প্রতি চার বছর অন্তর হওয়া বিশ্বকাপ ফুটবল গোটা দুনিয়াকেই কাঁপিয়ে দেয়। যেসব দেশ খেলে, সেসব দেশের মানুষ তো আছেনই; বাংলাদেশের মতো না-খেলা দেশের মানুষরাও বিশ্বকাপে বুঁদ হয়ে থাকে। প্রতিবারই বিশ্বকাপের সময় উন্মাদনার অসাধারণ নজির স্থাপন করেন বাংলাদেশের দর্শকরা।
এবার কেমন হবে বিশ্বকাপ? ফুটবল বিশ্বকাপ এমন একটি শো, যাতে কেবল ফুটবল অঙ্গনেরই নয়, আনন্দে মেতে থাকেন সব খেলার মানুষ। এই যেমন দেশের তারকা হকি খেলোয়াড় রাসেল মাহমুদ জিমি, ফুটবল বিশ্বকাপ এলে খেলা নিয়ে ডুবে থাকেন পুরো মাস।
রাসেল মাহমুদ জিমি ব্রাজিলের পাঁড় সমর্থক। স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টিনার সমর্থকরা শত্রুপক্ষের মতো। কিন্তু জিমির পরিবারের সবাই যে আর্জেন্টিনার সমর্থক! তাহলে একসঙ্গে ম্যাচ দেখলে তর্ক-বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে জিমি বললেন, ‘শুধু তর্ক নয়, ঝগড়াই লেগে যায়। আমার স্ত্রী থেকে শুরু করে বাসার সবাই আর্জেন্টিনার সাপোর্টার।’
তাহলে তো গত বিশ্বকাপটা আপনার খারাপই কেটেছে। কারণ, ব্রাজিল বাদ পড়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে, আর্জেন্টিনা হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। ‘আর্জেন্টিনা-ফ্রান্সের ফাইনালটা আমি আর বাসায় দেখিনি। অন্য জায়গায় দেখেছিলাম। আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় আমি বাসায় ঢুকেছিলাম ভোর ৪টার দিকে, যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। না হলে তো নানা ফোড়ন শুনতে হতো’- গত বিশ্বকাপের ফাইনালের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বলছিলেন রাসেল মাহমুদ জিমি।
আপনার ধ্যান-জ্ঞান হকি। ফুটবলের এত ভক্ত হলেন কিভাবে? ‘আমাদের পারিবারিকভাবে ফুটবলের একটা ঐতিহ্য আছে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল দেখি। বাবা, দাদার সঙ্গে মিলে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখেছি। কারণ, ফুটবলের ক্রেজই আলাদা। আমার দাদা সাপোর্ট করতেন নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন- এসব দলকে। তখন আমি খেলা দেখলেও দল নিয়ে তেমন ধারণা ছিল না। সেভাবে বুঝতামও না। যখন থেকে ফুটবলটা ভালো করে বুঝতে শুরু করি, তখন আমার ব্রাজিলের খেলা ভালো লাগে। তবে আমার বাসায় আর কেউ ব্রাজিলের সাপোর্টার নেই। সবাই তো এখন আর্জেন্টিনার। গত বিশ্বকাপে খেলা দেখার সময় বাসায় অনেক ঝগড়া হয়েছে এ নিয়ে। কারণ, আমি এক দিকে, বাকিরা আরেক দিকে’- বলছিলেন জিমি।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ নিয়ে যে উন্মাদনা হয়, তা উপভোগও করেন দেশের অন্যতম সেরা এই হকি খেলোয়াড়। জিমির কাছে মনে হয় বিশ্বকাপ যেন এই দেশেই হয়। ‘বিশ্বকাপ নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গেও অনেক মজা করি। প্রিয় দল, খেলোয়াড় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করি। চারদিকে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না। কিন্তু বিশ্বকাপের সময় মনে হয় খেলাটা এ দেশেই হচ্ছে। এই আমেজটা ধরে রাখার জন্য আমরা বন্ধুরা সংগঠিত হয়ে বড় পর্দায় খেলা দেখি। আমাদের পুরান ঢাকায় খেলা দেখা নিয়ে একটা উৎসব তৈরি হয়।’
