নাজিফা রাসেল স্বপ্না
রাত গভীর হলে চারপাশ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে। শহরের কোলাহল থেমে যায়, বাতাসেও যেন একটা শান্ত ছোঁয়া নেমে আসে। কিন্তু আমার ভেতরের পৃথিবী তখনো থেমে থাকে না। আমার পাশে জেগে থাকে এক ছোট্ট প্রাণ—আমার রাতজাগা পাখি, আমার ছেলে রোহান। ওর চোখে ঘুম নেই, ক্লান্তি নেই, আছে শুধু খেলা আর মায়া। ওকে দেখলেই আমি বুঝি—মা হওয়া শুধু একটি সম্পর্ক নয়, এটি এক অদৃশ্য সংগ্রাম, যা প্রতিদিন নিঃশব্দে বয়ে নিতে হয়।
দিনের আলোয় আমি ওর চারপাশে ঘুরে বেড়াই—ওর খাওয়া, ওর খেলা, ওর ছোট ছোট হাসি আর আবদারেই আমার পুরো সময় ভরে থাকে। তখন নিজেকে ক্লান্ত মনে হয় না বরং মনে হয় আমি পূর্ণ। কিন্তু রাত নামলে সবকিছু যেন বদলে যায়। যখন চারপাশ ঘুমিয়ে পড়ে; তখন আমার ক্লান্তিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চোখ জ্বালা করে, শরীর ভেঙে আসে। তবুও ঘুম আসে না—কারণ আমার ছোট্ট পাখিটা তখনো জেগে থাকে।
রাত-দিনের পার্থক্য ও বোঝে না। ওর কাছে রাতও যেন এক নতুন খেলার সময়। কিন্তু সেই সময়টাতেই আমি নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কি শুধু একজন মা? নাকি আমি একজন মানুষও। যার নিজের কিছু স্বপ্ন ছিল, কিছু ইচ্ছা ছিল, নিজের মতো করে বাঁচার একটা অধিকার ছিল?
- আরও পড়ুন
আমার মা, কখনো ক্লান্ত হন না
জীবনের কিছু অধ্যায় আমাকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে; যেখানে সিদ্ধান্তগুলো আর পুরোপুরি আমার নিজের ছিল না। দায়িত্ব, সম্পর্ক আর বাস্তবতার ভারে নিজের চাওয়াগুলো ধীরে ধীরে চাপা পড়ে গেছে। কখন যে নিজের ইচ্ছাগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখেছি, তা হয়তো আমিও বুঝে উঠতে পারিনি। তবুও মনের গভীরে একটা ছোট্ট আলো জ্বলতেই থাকে—নিজের পরিচয়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা। নিজের মতো করে সম্মান নিয়ে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা।
পরিবারের ভেতরে থেকেও অনেক সময় নিজের একটা আলাদা জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। সাহায্য আর নির্ভরতার মধ্যে খুব সূক্ষ্ম একটা সীমারেখা থাকে। সেই সীমা পেরিয়ে গেলে মনে হয়, নিজের অস্তিত্বটাই যেন অন্যের ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে। তখন নিজের ভেতরে একটা নীরব কষ্ট জমে—যেটা কাউকে বলা যায় না, আবার একেবারে চেপেও রাখা যায় না।
কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেই রোহান আমাকে আবার টেনে আনে বাস্তবতায়। ওর ছোট্ট হাত যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে, ওর চোখের ভরসা, ওর হাসির সরলতা—সবকিছু আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি ভেঙে পড়ার জন্য তৈরি হইনি। বরং দাঁড়িয়ে থাকার জন্যই আমি আছি। ওর জন্য, আর নিজের জন্যও।
- আরও পড়ুন
মা, পৃথিবীর প্রথম হাসপাতাল
আমি চাই, একদিন আমার জীবন শুধু দায়িত্বের গল্প হয়ে না থাকে। আমি চাই, এই জীবনের ভেতরে আমার নিজের একটা গল্পও থাকুক—যেখানে আমি একজন মা, যে কি না কারো ওপর নির্ভরশীল একজন মানুষ নই; বরং নিজের পরিচয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ। যে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে, নিজের পথ নিজে গড়তে পারে।
হয়তো আজকের এই ক্লান্ত রাতগুলো একদিন বদলে যাবে। হয়তো এই নির্ঘুম সময়গুলোই একদিন শক্তির গল্প হয়ে দাঁড়াবে। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটা দীর্ঘ রাতের পর যেমন ভোর আসে; তেমনই আমার জীবনেও একদিন শান্ত, উজ্জ্বল এক সকাল আসবে।
সেই সকালে আমি শুধু একজন মা হিসেবেই নয়, একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবেও নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবো—নিজের পরিচয়ে, নিজের সম্মানে।
এসইউ

