Become a member

Get the best offers and updates relating to Liberty Case News.

― Advertisement ―

spot_img

রাশিয়ার হামলায় একদিনেই ১৩২০ ইউক্রেনীয় সেনা নিহত

ইউক্রেনে চলমান বিশেষ সামরিক অভিযান এলাকায় রুশ বাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপের অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৩২০ জন ইউক্রেনীয় সেনাসদস্য নিহত বা হতাহত হয়েছে। শনিবার (৩০...
Homeরাশিয়ার সেনাবাহিনীতে ভয় ছড়াচ্ছে ইউক্রেনের ‘কিলার রোবট’

রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে ভয় ছড়াচ্ছে ইউক্রেনের ‘কিলার রোবট’

পূর্ব ইউক্রেনের একটি গোপন ভূগর্ভস্থ বাংকার। চারদিকে কম্পিউটারের প্রসেসর ফ্যানের মৃদু গুঞ্জন আর কমলা আলোর আভা। সেখানে গেমারদের মতো আরামদায়ক চেয়ারে বসে রয়েছেন ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর কয়েকজন কমান্ডার। তাদের চোখ সামনের মনিটরে। ড্রোন থেকে আসা লাইভস্ট্রিমে দেখা যাচ্ছে মাইল দূরে যুদ্ধক্ষেত্রের লাইভ দৃশ্য। একটি বোতাম চাপতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল মাশরুম মেঘের মতো সাদা ধোঁয়া—খতম হলো রুশ ঘাঁটি।

ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যোগ হয়েছে এক নতুন সমীকরণ। যেখানে ইউক্রেনীয় সেনাদের সশরীরে যুদ্ধক্ষেত্রে না গিয়েই নিখুঁতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে রুশ লক্ষ্যবস্তু। সেনা সংকট এবং মার্কিন সহায়তার অনিশ্চয়তার মুখে ইউক্রেন এখন ব্যাপকভাবে ঝুঁকছে প্রযুক্তির দিকে। দেশটির যুদ্ধ কৌশলের বড় অংশ এখন দখল করে নিয়েছে চালকবিহীন রোবট, ড্রোন এবং দূরনিয়ন্ত্রিত ট্যাংক।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি দাবি করেছেন, সম্পূর্ণ রোবট এবং ড্রোনের সহায়তায় তারা প্রথম একটি রুশ ঘাঁটি দখল করতে সক্ষম হয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ইউক্রেনীয় বাহিনী অন্তত ২২ হাজার রোবটিক মিশন পরিচালনা করেছে।

রুশ সেনাদের কাছে ‘নীরব মৃত্যু’, ইউক্রেনীয়দের কাছে জীবন

ইউক্রেনীয় বাহিনীর এই চার চাকার রিমোট-কন্ট্রোল রোবটগুলো মূলত একেকটি চলন্ত বোমা। এগুলো প্রচুর পরিমাণে বিস্ফোরক নিয়ে রুশ বাংকারের দিকে এগিয়ে যায়। ধৃত রুশ যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনী জানতে পেরেছে, রুশ সেনারা এই রোবটগুলোকে ‘সাইলেন্ট ডেথ’ বা ‘নীরব মৃত্যু’ নামে ডাকছে।

আরও পড়ুন>>
সস্তা ড্রোনে বদলে যাচ্ছে আকাশযুদ্ধ, চ্যালেঞ্জের মুখে ব্যয়বহুল অস্ত্র
যুক্তরাজ্যে ড্রোন কারখানা চালু করেছে ইউক্রেনীয় কোম্পানি
ইউক্রেনকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ ঘোষণা ইরানের, হামলার হুমকি

কারণ, এই রোবটগুলো এতই নিঃশব্দে এগিয়ে যায় যে মাত্র ১০ মিটার দূরত্বের মধ্যে আসার আগে এগুলোকে দেখাও যায় না, শোনাও যায় না। আর যখন রুশ সেনারা টের পায়, ততক্ষণে তারা রোবটের বিস্ফোরণের ব্যাসার্ধের (ব্লাস্ট ব্যাসার্ধ) মধ্যে চলে আসে।

ইউক্রেনের থার্ড অ্যাসাল্ট ব্রিগেডের ‘এনসি১৩’ ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৬৪টি অভিযানে রোবট ব্যবহার করায় তাদের প্রায় ২ হাজার ৩০০ সেনার কাজ একা এই রোবটগুলোই করে দিয়েছে। সাধারণ যুদ্ধ হলে এসব অভিযানে তাদের অন্তত অর্ধেক সেনা নিহত বা আহত হতো। অর্থাৎ, প্রযুক্তির এই ছোঁয়া অন্তত এক হাজার ইউক্রেনীয় সেনার প্রাণ বাঁচিয়েছে।