অন্যসব বিশ্বকাপের মতো এবার উন্মাদনা এখনো সেভাবে শুরু হয়নি উল্লেখ করে জিমি বলেন, ‘এবার আলোচনা-সমালোচনা এখনো সেভাবে শুরু হয়নি। শুনছি খেলা দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা আছে। আবার খেলার টাইমিংটাও যুতসই না। সবকিছু মিলিয়ে হয়তো আলোচনা এবার কম। তবে বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে ঠিকই জমে উঠবে সবকিছু।’
জিমি ব্রাজিলের সমর্থক হলেও তার প্রিয় ফুটবলারের তালিকায় শীর্ষে আছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ‘ব্রাজিলের খেলাটা আমার ভালো লাগে। ওদের স্কিল, খেলার স্টাইলটা সুন্দর। তবে ব্যতিক্রম হলো- আমার পছন্দের খেলোয়াড় হচ্ছেন পর্তুগালের রোনালদো। আমার খুব ভালো লাগে ওর স্টাইল, ওর স্কিল। রোনালদোর খেলা দেখার পর তার মতো করে আমি আমার চুলের স্টাইলও করেছি। মেসি-নেইমারের খেলাও ভালো লাগে। তবে সবার ওপরে রোনালদো।’
তো এবার কোন দল চ্যাম্পিয়ন হতে পারে বলে আপনি মনে করেন? জিমির জবাব, ‘আমি চাইব এবারের বিশ্বকাপে আমার প্রিয় দল ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হোক। তবে আমি সম্ভাবনা বেশি দেখছি স্পেন এবং ফ্রান্সের। সুযোগ বেশি তাদের। কারণ, এই দুই দলে নতুন নতুন কিছু ভালো খেলোয়াড় আছেন, যারা স্প্যানিশ ও ফরাসি লিগে ভালো খেলছেন। তাই এই দুই দলের সম্ভাবনা বেশি দেখছি।’
দল বৃদ্ধি ও তিন দেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের কিছু নেতিবাচক দিক উল্লেখ করেছেন জিমি। তার মতে, ‘তিন দেশে খেলা হলে দেখা যাবে আমেজটা সেভাবে থাকছে না। একটা জায়গায় খেলা হলে জাঁকজমকপূর্ণ হয়। ভেন্যুগুলো নিয়ে নানা আলোচনা হয়। দর্শক থাকেন এক দেশে। এখন তিন দেশে ভাগ হয়ে যাবে। আবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে একটা নেতিবাচক প্রভাবও পড়ছে বিশ্বকাপে। এসব কারণেই হয়তো এবার আমেজ একটু কম।’
এই যে বাংলাদেশে বিশ্বকাপের সময় পতাকায় পতাকায় ছেয়ে যায়, তাতে মনোরম পরিবেশ তৈরি হয় উল্লেখ করে জিমি বলেন, ‘বিশ্বকাপ আসলে প্রতিযোগিতা হয় কে কত বড় পতাকা তৈরি করতে পারে, ব্যানার তৈরি করতে পারে। এসব দৃশ্য অনেক সুন্দর দেখায়। এক বিল্ডিংয়ের একই পরিবারের ছাদে ১০টা-১২টা পতাকা। একেকজন একেক দলের সমর্থক। এবার নাই এখনো।’
‘বিশ্বকাপের বাকি আছে কয়দিন। অথচ আমি একটা ফ্ল্যাগও দেখি না। হয়তো তিন দেশে খেলা আর দল বেড়ে ৪৮টা হওয়ার কারণে এমন হয়েছে। আমি মনে করি, ৩২ দেশের বিশ্বকাপই ভালো ছিল। একটা স্পিড ছিল। যারা খেলছে, তারা অবশ্যই ভালো দল। তবে সংখ্যা কম হলে আরও ভালো হতো। অনেক দর্শক সব দলের নামও জানে না। প্রথমবার যারা খেলবে, তাদের সাপোর্টার তৈরি হতে দুই-তিনটা বিশ্বকাপ চলে যাবে। তবে বিশ্বকাপ তো বিশ্বকাপই। সময়মতো ঠিকই জমে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।’
আরআই/আইএইচএস/

