গ্রীষ্মের তীব্র গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা এখন প্রায় সবারই। বাইরে বের হলেই গরম বাতাস, ঘামে ভেজা শরীর আর অস্বস্তিকর আবহাওয়া যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। তবে শুধু তাপমাত্রাই নয়, এই সময়ে আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতা। অনেকেই ভাবেন শুধু রোদের তাপই অসুস্থতার কারণ, কিন্তু বাস্তবে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে গেলে শরীরের ওপর তার প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে যখন আর্দ্রতা যোগ হয়, তখন শরীর তার স্বাভাবিক উপায়ে ঠান্ডা হতে পারে না। সাধারণত শরীর ঘামের মাধ্যমে অতিরিক্ত তাপ বাইরে বের করে দেয়। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকলে সেই ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে শরীর ঠান্ডা হওয়ার পরিবর্তে আরও গরম হয়ে ওঠে এবং তৈরি হয় তীব্র অস্বস্তি।
ঘাম যে কারণে বিপজ্জনক
বাতাসে ভাসমান জলীয় বাষ্পের পরিমাণ যত বেশি থাকে, আর্দ্রতাও তত বেশি হয়। এই আর্দ্রতার কারণে শরীরের ঘাম শুকাতে দেরি হয়। অনেক সময় দেখা যায়, ফ্যানের নিচে বসেও শরীর দরদর করে ঘামছে, কিন্তু ঘাম শুকাচ্ছে না। এর ফলে শরীরের ভেতরের তাপ বের হতে পারে না এবং শরীরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বেড়ে যায়।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় চলতে থাকলে ‘হিট এগজরশন’ বা ‘হিট স্ট্রোক’-এর মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়াই ভালো
এই গরমে যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে থাকাই নিরাপদ। বিশেষ করে দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে রোদে বের হওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। এই সময় সূর্যের তাপ সবচেয়ে বেশি থাকে এবং শরীর খুব দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে।
যদি বাইরে যেতেই হয়, তাহলে ছাতা, ক্যাপ বা সানগ্লাস ব্যবহার করতে পারেন। পাশাপাশি হালকা রঙের সুতির পোশাক পরা উচিত, কারণ এসব পোশাক ঘাম শোষণ করে এবং শরীরকে কিছুটা আরাম দেয়।
শরীর হাইড্রেটেড রাখা জরুরি
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীর সুস্থ রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা। শুধু তৃষ্ণা পেলেই পানি পান করা নয় বরং নিয়মিত অল্প অল্প করে পানি পান করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ঘোল বা লাচ্ছি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে খুবই উপকারী। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে যে লবণ ও খনিজ বেরিয়ে যায়, এসব পানীয় তা পূরণ করতে সাহায্য করে।
খাবারে সতর্কতা জরুরি
এ সময়ে অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত ও ভারী খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। কারণ এমন খাবার হজমে বেশি সময় নেয় এবং শরীরের তাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এর বদলে হালকা ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়া উচিত।
তাজা ফল, শাকসবজি, সালাদ, দই বা পানিযুক্ত খাবার শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি রাস্তার খোলা খাবার এড়িয়ে চলাও জরুরি, কারণ গরমে এসব খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
শরীরচর্চাতেও সতর্কতা দরকার
অতিরিক্ত গরমে ভারী ব্যায়াম বা দীর্ঘ সময় শরীরচর্চা না করাই ভালো। এতে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে। চাইলে হালকা ব্যায়াম, যোগাসন বা ঘরের ভেতরে স্ট্রেচিং করতে পারেন।
অস্বস্তি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন
গরমে যদি মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বল লাগা, শ্বাসকষ্ট বা বমি ভাব দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় বিশ্রাম নিতে হবে এবং পানি পান করতে হবে। প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
গরমের এই সময় শুধু তাপমাত্রা নয়, আর্দ্রতাও শরীরের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই সচেতনতা ও কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললেই অনেকটাই সুস্থ থাকা সম্ভব।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক
এসএকেওয়াই

