের মুখোশ উন্মোচন: নিকোটিন ও তামাক আসক্তি মোকাবেলা’। 

দেশের বিচার ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে যেখানে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে সমাজকে আইন মানার বার্তা দেওয়া হয়, সেই আদালত প্রাঙ্গণেই আইনের এমন প্রকাশ্য লঙ্ঘন কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ঘিরে সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীদের দাবি, আদালত চত্বরের ভেতরে থাকা তামাকজাত পণ্যের দোকানগুলো দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে এবং পুরো আদালতপাড়াকে কার্যকরভাবে ‘ধূমপানমুক্ত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

আইনের জায়গায় বেআইনি ধোঁয়া, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্যপুরান ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে বিক্রি হচ্ছে সিগারেট, ছবি: জাগো নিউজ

মাদকবিরোধী সংগঠন ‘প্রত্যাশা’র সাধারণ সম্পাদক হেলাল আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, আদালতপাড়াকে বর্তমানে শতভাগ ধূমপানমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে সেই আইন কার্যকর হচ্ছে না। অনেক সিনিয়র আইনজীবী ও আইনজীবীদের সহকারীকেও আদালত প্রাঙ্গণে ধূমপান করতে দেখা যায়, যা নতুন আইন বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হেলাল আহমেদ বলেন, আদালতপাড়ার বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট পানের দোকান ও টং দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকানে নিয়মবহির্ভূতভাবে সিগারেট বিক্রি করা হচ্ছে। হাতের নাগালেই সিগারেট পাওয়া যাওয়ায় মানুষ সহজেই ধূমপানে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

হেলাল আহমেদ আরও বলেন, ঢাকা জেলা প্রশাসনে একটি টাস্কফোর্স কমিটি রয়েছে, যেখানে আইনজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত আছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিন মাস পরপর এই কমিটির সভা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক সময় মাত্র পাঁচ মিনিটের সভা করেই বিভিন্ন অজুহাতে তা শেষ করে দেওয়া হয়।

তিনি আদালতপাড়াকে পুরোপুরি ধূমপানমুক্ত করতে জেলা টাস্কফোর্স কমিটিকে কার্যকরভাবে সক্রিয় করার সুপারিশ করেন। তার মতে, কমিটি যথাযথভাবে কাজ করলে আদালত প্রাঙ্গণকে ধূমপানমুক্ত করার লক্ষ্য অর্জনে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হবে।

আইনের জায়গায় বেআইনি ধোঁয়া, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্যপুরান ঢাকার আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে চলছে ধূমপান, ছবি: জাগো নিউজ

পুলিশের সরাসরি জরিমানা করার ক্ষমতা নেই

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের জানা মতে প্রতিদিন আদালতপাড়ায় প্রায় ৩০ হাজার আইনজীবী কাজ করেন। তাদের সহযোগী রয়েছেন আরও প্রায় ২০ হাজার। এছাড়া বিচারপ্রার্থী ও বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ মানুষ আদালত এলাকায় আসেন। ধূমপান নিয়ন্ত্রণে নিজেদের অবস্থান থেকে মানুষকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কেউ প্রকাশ্যে ধূমপান করলে তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয়। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে এ বিষয়ে আরও সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে আদালত প্রাঙ্গণসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে এখনো শতভাগ সফলতা অর্জিত হয়নি।’

আশিস বিন হাছান বলেন, ধূমপান একটি ‘পাবলিক নুইসেন্স’ বা জনউপদ্রব। এটি অধূমপায়ীদের জন্যও ক্ষতিকর। এ কারণে পুলিশ সদস্যদের জন্য ধূমপান কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়।

তিনি আরও বলেন, সংশোধিত তামাক আইনে দুই হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও পুলিশের সরাসরি জরিমানা করার ক্ষমতা নেই। এ ধরনের জরিমানা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণ পুরোপুরি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অধীন। এছাড়া মহানগর এলাকায় নিয়োজিত বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটরা যানবাহন বা অন্যান্য জনউপদ্রবের ঘটনায় তাৎক্ষণিক জরিমানা করার ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
সিগারেটের দাম বাড়ায় ৩৭ শতাংশ তরুণ ধূমপায়ী ধূমপান কমিয়েছেন
ধূমপানের প্রবণতা কমেছে গণপরিবহনে: গবেষণা
‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলনের এসআই শফিক পুরস্কৃত
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকজাত দ্রব্যে কর বাড়ানোর প্রস্তাব

উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের আচরণগত পরিবর্তন ও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। আইনগত ব্যবস্থা ও সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে কাজ করলেই আদালত প্রাঙ্গণসহ জনসমাগমস্থলগুলোকে আরও ধূমপানমুক্ত করা সম্ভব হবে।

আদালত প্রাঙ্গণে ধূমপান নিয়ন্ত্রণ, তামাকবিরোধী আইন বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ নিয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটরের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমডিএএ/এমএমএআর