ঈদুল আজহা মুসলিমদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। একে কোরবানির ঈদও বলা হয়ে থাকে। প্রতিবছর আরবি বর্ষপঞ্চির জিলহজ মাসের ১০ তারিখে কোরবানির ঈদ উদযাপন করা হয়। এ সময় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশ পশু কোরবানি করে থাকেন।
ঈদের দিন ফজরের নামাজের পর ঈদগাহে গিয়ে জামায়াতে নামাজ পড়া শেষে নিজ নিজ আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কিছু প্রাণী কোরবানি দেন তারা।
তবে দেশ ও সংস্কৃতিভেদে এই উৎসবে কিছুটা ভিন্নতা আছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন কারণে পৃথিবীর একেক দেশে একেক ধরনের পশু কোরবানি দেওয়ার রেওয়াজও রয়েছে। যেমন, বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলের মুসলিমরা কোরবানিতে গরু কিংবা ছাগলকে প্রাধান্য দেন। আবার কোথাও কোথাও ভেড়া, মহিষ কিংবা উটই হয়ে ওঠে প্রিয় কোরবানিযোগ্য পশু।
আরও পড়ুন>>
ঈদের সময় কোন দেশে কত পশু কোরবানি হয়?
এবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’
এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, এমনকি ইউরোপের কিছু মুসলিমপ্রধান বা প্রচুর মুসলিম জনসংখ্যা থাকা দেশের পশু কোরবানির রীতিনীতি ও পশুর পছন্দ সম্বন্ধে নিচে আলোচনা করা হলো:
মধ্যপ্রাচ্য
সারা বিশ্বের মোট মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশই থাকে মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানকার মুসলিমপ্রধান দেশের কথা বললে সৌদি আরবের কথা সবার আগে উল্লেখ করতে হয়। কারণ, ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মৌলিক ভিত্তির একটি হলো হজ, যা মূলত মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় জমায়েত। আর সেই হজ পালন করার জন্য মুসলিমদের সৌদি আরবে যেতে হয়।
এ কারণেই বিশ্বের লাখ লাখ মুসলিম নারী-পুরুষ প্রতিবছর হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে সমবেত হন। হজের শেষ দিনে কোরবানি দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় সৌদি আরবেই কোরবানি দেওয়ার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রাণী হিসেবে উট বেশি পরিচিত হলেও দেশটিতে দুম্বা, ভেড়া, গরু এবং ছাগলও কোরবানি দেওয়া হয়। তবে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হজের সময় সৌদি আরবে উট ও গরুর দাম বেড়ে যায়। আবার বছরের অন্য সময় এগুলোর দাম অন্তত কয়েকগুণ কম থাকে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতেও দৃশ্যপট অনেকটা একই। দেশটিতে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা গরু এবং ছাগল বেশি প্রাধান্য পায়। কিছু অভিজাত পরিবার উট কোরবানি দিয়ে থাকেন, তবে তা সংখ্যায় বেশ কম। কোরবানি দেওয়ার জন্য বরাদ্দ থাকা নির্দিষ্ট জায়গায় বেশিরভাগ কোরবানি করা হয়। তবে কেউ চাইলে নিজস্ব জায়গার মধ্যেও কোরবানি দিতে পারেন।
পাকিস্তান
সংখ্যার দিক থেকে ২৪ কোটি মুসলিম বসবাস করেন পাকিস্তানে। জনসংখ্যাবিষয়ক অনলাইন ডেটাবেজ ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’ (ডব্লিউপিআর)-এর তথ্য বলছে, দেশটির মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯৮ ভাগের বেশি মুসলিম।
কোরবানির সময় দেশটিতে গরু এবং ছাগলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সৌদি আরবভিত্তিক সংবাদপত্র আরব নিউজ পাকিস্তান ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের বরাতে এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ২০২৩ সালে দেশটিতে ৬০ লাখের বেশি পশু কোরবানি করা হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ছাগল, তারপরই গরু। এর বাইরে কেউ কেউ মহিষ, দুম্বা, ভেড়া এবং উটও কোরবানি দেন, তবে সংখ্যার দিক থেকে তা নগণ্য। আর দুম্বার মাংস চর্বিযুক্ত হওয়ায় এটি কোরবানি দেওয়ার প্রচলন শীতপ্রধান অঞ্চলগুলোতেই বেশি। তবে কোরবানির পশু নির্বাচনে কালো মাথার ভেড়া দেশটির কিছু কিছু অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়।
কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ করা হয়। তবে ঐতিহ্যগত পদ্ধতি অনুযায়ী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ির সামনে রাস্তার ওপরেই ইসলামী পদ্ধতি মেনে কোরবানি দেওয়া হয়।
ভারত
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতে মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যালঘু হলেও ডব্লিউপিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ১৪ শতাংশ অর্থাৎ ২০ কোটি মানুষ মুসলিম। কিন্তু বিশাল আয়তনের এই দেশে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। কারণ, ভারতের সিংহভাগ মানুষ হিন্দু এবং হিন্দুধর্মে গোহত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এ কারণে ভারতের মুসলিমরা কোরবানির ক্ষেত্রে মূলত ছাগল ও মহিষকেই প্রাধান্য দেন। এর বাইরে কেউ কেউ গরু কোরবানি দিলেও উট কোরবানি দেওয়া হয় খুবই কম। কিন্তু গরু আবার সব জায়গায় কোরবানি দেওয়া যায় না। ভারতের কয়েকটি রাজ্যে গরু জবাই করা আইনত বৈধ। সেগুলো হলো— অরুণাচল, গোয়া, কেরালা, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, দাদরা, নগর হাভেলি, দামান, দিউ ও পুদুচেরি। তবে এই রাজ্যগুলোর মধ্যে শুধু কেরালা এবং পশ্চিমবঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম রয়েছে। এর বাইরে দেশটির সবখানে গোহত্যা বেআইনি।
বিবিসি সংবাদদাতার ভাষ্যমতে, ‘কেউ যদি গরু কোরবানি দেয়, তবে ভয়াবহ শাস্তি আছে। কোনো কোনো রাজ্যে সাত বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধি রয়েছে। যেমন— গুজরাট, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানে গরু কোরবানি দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।’
তবে নাগাল্যান্ডের মতো কিছু রাজ্য মুসলিমপ্রধান না হওয়া সত্ত্বেও সেসব স্থানে গরু জবাই করা যায়। তার কারণ, পূর্বদিকের ওইসব এলাকার বেশিরভাগ মানুষই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী এবং খ্রিষ্টানরা ঐতিহ্যগতভাবেই গরুর মাংস খান। তাই ভারত সরকার সেখানে বাধা দেয় না।
তবে গরু জবাই করার ক্ষেত্রে ভারতে আগে এত কড়াকড়ি ছিল না। আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগেও ভারতের কিছু কিছু প্রদেশে গরু, বিশেষ করে বৃদ্ধ গরু জবাই করা যেত। কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সেটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
এখন মানুষ কোরবানির জন্য ছাগল ও মহিষ বেশি কেনে। যেমন— বিহার, রাজস্থান, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, গুজরাট বা দিল্লির বাসিন্দারা প্রধানত ছাগল কোরবানি দেন।
তবে যারা অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল, তারা কোরবানির সময় ছাগলের পরিবর্তে মহিষ বেশি কেনেন। কারণ, ছাগলের তুলনায় এটি সস্তা এবং একটি মহিষ কিনলে তা দিয়ে সাতজন শরিক কোরবানি দিতে পারেন। কিন্তু ছাগলের ক্ষেত্রে শুধু একজনই শরিক থাকতে পারেন।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর হরিয়ানা, রাজস্থান ইত্যাদি জায়গায় ‘গোরক্ষক বাহিনী’ নামে প্রাইভেট মিলিশিয়ার মতো গ্রুপ তৈরি হয়েছে। কেউ ট্রাকে করে গরু, এমনকি মহিষ নিয়ে গেলেও তারা তাদের ধাওয়া করে, মারে, লুটপাট করে, এমনকি হত্যাও করে। এর ফলে গরু, মহিষ বা ছাগল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতে ভয় পান পরিবহনকারীরা।
বিজেপি সরকার তার শাসনামলে পরিবেশের নামে ভারতের অনেক স্থানে ‘স্লটারিং হাউজ’ বা জবাই করার স্থানও বন্ধ করেছে। সেসব জায়গার মানুষ শুধু মুরগির মাংস খেতে বাধ্য হন।
ইন্দোনেশিয়া
ডব্লিউপিআরের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার প্রায় সাড়ে ২৩ কোটি মানুষ মুসলিম। এশিয়ার অনেক দেশের মতো ইন্দোনেশিয়াতেও গরু ও ছাগলই বেশি কোরবানি দেওয়া হয়।
