পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকায় এখন ঘরে ফেরার ব্যস্ততা। কর্মব্যস্ত নগরী ছেড়ে প্রিয়জনদের কাছে ফিরতে ট্রেনকে সবচেয়ে স্বস্তির বাহন হিসেবে বেছে নিচ্ছেন অনেকে।
গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে পরিবার-পরিজন নিয়ে মঙ্গলবার (২৬ মে) সকালে কমলাপুর রেলস্টেশনে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। কারও হাতে বড় বড় ব্যাগ, কারও কাঁধে শিশু সন্তান।
কেউ আবার গ্রামের ছোট ভাই-বোন কিংবা ভাগ্নে-ভাগ্নিদের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন নতুন পোশাক, খেলনা, চকলেট কিংবা ঈদের উপহার। মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের মুখে অর্থনৈতিক চাপের কথাও শোনা গেছে। তবুও ঈদের আনন্দে প্রিয়জনদের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন সবাই।
কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা যাত্রীদের/ছবি: বিপ্লব দীক্ষিৎ
ট্রেনের প্রতিটি বগি যেন ভরে উঠেছে স্বপ্ন, আনন্দ আর দীর্ঘ অপেক্ষার গল্পে। ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের হাঁকডাক আর প্রিয়জনদের মুখে ঈদের হাসি, সব মিলিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশন যেন এক উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মজুড়ে দেখা যায় নানা বয়সী মানুষের ব্যস্ততা। কেউ ট্রেনের সময় মিলিয়ে নিচ্ছেন, কেউ সন্তানদের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন। অনেকেই আবার ট্রেন ছাড়ার আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। দীর্ঘদিন পর গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আনন্দ যেন সবার চোখেমুখে স্পষ্ট।
রামপুরা থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা যাওয়ার উদ্দেশ্যে কমলাপুরে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী সাদমান সাকিব। তিনি বলেন, সারাবছর কাজের চাপে গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয় না। ঈদই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ। মা-বাবা, ভাইবোন সবাই অপেক্ষা করছে। ঈদের সময় ট্রেনে যাত্রা একটু কষ্টের হলেও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার আনন্দের কাছে সেটা কিছুই না।
রেলস্টেশনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা/ছবি: বিপ্লব দীক্ষিৎ
আট বছর বয়সী আয়াত বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল প্ল্যাটফর্মের এক পাশে। গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কী করবে জানতে চাইলে শিশুটি হাসতে হাসতে বলে, আমি দাদুর সঙ্গে গরু দেখতে যাবো। আর আমার কাজিনদের সঙ্গে ঈদের দিন ঘুরতে বের হবো। আমি খেলনা গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। ভাইয়া ও আপুদের সঙ্গে অনেক মজা করবো।
কমলাপুরের ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দেখা যায় গাজীপুরের পোশাককর্মী নীলিমা আক্তারকে। ছোট মেয়ে জান্নাতকে কোলে নিয়ে তিনি অপেক্ষা করছিলেন যশোরের ট্রেনের জন্য। তিনি বলেন, বছরের অন্য সময় ছুটি পাই না। ঈদের সময় মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাই। ওর নানা-নানির সঙ্গে দেখা হবে। এ জন্য ও কয়েকদিন ধরেই খুব খুশি।
কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা যাত্রীদের/ছবি: বিপ্লব দীক্ষিৎ
ছয় বছর বয়সী জান্নাত নতুন গোলাপি রঙের জামা দেখিয়ে বলে, এটা আমি ঈদের দিন পরবো। নানুর বাড়িতে গেলে সবাই দেখবে। ঈদে অনেক মজা হবে। আমার ঢাকায় থাকতে ভালো লাগে না।
স্টেশনের ভেতরে প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে প্রতিটি প্ল্যাটফর্মেই ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তবে ভিড় থাকলেও অনেক যাত্রীর মুখে স্বস্তির ছাপ দেখা গেছে। ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছাড়ছে বলে জানান কয়েকজন যাত্রী।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা হামিদুর রহমান স্ত্রীকে নিয়ে বসে ছিলেন খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেসে। তিনি বলেন, আমরা দর্শনা যাবো। বাসে গেলে যানজটের ঝামেলা থাকে, বরিং লাগে। ও (স্ত্রী) বমি করে। ট্রেনে এই সমস্যা হয় না। বাচ্চাদের নিয়েও স্বস্তিতে যাওয়া যায়। ঈদের সময় এই ঘরে ফেরার অনুভূতিটা আলাদা।
তার মেয়ে দশ বছর বয়সী মাইশা, হাতে ছোট্ট একটি পুতুল নিয়ে বসেছিল। সে বলে, আমি দাদির জন্য চকলেট নিয়ে যাচ্ছি। গ্রামের বাড়িতে গেলে সবাই একসঙ্গে খেতে বসে। সেটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। দাদা-দিদা, নানু ভাই, নানু, আপু সবাই আমাকে অনেক আদর করে।
কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো/ছবি: বিপ্লব দীক্ষিৎ
স্টেশনের একপাশে বসে থাকা বৃদ্ধা রহিমা খাতুনের চোখেমুখেও ছিল অন্যরকম আনন্দ। ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান। ঈদের ছুটিতে এবার মাকে নিয়ে কিশোরগঞ্জে যাচ্ছেন। ছেলে আব্দুল কাদের বলেন, সারা বছর মাকে ঠিকমতো সময় দিতে পারি না। ঈদের সময় গ্রামে গেলে সবাই একসঙ্গে থাকি। মা তখন খুব খুশি হন।
রহিমা খাতুন বলেন, বয়স হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষজন, আত্মীয়স্বজনদের দেখতে মন চায়। ঈদে সবাই একসঙ্গে হলে মনে শান্তি লাগে।
কমলাপুর রেলস্টেশনের ভেতরে শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ ট্রেন দেখেই আনন্দে লাফাচ্ছে, কেউ জানালার পাশে বসার জন্য ব্যস্ত। বাবা-মায়েরাও সন্তানদের আনন্দ দেখে ক্লান্তি ভুলে যাচ্ছেন। যেন প্রতিটি ট্রেন শুধু যাত্রী নয়, বহন করছে মানুষের আবেগ, স্মৃতি আর নাড়ির টান।
স্টেশনে দায়িত্ব পালন করা রেলওয়ের এক কর্মী জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। তারপরও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছেন তারা। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
এমএএস/এমএমকে

