৮ মে বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস। মানবতার সেবায় নিবেদিত এই আন্দোলনের কারিগর লাখো তরুণ স্বেচ্ছাসেবক। কিন্তু আজকের প্রজন্ম এই লাল ক্রসকে কীভাবে দেখে? দুর্যোগ, রক্তদান, প্রাথমিক চিকিৎসায় এগিয়ে আসা যুব রেড ক্রিসেন্ট সদস্যদের চোখে দিবসটির মানে কী? ক্যারিয়ারের ব্যস্ততায় সেবা শব্দটা তাদের কাছে কতটা জীবন্ত? এই ফিচারে উঠে এসেছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কথা। তাদের উপলব্ধি, সীমাবদ্ধতা আর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা। কারণ আগামীর সংকটে এই তরুণরাই ধরবে মানবতার পতাকা। শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন।
জলবায়ু ও মানবিক সংকটে দুনিয়া
আব্দুল্লাহ আল নাঈম
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সমসাময়িক জলবায়ু পরিবর্তন আজ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, বর্তমানে একটি গভীর মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর আবহাওয়ার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব মানুষের জনজীবনে পড়ছে। অস্বাভাবিক বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি প্রতিনিয়ত মানুষকে বাস্তুচ্যুতির দিকে ধাবিত করছে। বিশেষত উপকূলীয় ও নিম্নাঞ্চলের জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। ফলে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব।
অন্যদিকে জলবায়ুর প্রভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা মানবিক সংকটকে গভীর করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি বর্তমানের জরুরি আবেদন। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও তীব্র হয়ে মানবসভ্যতার দিকে ক্ষতি হয়ে ফিরবে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানবিক কার্যক্রম: সম্ভাবনা ও প্রয়োগ
হিমেল আহমেদ
শিক্ষার্থী, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে দুর্যোগের সময়ে একদল লোক হয়ে ওঠে সুযোগের সৎ ব্যবহার করা ব্যবসায়ী, সেখানে রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্টের মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আমাদের আশার আলো যোগায়। পূর্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় মানবিক কাজ করা ছিল কষ্টসাধ্য, বর্তমানে প্রযুক্তির আশীর্বাদে হয়েছে সহজাত। মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে যে কোনো সময়ে ফান্ড রেইজ থেকে শুরু করে স্থানের পরিস্থিতি জানতে পারা দুই পলকের ব্যাপার। গত বছর মাইলস্টোন বিমা দুর্ঘটনার কথা ভুলার মতো না। সেখানে রক্ত সংগ্রহ থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংগ্রহের কাজটিও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই করা হয়েছিল। মুহূর্তেই দেশব্যাপী লোকের সাড়া পাওয়া যায়। একদল লোক রক্ত দেওয়ার জন্য ভিড় জমিয়েছেন, আরেকদল স্বেচ্ছাসেবা দেওয়ার জন্য। কেবল মিথ্যাচার রোধ করতে পারলেই এইরূপ অশরীরীভাবে মানবিক কাজকে সুউচ্চতায় পৌঁছাতে কেউ বাধা দিতে পারবে না।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে তরুণ সমাজ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
আশিক বিন আলম সোহাগ
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ
তরুণরাই একটি জাতির মেরুদণ্ড এবং আগামীর পৃথিবী গড়ার প্রধান কারিগর। আধুনিক বিশ্বে নেতৃত্বের সংজ্ঞা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে প্রথাগত অভিজ্ঞতার চেয়ে সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ এবং বিশ্বজনীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা টেকসই উন্নয়নের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের সাহসী অংশগ্রহণ আগামী দিনের ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তারুণ্যের অদম্য প্রাণশক্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাবই একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন সমাজ নিশ্চিত করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা এবং মানসম্মত শিক্ষা। তরুণদের মেধা ও মননকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করলে তারা কেবল দেশের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের এক বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হবে। সম্ভাবনার এই শক্তিই হবে আগামীর সুন্দর পৃথিবীর মূল চালিকাশক্তি।
স্বেচ্ছাসেবায় অংশগ্রহণ: আগ্রহ ও সীমাবদ্ধতা
প্রজ্ঞা দাস
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