দেশটির নাগরিক বেটি হারলিনা বলেন, ‘আমাদের দেশে উট বা ভেড়া নেই। তাই এখানে গরু ও ছাগল বেশি চলে। আমরা নিজেরাও এবার গরু কোরবানি দেব।’
ইন্দোনেশিয়ায় মাংসের বিতরণ প্রক্রিয়া এলাকাভেদে পরিবর্তিত হয়। কিছু এলাকায় কোরবানির পশুর একটি বড় অংশ নিকটাত্মীয়দের জন্য বরাদ্দ করা হয়। কিছু এলাকায় প্রতিবেশী ও হতদরিদ্রদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
তুরস্ক
তুরস্ক সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ৯৯ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তাই, স্বভাবতই দেশটির অনেক মানুষ প্রতিবছর ধর্মীয় রীতি মেনে কোরবানি দেন। দেশটিতে ঈদুল আজহাকে ‘কুরবান বায়রামি’ বলা হয়।
তুর্কির মুসলিমরা সাধারণত গরু, ছাগল ও ভেড়া কোরবানি দেন। তবে তারা বাড়িতে নয়, বরং সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করে কসাইখানায় গিয়ে কোরবানি দিতে পছন্দ করেন।
কোরবানির পর প্রাপ্ত মাংসকে তারা সমান তিন ভাগে ভাগ করেন। মাংসের একভাগ নিজেদের জন্য, আরেকভাগ আত্মীয়, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের মধ্যে এবং আরেকভাগ দরিদ্র ও অসচ্ছলদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়।
দেশটিতে কিছু দাতব্য সংস্থা রয়েছে, যারা সমন্বিতভাবে চেষ্টা করে যাতে সব দরিদ্র পরিবারের ঘরে কোরবানির মাংস পৌঁছে যায়। অনেক মানুষ ওই দাতব্য সংস্থাগুলোর কাছেই গরিবদের মধ্যে বিতরণের জন্য মাংস দিয়ে দেন। এই দাতব্য সংস্থাগুলো শুধু দেশের অভ্যন্তরেই না, বিশ্বের অনেক দেশেও গরিবদের মধ্যে মাংস বিতরণ করে।
নাইজেরিয়া
বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ থাকে আফ্রিকায়। আফ্রিকান দেশ নাইজেরিয়ার বেশিরভাগ মানুষই মুসলিম। কোরবানির জন্য দেশটিতে ভেড়াই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
নাইজেরিয়ার নাগরিক আয়েশা উমর বলেন, ‘আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ ঈদে ভেড়া কোরবানি করে। যদিও আমি এমন লোকদেরও চিনি যারা গরু, এমনকি উটও ব্যবহার করে। বিশেষ করে নাইজেরিয়ার উত্তরের জামফারা বা বোর্নো রাজ্যে। তবে সবচেয়ে বেশি চলে ভেড়া।’
নাইজেরিয়ায় ঈদুল আজহাকে বলা হয় ‘ঈদুল কাবির’। দেশটির মুসলিমরাও সকালবেলা নতুন জামাকাপড় পরে ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়েন। তারপর যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ভেড়া, ছাগল, গরু কিংবা উট কোরবানি দেন। এগুলো থেকে প্রাপ্ত মাংস তারাও তিন ভাগ করেন এবং নিয়ম অনুযায়ী বিতরণ করেন। কোরবানি শেষে মাংসের সঙ্গে জল্লফ রাইসের মতো ঐতিহ্যবাহী পদ রান্না করে সবার সঙ্গে মিলেমিশে খান।
বাংলাদেশ
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম। কোরবানির জন্য বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় গরুকে। তারপরই রয়েছে ছাগল। এর বাইরে অনেকে মহিষও কোরবানি দেন। কিন্তু উট বা ভেড়া কোরবানি দেওয়ার হার খুবই কম।
কোরবানির জন্য বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে প্রতিবছরই নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ির সামনে পথের ওপরেই বা আঙিনায় কোরবানি দেয় মানুষ।
বাংলাদেশের কোরবানির ক্ষেত্রে এক ধরনের ঐতিহ্য রয়েছে। দেখা যায়, কোরবানির বিক্রেতা তার পশুটির বাহারি সব নাম দেন এবং সেই সব নাম নিয়ে আলোচনাও হয়। সাধারণত গরুর নামকরণ করা হয় তার শরীরের বর্ণ অনুযায়ী। যেমন লাল গরুকে লালু, লালি বা লালটু পর্যন্ত বলার চল ছিল।
কিন্তু এখন বিক্রেতারা গরুর নাম রাখেন নবাব, বাহাদুর, সম্রাট ইত্যাদি। আবার কেউ কেউ বাংলাদেশের তারকা শিল্পীদের নামেও নাম রাখেন। যেমন— শাকিব খান বা জায়েদ খান। এ বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে নামকরণ করা গোলাপি রঙের মহিষ তো সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে।
বাংলাদেশেও কোরবানির পর সেটিকে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করা হয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
কেএএ/