‘পেশিবহুল’ লড়াইয়ের দিন শেষ

কমান্ডার মাইকোলা ‘মাকার’ জিনকেভিচ বলেন, ডনবাসের সেই পুরনো ও নৃশংস সম্মুখ যুদ্ধ এখন বদলে গেছে। তিনি কিছুটা আক্ষেপের সুরেই বলেন, আগে যুদ্ধ ছিল অনেক বেশি পেশিবহুল বা পুরুষোচিত। সেখানে আপনার ব্যক্তিগত দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং শৃঙ্খলা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন সবকিছু প্রযুক্তি নির্ধারণ করে। এখান থেকে আর পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। এখন লড়াইটা হচ্ছে কে কার চেয়ে দ্রুত প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।’

এই নতুন যুদ্ধের নেপথ্যের কারিগর ২১ বছর বয়সী তরুণী ‘গোরা’। তিনি নিজেকে একজন হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। যুদ্ধের শুরুতে মাত্র ১৮ বছর বয়স ছিল তার। রুশ ড্রোনের শব্দে যখন কিয়েভের ঘুম হারাম হতো, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার আইটি জ্ঞানই হতে পারে আগামীর ফ্রন্টলাইন। গোরা বলেন, ‘আসল চাবিকাঠি যানগুলো নয়, আসল হলো মানুষের মস্তিষ্ক এবং তারা কীভাবে এর যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।’

ক্লান্তিহীন ‘ব্রাউনিং’ দানব

ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন রোবটকে কেবল বোমা হিসেবেই নয়, সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে রাইফেল ও ভারী মেশিনগান চালক হিসেবেও ব্যবহার করছে। ইউক্রেনীয় এক সেনা সদস্য জানান, তারা ট্র্যাক্টরের মতো চেইনের ওপর বিশাল ব্রাউনিং ভারী মেশিনগান মাউন্ট করে রোবট তৈরি করেছেন। এতে চারদিকে ক্যামেরা লাগানো আছে।

এই রোবট মেশিনগান নিয়ে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিনের পর দিন লুকিয়ে থাকতে পারে। এর কোনো খাবার বা পানির প্রয়োজন হয় না, পায়ে কামড় ধরে না। কেবল ৪০০ রাউন্ড গুলি শেষ হলে একে ঘাঁটিতে ফিরিয়ে এনে নতুন গুলি লোড করতে হয়। এই রোবট যখন প্রথম রুশ সেনাদের সামনে মোতায়েন করা হয়, তারা পুরোপুরি আতঙ্কিত হয়ে মাটিতে হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছিল। তারা বুঝতেই পারছিল না কী করবে।

এমনকি ফ্রন্টলাইনে আহত সেনাদের উদ্ধার করতে এবং দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে দুর্গম বাংকারে সেনাদের কাছে খাবার, পানি ও গোলাবারুদ পৌঁছে দিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে এই রোবট।

ইউক্রেনের তীব্র সেনা সংকট

প্রযুক্তির এই জয়জয়কারের পেছনে রয়েছে ইউক্রেনের তীব্র সেনা সংকট। দীর্ঘ চার বছরের রুশ আগ্রাসনে ইউক্রেনের তরুণ ও সামরিক বয়সী পুরুষদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের দুই সেনা ‘ক্রো’ এবং ‘ক্রিপি’। তারা যথাক্রমে ৩৪৪ দিন এবং ৩৩৪ দিন ধরে বিরতিহীনভাবে ফ্রন্টলাইনের মাটির নিচের বাংকারে জীবন কাটিয়েছেন। ক্রিপি জানান, রুশ ড্রোন হামলা এত ভয়াবহ ছিল যে মাটি দিয়ে বালুর বস্তা ভরাট করে নিজেদের আড়াল করার মতো সময়ও তাঁরা পেতেন না। যা হাতে পেতেন, তা দিয়েই নিজেদের ঢেকে রাখতেন যাতে বেঁচে থাকা যায়।

দীর্ঘ এক বছর পর বাংকার থেকে আলোতে ফেরা এই দুই সেনা যখন জীবনের প্রথম কোল্ড ড্রিংকসে চুমুক দিচ্ছিলেন, তখনই ইউক্রেনের ক্রামাতোরস্ক শহরের আকাশে আরেকটি ড্রোনের শব্দ শোনা গেল। মুহূর্তেই সাধারণ মানুষ দিগ্বিদিক ছুটে পালালেন। এই দৃশ্যই প্রমাণ করে, রোবট আর ড্রোন কীভাবে এই যুদ্ধের পুরো সংজ্ঞাটাই বদলে দিয়েছে।

সূত্র: সিএনএন
কেএএ/