জনগণের নিজস্ব ইচ্ছা এবং উদ্যোগে পরিচালিত সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বলে। স্বেচ্ছাসেবা হলো টেকসই উন্নয়নের চতুর্থ ভিত্তিপ্রস্তর, যা কেবল মানবিক সহমর্মিতার প্রকাশ নয়, বরং এটি নাগরিক দায়বদ্ধতার সক্রিয় অনুশীলন। দুর্যোগ, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা পরিবেশ প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর কাজের পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গুলোর মাধ্যমে বিশেষ করে ছাত্রসমাজ অধিক পরিমাণে সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারছে। এতে মানব সেবা হচ্ছে, অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে, ছাত্রজীবন থেকেই সহমর্মিতা, সহায়তা, দায়িত্ববোধ, লিডারশিপ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। যা এসব তরুণদের ভবিষ্যৎ জীবনকে অন্যদের থেকে এক ধাপ এগিয়ে রাখছে এবং নতুন গতি দান করছে। তাই সঙ্গত কারণেই, বর্তমান সময়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো তরুণদের আগ্রহের শীর্ষে রয়েছে। কিন্তু আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সময়সংকট, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও যাতায়াত ব্যয় তরুণদের নিয়মিত অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। তাছাড়া দুর্বল সমন্বয়, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, স্বীকৃতির অভাব এবং দুর্যোগ বা মহামারির সময় নিরাপত্তা ঝুঁকি অনুপ্রেরণা কমিয়ে দিচ্ছে। এই অবস্থায় কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, যাতায়াত সহায়তা, স্বীকৃতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সংগঠনের সমন্বয়ই স্বেচ্ছাসেবায় অংশগ্রহণকে বাড়াতে পারে। সমাজসেবীরাই সমাজকে টিকিয়ে রাখার শক্তি। সমাজসেবীর সংখ্যা বাড়লে এই শক্তিই মানবিক উন্নয়নের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হয়ে উঠবে। আর পুরো পৃথিবীর সামনে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে মানবিক উন্নয়নের দেশ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা: তরুণদের মূল্যায়ন
বরকত আলী
শিক্ষার্থী ও সেচ্ছাসেবক, দিনাজপুর সরকারি কলেজ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বলতে বর্তমানে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প) নয়, বরং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস কিংবা বড় দুর্ঘটনার মতো মনুষ্যসৃষ্ট সংকটকেও বোঝায়। এসবের প্রতিটি ক্ষেত্রে রেড ক্রিসেন্টের তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের অদম্য সাহস ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস বা অন্যান্যদের সাথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্রাউড কন্ট্রোল বা জনতা সামলানোসহ দ্রুততার সাথে সংকট নিরসনে কাজ করে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, রেড ক্রিসেন্টের সেচ্ছাসেবকদের মূল শক্তি হলো ফাস্ট এইড এবং উদ্ধার কাজের বিশেষ প্রশিক্ষণ। তারা জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো বা নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের মতো কাজগুলো নিখুঁতভাবে করে থাকে।
তরুণদের এই ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখা যায়, তারা এক একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করে। উদ্ধার কাজ বা সংকট পরবর্তীতেও রক্তদান কর্মসূচি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মানসিক সাহস জোগানোসহ নানারকম কাজে তরুণদের গ্রহণযোগ্যতা অতুলনীয়।
তরুণদের প্রত্যাশা দক্ষতার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি
আফিয়া আলম
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
মানবতার সেবায় রেড ক্রিসেন্ট এবং রেড ক্রস সংগঠন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। দিন দিন এদেশের সব স্বেচ্ছাসেবায় নিয়োজিত তরুণদের কাছে ভরসার প্রতীক হয়ে উঠছে উক্ত সংগঠনটি। তবে তরুণদের আরও কিছু প্রত্যাশা রয়েছে যা এখনো পূরণ হয়নি। তারা চায় নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি, সেই বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে মোকাবিলার জন্য এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা নেওয়া প্রয়োজন। এজন্য দরকার বাস্তবসম্মত জ্ঞান। এই ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে। আবার বর্তমানে বেশিরভাগ কাজই অনলাইন ভিত্তিক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ওয়েবসাইট এবং অনলাইনের বিভিন্ন ফাংশনে নানা ধরনের জরুরি সেবামূলক প্ল্যার্টফর্ম রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে সেবা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে তরুেণরা চায় অনলাইনে যদি এই সংগঠনের কাজের ব্যাপারে নানাবিধ প্রচারণা বাড়ানো যায় তাহলে সেবা অতি দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাবে। মানুষ দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে সহজেই যোগাযোগ করতে পারবে। সুতরাং, অনলাইনে উক্ত সংগঠনের কার্যক্রমের প্রসার বাড়ার দাবি তরুণদের। সুতরাং তরুণদের এই প্রত্যাশা ও দাবিগুলো পূরণ করতে পারলে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সংগঠনগুলো আরও শক্তিশালী ও গতিশীল হয়ে উঠবে।
- আরও পড়ুন
বাঙালির ভোজনবিলাস: একালের খাবারে নেই সেকালের স্বাদ
শিশুশ্রম: হারিয়ে যাওয়া শৈশব, আমাদের দায়িত্ব কী
কেএসকে

